একটি গুজব, সন্দেহ কিংবা উত্তেজিত স্লোগান–তারপর মুহূর্তেই জড়ো হয়ে যায় শত শত মানুষ। কারও কথা শোনার সুযোগ নেই, প্রমাণের বালাই নেই, বিচারের অপেক্ষা নেই। কিল, ঘুষি, লাঠির আঘাতে নিথর হয়ে যায় একটি প্রাণ। ইংরেজি ‘মব’ শব্দের অর্থ উচ্ছৃঙ্খল জনতা। আর সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় মব ভায়োলেন্স বা মব সহিংসতা হলো–উত্তেজিত জনতার আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে অভিযুক্ত সাব্যস্ত করে পিটিয়ে হত্যা, লাঞ্ছনা কিংবা তার সম্পদ ধ্বংস করা। একে কেউ কেউ ‘মব জাস্টিস’ বললেও প্রকৃতপক্ষে এখানে জাস্টিস বা ন্যায়বিচারের লেশমাত্র নেই; আছে কেবল বিশৃঙ্খলা, জুলুম আর রক্তপাত।
মবে জড়িত ব্যক্তিরা একসঙ্গে কয়েকটি গুরুতর অপরাধ করে। প্রথমত, তারা বিচারবহির্ভূত শাস্তি দেয়—অথচ অপরাধ প্রমাণ ও শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার কেবল আদালত ও রাষ্ট্রের। দ্বিতীয়ত, যাচাই-বাছাই ছাড়া গুজবের ভিত্তিতে বহু নিরপরাধ মানুষ মবের শিকার হয়; ছেলেধরা সন্দেহে নিরীহ মায়ের প্রাণ যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সমাজ দেখেছে। তৃতীয়ত, মব আইনের শাসন ভেঙে দেয়—আজ যে জনতা একজনকে ‘অপরাধী’ ভেবে মারছে, কাল সেই জনতাই যে কারও দিকে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। চতুর্থত, ভিড়ের আড়ালে ব্যক্তিগত শত্রুতা, চাঁদাবাজি ও দখলদারির প্রতিশোধ চরিতার্থ হয়। ফলে মব কোনো তাৎক্ষণিক ‘গণবিচার’ নয়; এটি সমাজের নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে সংঘটিত সম্মিলিত অপরাধ।
ইসলামে মানুষের প্রাণের মর্যাদা এতটাই যে, আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল–প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ কিংবা জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টির কারণ ছাড়া–সে যেন গোটা মানবজাতিকেই হত্যা করল। (সুরা মায়িদা, ৩২)। অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছে, আল্লাহ যে প্রাণ হরণ নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তা হত্যা করো না। (সুরা ইসরা, ৩৩)। আর মবের প্রাণশক্তি যে গুজব, তার ব্যাপারে কোরআনের নির্দেশনা সুস্পষ্ট–হে মুমিনরা! কোনো ফাসিক যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও; নইলে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে বসবে, অতঃপর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবে। (সুরা হুজুরাত, ৬)। যাচাইহীন সংবাদে ঝাঁপিয়ে পড়া জনতা তাই সরাসরি কোরআনের নির্দেশ লঙ্ঘনকারী।
বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন, নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান পরস্পরের জন্য তেমনই পবিত্র, যেমন পবিত্র তোমাদের আজকের এই দিন, মাস ও শহর। (বুখারি, ১৭৩৯)।
মব একসঙ্গে এই তিনটিরই ওপর আঘাত হানে–মানুষের রক্ত ঝরায়, সম্পদ ধ্বংস করে ও সম্মান ভূলুণ্ঠিত করে। নবিজি (সা.) আরও বলেন, আল্লাহর কাছে গোটা দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়া একজন মুমিনকে অন্যায়ভাবে হত্যার চেয়ে হালকা। (তিরমিজি, ১৩৯৫; নাসায়ি, ৩৯৮৭)।
গুজব ছড়ানো সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেছেন, কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তা-ই (যাচাই ছাড়া) বলে বেড়ায়। (মুসলিম, ৫)।
আর প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিভ ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে। (বুখারি, ১০)। যে হাত নিরপরাধ মানুষের ওপর ওঠে, সে হাতের মালিক এই নববি সংজ্ঞা থেকে কত দূরে! মসজিদে নববিতে এক বেদুইন প্রস্রাব করে দিলে সাহাবিরা উত্তেজিত হয়ে তাকে শাস্তি দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, তাকে ছেড়ে দাও... তোমাদের সহজকারী হিসেবে পাঠানো হয়েছে, কঠোরতাকারী হিসেবে নয়। (বুখারি, ২২০)। উত্তেজিত জনতাকে সংযত করাই যে নবিজির সুন্নাহ, এ ঘটনা তার উজ্জ্বল প্রমাণ। যুদ্ধক্ষেত্রে কালিমা পাঠ করা ব্যক্তিকে হত্যা করায় তিনি প্রিয় সাহাবি উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-কে বারবার তিরস্কার করে বলেছিলেন, তুমি কি তার অন্তর চিরে দেখেছিলে? (মুসলিম, ৯৬)
আর মক্কা বিজয়ের দিন চরম শত্রুদের ওপর প্রতিশোধের পূর্ণ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি ঘোষণা করেছিলেন সাধারণ ক্ষমা। ক্ষমতা ও ক্ষোভের মুহূর্তে সংযমের এই আদর্শের সঙ্গে উন্মত্ত জনতার বিচারবহির্ভূত সহিংসতার কোনো সম্পর্কই নেই। ইসলামি আইনশাস্ত্রের সর্বসম্মত নীতি হলো–অপরাধ প্রমাণ ও দণ্ড কার্যকরের অধিকার কেবল রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগের; কোনো ব্যক্তি বা জনতার নয়।
সুতরাং মব কোনো বীরত্ব নয়, ধর্মরক্ষাও নয়–এটি কোরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে জুলুম, ফাসাদ ও অন্যায় হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের সমষ্টি। কেউ অপরাধ করলে তার প্রতিকারের পথ আইন ও আদালত; ভিড়ের হাতে লাঠি তুলে দেওয়া নয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক