বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত একটি প্রবাদ কুস্তি ভাইয়ে দোস্তি। এর অর্থ হলো লড়াইয়ের ময়দানে একে অপরকে কাবু করার তীব্র চেষ্টা থাকলেও, কুস্তির শেষে বা বাইরে তাদের মধ্যে পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকা। প্রকাশ্যে তীব্র বিরোধিতা, কঠিন ভাষায় সমালোচনা ও রাজনৈতিক সংঘাত থাকলেও জাতীয় বা কৌশলগত প্রয়োজনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার নজির নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক জোট, আন্দোলন ও ক্ষমতার সমীকরণে সেই বাস্তবতা দেখা গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এসে প্রবাদটি যেন নতুন করে আলোচনায় উঠেছে।
সংসদের ভেতরে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন দলের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই সনদ, নির্বাচন পদ্ধতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও বিভিন্ন নীতিগত প্রশ্নে তীব্র বাগ্যুদ্ধ চলছে। একই সময়ে জাতীয় স্বার্থের কিছু ইস্যুতে পারস্পরিক সহযোগিতা, যৌথ উদ্যোগের আহ্বান এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে একসঙ্গে উপস্থিতির ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা হচ্ছে, এটি কি কেবল সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিণত নতুন সংস্কৃতি, নাকি পর্দার আড়ালে রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত। এই সৌহার্দ্যকে কেউ গণতন্ত্রের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন। তবে জুলাই অভ্যুত্থানে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে মোটাদাগে এখনো ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বোঝাপড়া বেশ শক্তিশালী। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন এটি জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের চিত্র। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, অতিরিক্ত সমঝোতা কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা দুর্বল করে দিতে পারে। সংসদের সাম্প্রতিক এসব ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে তাই কুস্তি ভাইয়ে দোস্তি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে প্রকাশ্য রাজনৈতিক দূরত্ব স্পষ্ট। নানা বিষয়ে দুই দলের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা গেছে। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ইস্যুতে দল দুটির অবস্থান অভিন্ন। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদে বিএনপির সমালোচনা করে বলেছেন, জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। শুধু তাই নয়, সংবিধান সংশোধন-সংস্কার ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দল এক মঞ্চে আসতে পারেনি। এ বিষয়ে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে সরকারি দলের অনুরোধ সত্ত্বেও বিরোধী দল কোনো সদস্য দেয়নি।
তবে একই সংসদে ভিন্ন চিত্রও দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের যৌথ কমিটি গঠনের বিষয়ে উভয় পক্ষ ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিল। শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা নিরসনেও সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান এসেছিল।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ইস্যুতেও বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাদের বক্তব্যে ঐক্যের সুর পাওয়া গেছে। শুধু সংসদেই নয়, মাঠের রাজনীতিতেও সহযোগিতার কিছু উদাহরণ সামনে এসেছে। ঢাকা-১৫ আসনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম মিল্টন এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান একই উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে জনস্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এ ছাড়া বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের নির্বাচনি এলাকায় মসজিদ, গোরস্তান ও ঈদগাহ উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে নজিরবিহীন বলে মনে করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদও এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করে বলেছেন, তার দীর্ঘ সংসদীয় জীবনে এমন বরাদ্দ পাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, অতীতে সংসদে অশালীন ভাষা ও চরম বৈরিতা ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য। এবার সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তুলনামূলক সহনশীল আচরণ দেখা যাচ্ছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এবং জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্যও ইতিবাচক।
সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মারুফ মল্লিক খবরের কাগজকে বলেন, সরকারি দল ও বিরোধীদলের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সংলাপের সম্পর্কই গণতন্ত্রের সুস্থ চর্চার অন্যতম ভিত্তি। তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা, সমালোচনা ও মতবিনিময়ের মধ্য দিয়েই কার্যকর সিদ্ধান্তের পথ তৈরি হয়। এতে ভালো ও জনকল্যাণমূলক বিষয়গুলো সামনে আসে। অতীতে দেশে বিরোধীদলকে অনেক সময় প্রতিপক্ষ নয়, বরং শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল। এমনকি একপর্যায়ে মুখ দেখাদেখিও হতো না।
