কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহেদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চাপাতিসহ তিন ‘ভাড়াটে খুনিকে’ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, হত্যার মিশন নিশ্চিত করতে ঢাকা থেকে এদের হায়ার করে আনা হয়েছিল।
বুধবার (১৫ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে মিঠামইন সদরের কামালপুর বেরিবাঁধ এলাকায় জাহাঙ্গীর আলমের নিজ বাগান বাড়ির সামনে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।হামলায় তাঁর সঙ্গে থাকা হাদিস মিয়া নামের এক ব্যক্তিও গুরুতর আহত হয়েছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃতরা কেউ স্থানীয় বাসিন্দা নয়। তারা হলেন, বরগুনার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামের মো. হেলাল (২৫), লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার দুধরাজপুর গ্রামের মো. মহিন উদ্দিন (৩২) ও একই উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামের মো. শাকিল হোসেন ওরফে শাহীন (২৫)।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বুধবার (১৫ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টায় মিঠামইন বাজারে দলীয় কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন বিএনপি নেতা জাহেদুল আলম জাহাঙ্গীর। বাড়ির সামনে মোটরসাইকেল থেকে নামতেই আগে থেকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। তাকে রক্ষা করতে গেলে সঙ্গে থাকা হাদিস মিয়াকেও কুপিয়ে আহত করা হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে হামলাকারীদের একজনকে ধরে ফেলেন হাদিস মিয়া।গুরুতর আহত অবস্থায় জাহেদুল আলম জাহাঙ্গীর ও হাদিস মিয়াকে প্রথমে মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে চিকিৎসক জাহাঙ্গীরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত হাদিস মিয়া বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন।
এছাড়াও এই ঘটনায় মিঠামইন সহ জেলার স্থানীয় নেতাকর্মীরা হত্যার পরিকল্পনাকারী ও হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দলটির সহ-দপ্তর সম্পাদক মুহাম্মদ মুনির হোসেনের সই করা এক শোকবার্তায় এই নিন্দা জানানো হয়।
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসা আনন্দ বসাক বলেন, রাত সাড়ে ১১ টার দিকে জাহেদুল আলম জাহাঙ্গীরকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। হাসপাতালে আসার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
পুলিশ জানায়, আহত জাহাঙ্গীর ও হাদিসের চিৎকার শুনে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালানোর চেষ্টা করে। তবে ঘটনাস্থলেই চাপাতিসহ একজনকে আটক করা হয়। পরে করিমগঞ্জের বালিখোলা এলাকা থেকে অভিযান চালিয়ে আরও দুই সন্দেহভাজনকে আটক করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী কারা এবং কী উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুততম সময়ে খুনিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার হোসেন বলেন,গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা কেউ এই এলাকার বাসিন্দা নয়, তারা ঢাকা থেকে এসেছে। প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, তাদেরকে ভাড়া (হায়ার) করে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য আনা হয়েছে। একজন আসামিকে চাপাতিসহ হাতেনাতে ও বাকি দুজনকে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ওসি আরও বলেন, হত্যার মূল কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। দ্রুতই রহস্য উদঘাটন করা হবে। নিহত বিএনপি নেতার ময়নাতদন্ত শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। এই ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
উল্লেখ্য, মিঠামইনের কামালপুর বেড়িবাঁধের ১২টি মেহগনিগাছ কেটে ফেলার অভিযোগে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতির পদ স্থগিত করে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি। গাছ কাটার মামলায় ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় জেলা শহরে ডিবি পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে জাহেদুল আলম জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করে। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। গত ৫ জুলাই জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের সভাপতি পদের ওপর জারিকৃত স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাঁর এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি শরীফুল আলম এবং সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
তাসলিমা আক্তার মিতু/এসএন