ফুটবল গোলের খেলা। তবে গোল না করেও যে একটি ম্যাচে সবচেয়ে বড় প্রভাব রাখা যায়, তা আরও একবার প্রমাণ করলেন লিওনেল মেসি। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে থাকা মেসি নিজের গোলসংখ্যা বাড়াতে না পারলেও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ছিলেন অনন্য। দল যখন পিছিয়ে পড়ে প্রবল চাপে, ঠিক তখনই দুটি গোলের জোগান দিয়ে তিনি আবারও আর্জেন্টিনাকে পৌঁছে দিলেন বিশ্বকাপ ট্রফির দ্বারপ্রান্তে।
আটলান্টায় বাংলাদেশ সময় বুধবার রাতে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে হারায় ইংল্যান্ডকে। জয়সূচক গোলটি করেন লাউতারো মার্তিনেজ। তবে গোলের পর সতীর্থরা ছুটে যান মেসির কাছেই। কারণ গোলটির সূচনা হয়েছিল তার দারুণ এক ক্রস থেকে। এর ৭ মিনিট আগে এনজো ফার্নান্দেজও মেসির ক্রস থেকেই গোল করে দলকে সমতায় ফেরান। ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পরও আর্জেন্টিনার জয়ের নেপথ্যে ছিল মেসির ওই দুটি অ্যাসিস্ট।
৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বকাপে নিজের ছাপ রেখে চলেছেন লিওনেল মেসি। সাত ম্যাচে আটটি গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও আছেন সবার ওপরে। নকআউট পর্বের চারটি ম্যাচেই খেলেছেন পুরো সময়। প্রথম পাঁচ ম্যাচে গোল করেছেন। শেষ দুই ম্যাচে যদিও গোল পাননি, তবে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের জন্য কীভাবে শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে হয়, সেটিকে যেন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তাই তো বারবার চাপের মুখে পড়েও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখছে আর্জেন্টিনা। তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এখন টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয়ের দুয়ারে।
ক্যারিয়ারে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলবেন মেসি। ২০১৪ সালে জার্মানির কাছে হেরে রানার্সআপ হতে হয়েছিল তাকে। তবে ২০২২ সালে ফ্রান্সকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপার স্বাদ পান। এবার ২০২৬-এর ফাইনালে প্রতিপক্ষ স্পেন। ফল কী হবে, তা বলবে সময়। তবে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের এই লড়াইয়ে রয়েছে একটি গভীর যোগসূত্র–লা মাসিয়া। বার্সেলোনার বিখ্যাত এই যুব একাডেমি শুধু অসংখ্য ফুটবলারই তৈরি করেনি, গড়ে তুলেছে একটি স্বতন্ত্র ফুটবল দর্শন। এবারের ফাইনালে সেই দর্শনে বেড়ে ওঠা দুই ভিন্ন প্রজন্ম মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন।
একদিকে লিওনেল মেসি, যিনি আর্জেন্টাইন হলেও ফুটবলার হিসেবে বেড়ে উঠেছেন বার্সেলোনার লা মাসিয়ায়। অন্যদিকে স্পেনের নতুন প্রজন্ম, যাদের অনেকেই বেড়ে উঠেছে একই পাসিং, বল নিয়ন্ত্রণ ও দলগত ফুটবলের দর্শনে। তাই ফাইনালের লড়াই শুধু আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন নয়; এটা অনেকটা লা মাসিয়ার গড়ে তোলা ফুটবল সংস্কৃতিরও প্রতিফলন।
লিওনেল মেসি যখন অল্প বয়সে বার্সেলোনায় যোগ দেন, তখন কেউ ভাবতেও পারেনি যে একদিন তিনি বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠবেন। লা মাসিয়ায় তিনি শুধু ড্রিবলিং বা গোল করার দক্ষতাই শানিত করেননি; শিখেছেন দলগত ফুটবলের দর্শনও। সতীর্থদের সঙ্গে বোঝাপড়া, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ছোট পরিসরে খেলার অসাধারণ সক্ষমতা–এসবই তার খেলায় লা মাসিয়ার স্পষ্ট ছাপ। তাই মেসির সাফল্যের সঙ্গে এই একাডেমির নামও অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।
অন্যদিকে স্পেনের সোনালি যুগের ফুটবলেও লা মাসিয়ার দর্শনের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও সার্জিও বুসকেটসের মতো খেলোয়াড়রা বার্সেলোনার একাডেমি থেকে উঠে এসে স্পেনের ঐতিহাসিক সাফল্যের অন্যতম কারিগর হয়েছেন। তাদের ফুটবলের মূলমন্ত্র ছিল–বল হারানোর আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া, মাঠের ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করা এবং দল হিসেবে খেলা। রদ্রি, লামিন ইয়ামালদের স্পেনও সেই ধারার উত্তরাধিকার বহন করছে। তরুণ খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস, কারিগরি দক্ষতা এবং বল নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতির পেছনেও রয়েছে সেই দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ দর্শন।
একটি বিষয় নিশ্চিত, আগামী রবিবারের ফাইনালে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবেন লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামাল। প্রায় দুই দশকের বয়সের ব্যবধান হলেও তাদের ফুটবল বেড়ে ওঠার ঠিকানা একটাই। এই মুহূর্তে তরুণ মেসির কোলে শিশু ইয়ামালের ছবি তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল।
সেটি অবশ্য ভিন্ন এক গল্প। তবে দুজন দুই প্রজন্মের হলেও একই একাডেমি, একই দর্শন ও একই ফুটবল শিক্ষায় তারা বেড়ে উঠেছেন। আর ফাইনালে লা মাসিয়ার প্রতিনিধিত্ব শুধু এই দুজনেই সীমাবদ্ধ নয়। স্পেন দলে পাউ কুবার্সি, গাভি, এরিক গার্সিয়া, দানি ওলমো, মার্ক কুকুরেয়া, আলেহান্দ্রো গ্রিমালদো, ভিক্টর মুনিয়োজসহ আরও কয়েকজন খেলোয়াড়ও এই একাডেমির সঙ্গে যুক্ত। তাই এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল শুধু দুই দেশের শিরোপার লড়াই নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল একাডেমি লা মাসিয়ার উত্তরাধিকার, দর্শন ও দর্শনের সফল বাস্তবায়নেরও এক অনন্য প্রদর্শনী।