ড. মল্লিকের মতে, সেই সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে সংসদে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গঠনমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়ই উপকৃত হয়। এ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে আরও পরিণত, অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর করে তোলে।
তবে সবাই বিষয়টিকে একইভাবে দেখছেন না। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আগে থেকেই ছিল, এখনো আছে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধরে রাখা উচিত। তবে নীতিগত বিরোধ ও মতপার্থক্য যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু আলোচনার বাইরে থেকে যেতে পারে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।’
তিনি বলেন, বর্তমানে বিরোধী দল অনেক ক্ষেত্রে কারণ থাকুক বা না থাকুক, সরকারের বিরোধিতা করছে। নির্বাচনে পরাজয়ের হতাশা থেকে এমন আচরণের প্রবণতাও দেখা যায়। আবার সরকার ও বিরোধী দল যদি নীতিগতভাবে এক অবস্থানে চলে আসে, তা হলে কার্যকর বিরোধিতার জায়গা সংকুচিত হবে। সে ক্ষেত্রে সংসদ জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে ‘মামুদের সংসদ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা খবরের কাগজকে বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান সংসদীয় পরিবেশের জন্য জরুরি। তার ভাষায়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংঘাতের পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চান, যা গণতন্ত্রের নতুন বার্তা বহন করে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘১৯৯১ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। সরকার জনস্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করলে আমরা তার তীব্র সমালোচনা করছি। একই সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে ইতিবাচক বিষয়গুলোও সামনে আনার চেষ্টা করছি।’
হামিদুর রহমান বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছি। আবার প্রয়োজন হলে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছি এবং কর্মসূচিও দিচ্ছি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়। সরকার বিদেশ সফরে গিয়ে দেশের স্বার্থে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ নিলে আমরা সেটিকে স্বাগত জানিয়েছি ও ধন্যবাদ জানিয়েছি। এতে মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন একটি গণতান্ত্রিক সংসদীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা এবং ভুলের সমালোচনা– দুটিই দায়িত্বশীলভাবে করা হবে।’
সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, সরকার সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে চায়। ফলে রাজনৈতিক বিরোধিতার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থে সীমিত সহযোগিতার বার্তাও সামনে এসেছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল খবরের কাগজকে বলেন, সংসদ ও সংসদের বাইরে এখন এমন কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান, যা অতীতে দেখা যায়নি।
বরিশাল সফরের উদাহরণ তুলে ধরে আলাল বলেন, সাধারণ মানুষ বলছেন, একজন প্রধানমন্ত্রী বিআরটিসির বাসে সফর করছেন। এর আগে কোনো প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে বিআরটিসির বাসে যাতায়াত করতে দেখা যায়নি। একই সঙ্গে তার সফরকে কেন্দ্র করে জনগণের চলাচলে কোনো ধরনের ভোগান্তি সৃষ্টি হয়নি। সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা কিংবা অতিরিক্ত নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধও ছিল না।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে মানুষ যে গণতান্ত্রিক, জনবান্ধব ও মানবিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা করেছিল, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশ ধীরে ধীরে সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে।
বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক নতুন নয়। এরশাদ সরকারের পতনের পর দল দুটি একসঙ্গে নির্বাচন করে জয়লাভ করে। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট গঠন করে তারা সরকার পরিচালনা করেছে। পরবর্তী সময়ে নানা কারণে সেই সম্পর্কের ধরন বদলেছে। এখন উভয় দলই নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, সংসদে দেখা যাওয়া এই সৌহার্দ্য কি কেবল গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার, জুলাই শহিদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশ, নাকি ভবিষ্যতের এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এর উত্তর নির্ভর করছে সময়, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আগামী রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর।