চার বছর আগে মনে হয়েছিল, লিওনেল মেসির গল্প শেষ হয়ে গেছে। ৩৫ বছর বয়সে তিনি অবশেষে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সেটিই হবে বিশ্বকাপে তার শেষ ম্যাচ। আর অনেকের দৃষ্টিতে, সেটিই তাকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এরও চার বছর আগে, যখন তার বয়স ছিল ৩১, তখন অনেকেই এমনকি তার আশপাশের লোকেরাও মনে করেছিলেন, তিনি হয়তো নিজের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন এবং বিশ্বকাপ না জিতেই ক্যারিয়ার শেষ করবেন।
কিন্তু এখন মেসি ৩৯ বছর বয়সে। ইংল্যান্ডকে কার্যত বিধ্বস্ত করে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। মেসির দুটি অ্যাসিস্টের সৌজন্যে পিছিয়ে পড়েও ২-১ ব্যবধানে জয় পায় দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। ২০২৬ বিশ্বকাপে তার অ্যাসিস্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪-এ, সঙ্গে রয়েছে ৮টি গোল। তিনি এখন টুর্নামেন্টের যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতা। আগামী রবিবার নিউ জার্সিতে ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে স্পেন–যে দেশেই বার্সেলোনার হয়ে নিজের ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় খেলেছেন মেসি।
আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, ‘সে ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়। এটা প্রমাণ করার জন্য তার আর কী করার বাকি আছে, আমি জানি না। স্পেনের অধিকাংশ মানুষই তাকে ভালোবাসে।’ বিবিসির বিশ্লেষক মাইকা রিচার্ডস বলেন, “তাদের দলে লিওনেল মেসি আছে। তাদের দলে ‘গোট’ আছে। সর্বকালের সেরা। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো জুড বেলিংহাম কিংবা হ্যারি কেইন ম্যাচের ভাগ্য গড়বে। কিন্তু এ কারণেই সে রাজা।”
যেভাবে ভাঙলেন ইংল্যান্ডের স্বপ্ন
সাবেক বার্সেলোনা ও পিএসজি ফরোয়ার্ড মেসি এর আগে কখনোই ক্যারিয়ারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেননি। থমাস টুখেল এবং ইংল্যান্ডের প্রতিটি সমর্থক নিশ্চয়ই চাইবেন, সেটি যেন এখনো সত্যি থাকত। অভিজ্ঞ এই ফুটবলার প্রথমার্ধে মাঝমাঠের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থেকে কয়েকটি দারুণ ছোঁয়া দেখিয়েছিলেন। কিন্তু অ্যান্থনি গর্ডন ৫৫ মিনিটে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেওয়ার পরই যেন প্রাণ ফিরে পায় আর্জেন্টিনা।
টুখেল আরও ডিফেন্ডার নামানোর পর ইংল্যান্ড রক্ষণাত্মক হয়ে যায়। এর পরের ৩৭ মিনিটে আর্জেন্টিনার বল দখল ছিল ৮৮ শতাংশ। আর ডান প্রান্তে সরে যাওয়ার পর যেন উৎসব শুরু হয় মেসির। ম্যাচ শেষে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বলেন, ‘মেসিকে উইংয়ে নিয়ে যাওয়াটাই ছিল আমাদের জন্য মূল চাবিকাঠি।’ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসি ৯টি সফল ড্রিবল করেছেন এবং দুটি গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এক ম্যাচে এই দুটি কীর্তি একসঙ্গে গড়া প্রথম খেলোয়াড় তিনি।
আটলান্টায় পুরো ইংল্যান্ড দল মিলিয়ে সফল ড্রিবল করেছে ৭টি। প্রতিপক্ষের বক্সে মেসির বল স্পর্শ ছিল ৭ বার, যা পুরো ইংল্যান্ড দলের সম্মিলিত সংখ্যার সমান। একইভাবে তার তৈরি করা ৪টি সুযোগও পুরো ইংল্যান্ড দলের সমান। এছাড়া ম্যাচে সর্বোচ্চ ৯টি ক্রসও করেছেন তিনি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আর্জেন্টিনার দুটি গোলই এসেছে তার পাস থেকে। প্রথমটি ছিল কর্নার থেকে সাজানো আক্রমণে। সেখানে এনজো ফার্নান্দেজকে খুঁজে নেন মেসি, যিনি ৮৫ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শটে সমতা ফেরান।
এরপর ইনজুরি সময়ে লাউতারো মার্টিনেজের মাথায় বল তুলে দেন মেসি, যা থেকে আসে জয়সূচক গোল। সাবেক ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার মাইকা রিচার্ডস বলেন, ‘সে মাঠে হেঁটে বেড়ায়, তারপর বল পায়ে এলেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। তার সেই প্রতিভা তখনই সামনে আসে। আর অনেক সময় সেটাই পার্থক্য গড়ে দেয়।’ সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জো হার্ট বলেন, ‘ছেলেরা মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে যা করেছিল, আবার সেটাই করেছে–দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে লিওনেল মেসি পুরোপুরি স্বাধীনতা পেয়েছে। আর তার হাতেই ছিল সেই মাস্টার চাবি। শেষ ১৫ মিনিটে সে একাই পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে।’
ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন বলেন, ‘ম্যাচের বড় একটি সময় আমরা তাকে খুব ভালোভাবে সামলেছি। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড়দের মতোই, বল পায়ে পেলেই সে কিছু না কিছু সৃষ্টি করতে পারে। সে যে ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়, তার কারণ এটাই।’
গোল্ডেন বুট জিততে পারবেন?
এই গ্রীষ্মেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন মেসি। বিশ্বকাপে তার গোল এখন ২১টি, যা আর্জেন্টিনার হয়ে করা মোট ১২৫ গোলের অংশ। এই ২১ গোলের মধ্যে ১৫টিই এসেছে তার ৩৫তম জন্মদিনের পর। এই টুর্নামেন্টেই তিনি করেছেন ৮ গোল, যা ২০২২ বিশ্বকাপে করা তার ৭ গোলকে ছাড়িয়ে গেছে। সে বছর গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, যিনি করেছিলেন ৮ গোল। এবারও মেসি ও এমবাপ্পে দুজনেরই গোল ৮টি। শনিবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলবে এমবাপ্পের ফ্রান্স।
ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম ও হ্যারি কেইনের গোল ৬টি করে। তারাও এখনো প্রতিযোগিতায় রয়েছেন।
যদি একাধিক খেলোয়াড় সমান গোল করেন, তাহলে টাইব্রেকার হবে অ্যাসিস্ট। সেখানে মেসির ৪টি অ্যাসিস্ট, এমবাপ্পের ৩টি। এই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতাও হতে পারেন মেসি। বর্তমানে তিনি ফ্রান্সের মাইকেল অলিসের চেয়ে মাত্র একটি অ্যাসিস্ট পিছিয়ে।
সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক পল রবিনসন বিবিসিকে বলেন, ‘সে এক ছোট্ট জাদুকর, সত্যিই তাই। পুরো টুর্নামেন্টে সে এটা করে যাচ্ছে। সে যত গোল করেছে, আবার ইংল্যান্ডের বক্সে যত বল পাঠিয়েছে–সবই দেখুন।’
কখনো কি ধীর হবেন?
অনেকেই ভুলে যান, ২০১৬ সালে বার্সেলোনার হয়ে খেলা ২৯ বছর বয়সী মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই অবসর নিয়েছিলেন। তার আগে তিনি ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরেছিলেন এবং টানা তিনটি কোপা আমেরিকার ফাইনালেও পরাজিত হয়েছিলেন। অবসর ভেঙে ফিরে আসার পর তিনি দুটি কোপা আমেরিকা জিতেছেন। ২০২২ সালে পিএসজির খেলোয়াড় হিসেবে কাতারে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পর মনে হয়েছিল, তার ক্যারিয়ারের ধাঁধার শেষ টুকরোটিও পূরণ হয়ে গেছে।
অনেকেই মনে করেছিলেন, সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়ের বিতর্কে এটিই ছিল শেষ প্রমাণ। কারণ বিশ্বকাপজয়ী পেলে ও ডিয়েগো ম্যারাডোনাকেই অনেকে এতদিন সবার ওপরে রাখতেন। ২০২২ সালের ফাইনালের আগে মেসি বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপ যাত্রা একটি ফাইনাল দিয়ে শেষ করতে পারছি, শেষ ম্যাচটি ফাইনালেই খেলব–এতে আমি খুবই আনন্দিত। এখন থেকে পরের বিশ্বকাপ পর্যন্ত অনেক বছর। আমি মনে করি না, আমি সেখানে খেলতে পারব। এভাবেই শেষ করতে পারা অসাধারণ।’
এরপরের বছর ইউরোপ ছেড়ে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর মনে হয়েছিল, তিনি ধীরে ধীরে ক্যারিয়ারের শেষের দিকে এগোচ্ছেন। এমনকি গত বছরের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও, যেখানে তিনি খেলেছিলেন, তখনো নিশ্চিত ছিল না যে তিনি এ গ্রীষ্মের বিশ্বকাপে খেলবেন কি না। কিন্তু তিনি এখনো আছেন। এখনো যেন অপ্রতিরোধ্য। যদিও তার খেলার ধরন বদলে গেছে। ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে এই টুর্নামেন্টে তিনি যে দূরত্ব অতিক্রম করেছেন, তার ৪৭ শতাংশই হেঁটে। আউটফিল্ড খেলোয়াড়দের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। স্প্যানিশ সাংবাদিক গিয়েম বালাগে, যিনি মেসির জীবনী লিখেছেন, বলেন–কৌশলগতভাবে মেসি অন্তত পাঁচবার নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন।
ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনার হয়ে টানা ১৩ ম্যাচে গোল করেছেন অথবা অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালেও যদি তিনি কোনো গোলে অবদান রাখেন, তাহলে ২০১১ সালে গড়া টানা ১৪ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্ট করার নিজের রেকর্ড স্পর্শ করবেন। এছাড়া তিনি কাফুর পর মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার কীর্তি গড়বেন। নিশ্চয়ই এটিই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ? কারণ ২০৩০ সালে তার বয়স হবে ৪৩।
কিন্তু এই পর্যায়ে এসে হয়তো আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ীকে নিয়ে আর কোনো কিছুই আগে থেকে ধরে নেওয়া উচিত নয়।