ঢাকা ২ শ্রাবণ ১৪৩৩, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
খুলনায় মসজিদের মুয়াজ্জিনকে গলা কেটে হত্যাচেষ্টা মেসির উত্তরাধিকার বনাম নতুন স্বপ্ন ভক্তির আবহে দেশজুড়ে বর্ণাঢ্য রথযাত্রা সংসদে বাজেট আলোচনাকে হার মানিয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক দুপুরের মধ্যে ৮ জেলায় ঝড়ের শঙ্কা, সতর্ক সংকেত সিসার বিষক্রিয়ার ঝুঁকিতে সাড়ে তিন কোটি শিশু ২০২৬ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ কবে? সংসদে কুস্তি ভাইয়ে দোস্তি বিশ্বকাপের পর রেহানের সিনেমার প্রচার শুরু টঙ্গীর ‘শীর্ষ মাদকসম্রাজ্ঞী’ কারিমা গ্রেপ্তার মব একটি ঘৃণিত অপরাধ প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে ক্ষোভের মুখে জেলেনস্কি ১১-দলীয় জামায়াত জোটে ভাঙনের সুর অনির্দিষ্টকালের জন্য চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত ডেটাবেজ করে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ-পুনর্বাসনের টার্গেট শেষ পর্যন্ত লড়বে ইরান আকাশপানে মেসির এক পলক, তারপরই ঝলক স্লুইসগেট খুলবে কে নতুন দেখা উইস্টারিয়া ফুল ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফর স্থগিত রাজনৈতিক প্রভাবে কালো তালিকা থেকে মুক্তির অভিযোগ বৃষ্টির প্রভাবে ডিম মুরগি সবজির দাম বেড়েছে ‘মহাকাব্যেরও মহাকাব্য’ আর্জেন্টিনায় প্রশংসায় স্কালোনি ১৭ জুলাই: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ১৭ জুলাই: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স ‘মহাকাব্যেরও মহাকাব্য’ লাউতারোয় আর্জেন্টিনার নতুন মহাকাব্য যেভাবে সবকিছু ঘটছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য

সংসদে কুস্তি ভাইয়ে দোস্তি

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১০:১২ এএম
আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১০:১৩ এএম
সংসদে কুস্তি ভাইয়ে দোস্তি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত একটি প্রবাদ কুস্তি ভাইয়ে দোস্তি। এর অর্থ হলো লড়াইয়ের ময়দানে একে অপরকে কাবু করার তীব্র চেষ্টা থাকলেও, কুস্তির শেষে বা বাইরে তাদের মধ্যে পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকা। প্রকাশ্যে তীব্র বিরোধিতা, কঠিন ভাষায় সমালোচনা ও রাজনৈতিক সংঘাত থাকলেও জাতীয় বা কৌশলগত প্রয়োজনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার নজির নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক জোট, আন্দোলন ও ক্ষমতার সমীকরণে সেই বাস্তবতা দেখা গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এসে প্রবাদটি যেন নতুন করে আলোচনায় উঠেছে।

সংসদের ভেতরে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন দলের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই সনদ, নির্বাচন পদ্ধতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও বিভিন্ন নীতিগত প্রশ্নে তীব্র বাগ্‌যুদ্ধ চলছে। একই সময়ে জাতীয় স্বার্থের কিছু ইস্যুতে পারস্পরিক সহযোগিতা, যৌথ উদ্যোগের আহ্বান এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে একসঙ্গে উপস্থিতির ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা হচ্ছে, এটি কি কেবল সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিণত নতুন সংস্কৃতি, নাকি পর্দার আড়ালে রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত। এই সৌহার্দ্যকে কেউ গণতন্ত্রের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন। তবে জুলাই অভ্যুত্থানে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে মোটাদাগে এখনো ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বোঝাপড়া বেশ শক্তিশালী। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন এটি জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের চিত্র। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, অতিরিক্ত সমঝোতা কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা দুর্বল করে দিতে পারে। সংসদের সাম্প্রতিক এসব ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে তাই কুস্তি ভাইয়ে দোস্তি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে প্রকাশ্য রাজনৈতিক দূরত্ব স্পষ্ট। নানা বিষয়ে দুই দলের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা গেছে। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ইস্যুতে দল দুটির অবস্থান অভিন্ন। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদে বিএনপির সমালোচনা করে বলেছেন, জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। শুধু তাই নয়, সংবিধান সংশোধন-সংস্কার ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দল এক মঞ্চে আসতে পারেনি। এ বিষয়ে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে সরকারি দলের অনুরোধ সত্ত্বেও বিরোধী দল কোনো সদস্য দেয়নি।

তবে একই সংসদে ভিন্ন চিত্রও দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের যৌথ কমিটি গঠনের বিষয়ে উভয় পক্ষ ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিল। শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা নিরসনেও সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান এসেছিল।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ইস্যুতেও বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাদের বক্তব্যে ঐক্যের সুর পাওয়া গেছে। শুধু সংসদেই নয়, মাঠের রাজনীতিতেও সহযোগিতার কিছু উদাহরণ সামনে এসেছে। ঢাকা-১৫ আসনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম মিল্টন এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান একই উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে জনস্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এ ছাড়া বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের নির্বাচনি এলাকায় মসজিদ, গোরস্তান ও ঈদগাহ উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে নজিরবিহীন বলে মনে করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদও এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করে বলেছেন, তার দীর্ঘ সংসদীয় জীবনে এমন বরাদ্দ পাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, অতীতে সংসদে অশালীন ভাষা ও চরম বৈরিতা ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য। এবার সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তুলনামূলক সহনশীল আচরণ দেখা যাচ্ছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এবং জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্যও ইতিবাচক।

সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মারুফ মল্লিক খবরের কাগজকে বলেন, সরকারি দল ও বিরোধীদলের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সংলাপের সম্পর্কই গণতন্ত্রের সুস্থ চর্চার অন্যতম ভিত্তি। তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা, সমালোচনা ও মতবিনিময়ের মধ্য দিয়েই কার্যকর সিদ্ধান্তের পথ তৈরি হয়। এতে ভালো ও জনকল্যাণমূলক বিষয়গুলো সামনে আসে। অতীতে দেশে বিরোধীদলকে অনেক সময় প্রতিপক্ষ নয়, বরং শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল। এমনকি একপর্যায়ে মুখ দেখাদেখিও হতো না। 

ড. মল্লিকের মতে, সেই সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে সংসদে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গঠনমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়ই উপকৃত হয়। এ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে আরও পরিণত, অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর করে তোলে।

তবে সবাই বিষয়টিকে একইভাবে দেখছেন না। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আগে থেকেই ছিল, এখনো আছে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধরে রাখা উচিত। তবে নীতিগত বিরোধ ও মতপার্থক্য যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু আলোচনার বাইরে থেকে যেতে পারে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।’

তিনি বলেন, বর্তমানে বিরোধী দল অনেক ক্ষেত্রে কারণ থাকুক বা না থাকুক, সরকারের বিরোধিতা করছে। নির্বাচনে পরাজয়ের হতাশা থেকে এমন আচরণের প্রবণতাও দেখা যায়। আবার সরকার ও বিরোধী দল যদি নীতিগতভাবে এক অবস্থানে চলে আসে, তা হলে কার্যকর বিরোধিতার জায়গা সংকুচিত হবে। সে ক্ষেত্রে সংসদ জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে ‘মামুদের সংসদ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা খবরের কাগজকে বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান সংসদীয় পরিবেশের জন্য জরুরি। তার ভাষায়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংঘাতের পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চান, যা গণতন্ত্রের নতুন বার্তা বহন করে। 

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘১৯৯১ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। সরকার জনস্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করলে আমরা তার তীব্র সমালোচনা করছি। একই সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে ইতিবাচক বিষয়গুলোও সামনে আনার চেষ্টা করছি।’

হামিদুর রহমান বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছি। আবার প্রয়োজন হলে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছি এবং কর্মসূচিও দিচ্ছি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়। সরকার বিদেশ সফরে গিয়ে দেশের স্বার্থে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ নিলে আমরা সেটিকে স্বাগত জানিয়েছি ও ধন্যবাদ জানিয়েছি। এতে মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন একটি গণতান্ত্রিক সংসদীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা এবং ভুলের সমালোচনা– দুটিই দায়িত্বশীলভাবে করা হবে।’

সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, সরকার সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে চায়। ফলে রাজনৈতিক বিরোধিতার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থে সীমিত সহযোগিতার বার্তাও সামনে এসেছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল খবরের কাগজকে বলেন, সংসদ ও সংসদের বাইরে এখন এমন কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান, যা অতীতে দেখা যায়নি।

বরিশাল সফরের উদাহরণ তুলে ধরে আলাল বলেন, সাধারণ মানুষ বলছেন, একজন প্রধানমন্ত্রী বিআরটিসির বাসে সফর করছেন। এর আগে কোনো প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে বিআরটিসির বাসে যাতায়াত করতে দেখা যায়নি। একই সঙ্গে তার সফরকে কেন্দ্র করে জনগণের চলাচলে কোনো ধরনের ভোগান্তি সৃষ্টি হয়নি। সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা কিংবা অতিরিক্ত নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধও ছিল না।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে মানুষ যে গণতান্ত্রিক, জনবান্ধব ও মানবিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা করেছিল, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশ ধীরে ধীরে সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে।

বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক নতুন নয়। এরশাদ সরকারের পতনের পর দল দুটি একসঙ্গে নির্বাচন করে জয়লাভ করে। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট গঠন করে তারা সরকার পরিচালনা করেছে। পরবর্তী সময়ে নানা কারণে সেই সম্পর্কের ধরন বদলেছে। এখন উভয় দলই নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, সংসদে দেখা যাওয়া এই সৌহার্দ্য কি কেবল গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার, জুলাই শহিদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশ, নাকি ভবিষ্যতের এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এর উত্তর নির্ভর করছে সময়, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আগামী রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর।

সংসদে বাজেট আলোচনাকে হার মানিয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১০:৩১ এএম
সংসদে বাজেট আলোচনাকে হার মানিয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক
ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন শেষ হয় গত বুধবার (১৫ জুলাই)। গত ৭ জুন শুরু হওয়া ৩৯ দিনের এই অধিবেশন চলে মোট ২৬ কার্যদিবস। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে জাতীয় বাজেট পাসই ছিল অধিবেশনের প্রধান উদ্দেশ্য। তবে বাজেটের পাশাপাশি সংবিধান সংশোধন না সংস্কার করা হবে, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, লোডশেডিং, শিক্ষাব্যবস্থা, টেলিটক, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংসদীয় ভাষা ও শিষ্টাচার–এসব বিষয়েই সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক ও রাজনৈতিক বাগ্‌যুদ্ধ হয়েছে। সংসদের ভেতরের বহু বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। একই সঙ্গে সংসদীয় ভাষা ও শিষ্টাচার নিয়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের একাধিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে চলেছে নানা আলোচনা।
 
অধিবেশনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উত্থাপন করেন, যা দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ। বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বৃদ্ধিকে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেন।
 
বাজেটের ওপর টানা ১৪ কার্যদিবস সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মোট ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিটের আলোচনায় ৩১৬ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। 
 
সরকারি দলের ২০০ এবং বিরোধী দলের ৯১ সদস্য ছাড়াও ২৫ জন সংরক্ষিত আসনের ও স্বতন্ত্র সদস্যরা আলোচনায় বক্তব্য রাখেন। সরকারি দল বাজেটকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরলেও বিরোধী সদস্যরা মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণ, বাজেট ঘাটতির অর্থায়ন, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ নিয়ে সমালোচনা করেন। প্রায় ২০ দিনের আলোচনা শেষে ৩০ জুন অধিবেশনে কণ্ঠভোটে এই বাজেট পাস হয়।
 
আইন প্রণয়নেও অধিবেশন ছিল সক্রিয়। ২৬ কার্যদিবসে মোট ১০টি সরকারি বিল পাস হয়। সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন ২৫ জন সদস্য। কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ ধারায় ৭১৫টি নোটিশ জমা পড়ে; এর মধ্যে ২৪টি গৃহীত এবং ২২টির ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ৭১(ক) বিধিতে ১২৫টি দুই মিনিটের নোটিশ উত্থাপিত হয়। এ ছাড়া ১৩১ বিধির আওতায় চারটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নিষ্পত্তি করা হয়।
 
প্রশ্নোত্তর পর্বেও সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে ২৭৮টি প্রশ্ন জমা পড়লেও ৩৫টির উত্তর টেবিলে উপস্থাপন করা হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে জমা পড়া ৫ হাজার ৩১টি প্রশ্নের মধ্যে ৩ হাজার ৪৭৪টির উত্তর দেওয়া হয়। সম্পূরক প্রশ্নোত্তর পর্বে বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্ত্রীদের জবাব সংসদে প্রাণবন্ত বিতর্কের জন্ম দেয়।
 
অধিবেশনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ছিল সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন। দ্বিতীয় অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিসহ মোট ১১টি কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করা হয়। এর আগে প্রথম অধিবেশনে গঠিত আটটি কমিটিসহ দুই অধিবেশনে মোট ১৯টি সংসদীয় ও বিশেষ কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংসদীয় তদারকি কাঠামো আরও সম্প্রসারিত হয়।
 
সংবিধান নিয়ে বিতর্ক, রাজনৈতিক উত্তাপ
বাজেট অধিবেশনে সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা হয় সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি। বিরোধী দল প্রতিনিধি না দেওয়ায় গত ১৪ জুন ৫টি পদ শূন্য রেখে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে গঠিত এ কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনী বিলের খসড়া প্রস্তুত করা। সরকার এটিকে জুলাই সনদের সাংবিধানিক বাস্তবায়নের পথ হিসেবে তুলে ধরলেও বিরোধী দল ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবিতে অনড় থেকে কমিটি প্রত্যাখ্যান করে এবং অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে। 
 
সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে উঠলে বিরোধী দল তা প্রত্যাখ্যান করে। তবে সরকারের যুক্তি ছিল, জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের একমাত্র পথ সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন। অন্যদিকে বিরোধী দল দাবি করে, গণভোটে জনগণ সংবিধানের ‘সংশোধন’-এর নয়, বরং মৌলিক ‘সংস্কার’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। ফলে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন ছাড়া অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় তারা অংশ নেবে না। পরে বিরোধী দলকে ছাড়াই ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। 
 
বাজেট আলোচনার শুরুতেই বিদ্যুৎ ও লোডশেডিং নিয়ে রুমিন ফারহানার বক্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি দাবি করেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষ এখনো প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে। জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে কোনো নির্ধারিত লোডশেডিং নেই। দুই পক্ষের বক্তব্যের পর স্পিকার তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং বাস্তবতা যাচাই করে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান। বিষয়টি সংসদের বাইরেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
 
মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং ইতিহাসের বয়ান নিয়েও একাধিক দিন সংসদ উত্তপ্ত ছিল। মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বক্তব্যকে ঘিরে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয়। একপক্ষ জুলাই আন্দোলনকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হিসেবে তুলে ধরে, অন্য পক্ষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কয়েকজন সদস্যের বক্তব্যে তীব্র রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহৃত হলে স্পিকার তা সংযত রাখার নির্দেশ দেন এবং কিছু বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
 
টেলিটক নিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর বক্তব্যও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সংসদে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটক বিক্রির কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই; বরং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও সেবার মানোন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। বিরোধী সদস্যরা টেলিটকের দীর্ঘদিনের লোকসান, গ্রাহকসেবা এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সরকার এটিকে কৌশলগত রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে ধরে রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়।
 
এইচএসসি পরীক্ষা নিয়েও সংসদে উল্লেখযোগ্য আলোচনা হয়। শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দেন, যেসব পরীক্ষার্থী অনিবার্য কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ভুল প্রশ্নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানান তিনি। শিক্ষামন্ত্রীর এ ঘোষণা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে কয়েকজন সদস্য প্রশ্ন তোলেন।
 
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একাধিক বক্তব্যও আলোচনায় আসে। ধর্ষণের মামলা বৃদ্ধি মানেই অপরাধ বৃদ্ধি নয়–তার এই মন্তব্য সংসদের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, মানুষ এখন অভিযোগ করতে বেশি উৎসাহিত হচ্ছে বলেই মামলার সংখ্যা বেড়েছে। বিরোধী সদস্যরা অবশ্য এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
 
অধিবেশনের শেষ ভাগে ‘গুপ্ত’ শব্দ ব্যবহারকে কেন্দ্র করেও সংসদে হইচই সৃষ্টি হয়। কয়েকজন সদস্যের বক্তব্যে ব্যক্তিগত ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দচয়ন ও কটাক্ষের অভিযোগ ওঠে। স্পিকার তাৎক্ষণিকভাবে সদস্যদের সতর্ক করে সংসদীয় ভাষা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে ‘অশোভন’, ‘অসংসদীয়’ ও ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক শব্দ ব্যবহার করায় একাধিক বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়। সংসদের শুরু থেকেই স্পিকার বারবার সতর্ক করলেও এমন ঘটনা পুরো অধিবেশনজুড়েই ঘটেছে।
 
এ প্রসঙ্গে সংসদীয় শালীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পুরোনো একটি গবেষণা। ২০১৭ সালের পাঁচটি অধিবেশন বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি জানিয়েছিল, মোট অধিবেশন সময়ের প্রায় ১৩ ঘণ্টা অশালীন ভাষা ব্যবহারে ব্যয় হয়েছিল। এবারের অধিবেশনেও ভাষা ও শব্দচয়ন নিয়ে পুনরাবৃত্ত বিতর্ক সেই গবেষণার পর্যবেক্ষণকে আবারও আলোচনায় নিয়ে আসে।
 
সংসদীয় সংস্কৃতি, স্পিকারের পর্যবেক্ষণ
বাজেট অধিবেশনজুড়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পর্যবেক্ষণ ছিল একটি উল্লেখযোগ্য দিক। প্রশ্নোত্তর পর্বে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি, লিখিত বক্তব্য হুবহু পড়ে শোনানো, সম্পূরক প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দেওয়া এবং আলোচনার সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করার প্রবণতা নিয়ে তারা একাধিকবার অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে সম্পূরক প্রশ্নের সময় প্রস্তুত লিখিত বক্তব্যের বাইরে এসে সদস্যদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
 
একই সঙ্গে সংসদীয় শিষ্টাচার রক্ষা, প্রতিপক্ষকে সম্মান দেখানো এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ পরিহারের ওপরও বারবার জোর দেওয়া হয়। বক্তব্যের সময় কটূক্তি, বিদ্রূপ, ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য ও অশোভন শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন স্পিকার। কয়েকটি ক্ষেত্রে কার্যবিবরণী থেকে বক্তব্য বাদ দেওয়ার ঘটনাও সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষায় স্পিকারের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
 
অধিবেশনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল সংসদের ভেতরের বক্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া। রুমিন ফারহানার লোডশেডিং প্রসঙ্গ, টেলিটক নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য, এইচএসসি পরীক্ষার বিশেষ সুযোগ, সংবিধান সংশোধন বিতর্ক, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই প্রসঙ্গ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যসহ বিভিন্ন আলোচনার ভিডিও ক্লিপ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। ফলে সংসদের বিতর্ক শুধু অধিবেশন কক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; জনপরিসরেও তাৎক্ষণিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

রাজনৈতিক প্রভাবে কালো তালিকা থেকে মুক্তির অভিযোগ

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:০১ এএম
রাজনৈতিক প্রভাবে কালো তালিকা থেকে মুক্তির অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

একাধিক অনিয়মের কারণে এ বছর সাত মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে এক বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। মুদ্রণে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার, অস্পষ্ট লেখা-ছবি, নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহে ব্যর্থতাসহ একাধিক অভিযোগ ছিল এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। পাঠ্যবই না দিয়েও বিল তুলে নেওয়ার মতো অপরাধ করে এসব প্রতিষ্ঠান। কিন্তু উচ্চমহলের প্রভাবে মাত্র পাঁচ মাসেই কালো তালিকা থেকে মুক্ত হয়েছে এসব মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। শুধু তা-ই নয়, আগামী বছরের জন্য পাঠ্যবইয়ের দরপত্রেও অংশ নিচ্ছে তারা। অভিযোগ উঠেছে, উচ্চমহলের প্রভাবে কালো তালিকা থেকে মুক্তি পেতে কোটি টাকার লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও এনসিটিবির নিষ্ক্রিয়তা ছিল। তবে এ ব্যাপারে এনসিটিবির কোনো কর্মকর্তাই মুখ খুলতে চাননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা এর সত্যতা খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেন।

২০২৬ শিক্ষাবর্ষে অনিয়মের দায়ে মেসার্স নাহার প্রিন্টার্স, আমাজন প্রিন্টিং প্রেস, বর্ণমালা প্রেস, পিবিএস প্রিন্টার্স, টাঙ্গাইল অফসেট প্রেস, হাক্কানী প্রিন্টার্স এবং সোহাগী প্রিন্টার্সকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। কিন্তু এ বছরের জুনে এনসিটিবি সরকারের শিথিল নীতিমালার আওতায় তাদের মুচলেকা নিয়ে ক্ষমা করেছে। এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তারা নিম্নমানের কাগজ দিয়ে বই ছাপায় ও নির্দিষ্ট সময়ে বই সরবরাহ করে না। এর পরও উচ্চমহলের চাপের মুখে তাদের আবারও বই ছাপানোর কাজ দেওয়া হয়েছে।

মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান খবরের কাগজকে জানান, গত বছর গাজীপুরে ২৫ হাজার পাঠ্যবই কম সরবরাহ করেছিল একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ছাপাখানার মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো জেলার শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের আওতায় আনা হয়। একইভাবে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় এক লাখ পাঠ্যবই নিম্নমানের ছিল। সে কারণে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সেটি গ্রহণ করেননি। বরং এনসিটিবিকে লিখিত আকারে অভিযোগ দেয়। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানটিও কোনো জবাবদিহির আওতায় আসেনি।

বই ছাপার কাজ, শিক্ষাক্রম উন্নয়ন, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নসহ নানা কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটিতে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে ২ হাজার ৭১১ কোটি ২০ লাখ টাকার। নিয়মিত কাজ না করেও এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়েছেন কোটি টাকার ভাতা-সম্মানী। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় এসব অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, রাজনৈতিক চাপ যদি এনসিটিবির কোনো কর্মকর্তা না নিতে পারেন তাহলে তার দায়িত্বে থাকার দরকার নেই। এনসিটিবির কাজ হলো সিলেবাস, কারিকুলাম, পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করা। কিন্তু প্রতিবছর তারা নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। কাজের কাজ না করে ছাপাখানা ও কাগজ কল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করছে। অনিয়মকে নিয়ম করছে। এর জন্য শিক্ষা কমিশন প্রয়োজন। দরকার সঠিক জবাবদিহির।

এনসিটিবির সূত্র বলছে, প্রতিটি পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য কাগজ কেনা ও ছাপানোর জন্য এনসিটিবি কর্মকর্তাদের অনুমোদন লাগে। তারা কাগজের মান পরীক্ষা করে তারপরেই ছাড়পত্র দেন। তাহলে প্রশ্ন ওঠে–কীভাবে নিম্নমানের বই ছাপা হলো? কারণ এখানে ব্যবসায়ী ও অসাধু কর্মকর্তার একটি নিবিড় যোগসাজশ রয়েছে। যে কারণে অনিয়ম করেও সহজে পার পাওয়া যায়। এ ছাড়া নিম্নমানের পাঠ্যবই ঠেকাতে গত বছর ৬৪টি জেলায় ৩২টি ইন্সপেকশন দল তৈরি করে এনসিটিবি। তদন্তকারীরা একটি প্রতিবেদনও বোর্ডে জমা দিয়েছেন। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনটি আর প্রকাশ করা হয়নি।
সমালোচকদের অভিযোগ, এনসিটিবি যখন এমন বহুমাত্রিক অনিয়মে জড়িয়ে যায়, তখনই লোক-দেখানো কালো তালিকাভুক্তি করে। এ ক্ষেত্রে রাঘববোয়ালদের বাদ দিয়ে ছোট ছোট প্রেসকে তালিকায় যুক্ত করা হয়। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের চাপে তাদেরও পরে কালো তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এনসিটিবির তালিকাভুক্ত মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান হলো ১০৭টি। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মোট ১০৬টি প্রেস কাজ করে। চলতি শিক্ষাবর্ষে এনসিটিবি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের মিলিয়ে ৩০ কোটি ২ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৪টি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও সরবরাহ করে।

এর আগে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক দেরিতে (কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫১ দিনেরও বেশি) বই সরবরাহ করায় ২০২২ সালে একযোগে ২৬টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে শীর্ষ কয়েকটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠান হলো–অক্ষর বিন্যাস প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস, সেডনা প্রিন্টিং প্রেস, প্লাসিড প্রিন্টার্স, মনির প্রেস, আবুল প্রিন্টিং, মেসার্স টাঙ্গাইল প্রিন্টার্স, হক প্রিন্টার্স, মেসার্স নাজমুন নাহার প্রেস, বনফুল আর্ট প্রেস। যারা পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞায় পড়ে। এ ছাড়া তিন বছরের জন্য ইউসুফ প্রিন্টার্স ও শরীফা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন নিষেধাজ্ঞায় পড়ে। এক বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞায় পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো– বাকো অফসেট প্রেস, দিগন্ত অফসেট প্রেস, এবি কালার প্রেস এবং মেসার্স প্রিন্ট প্লাস। এ ছাড়া ২০১৯ সালের বই উৎসবে সময়মতো বই দিতে না পারায় মডেল প্রিন্টিং প্রেস এবং নাসের আর্ট প্রেসকে তিন বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এনসিটিবি। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা ভিন্ন নাম ব্যবহার ও প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে এনসিটিবির থেকে বই ছাপার কাজ নিয়েছেন বলেও জানা গেছে।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু সাত প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে খবরের কাগজের কাছে স্বীকার করেছেন। কিন্তু কিসের প্রভাবে এই কাজ হলো–এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেননি। এই ঘটনার সঙ্গে তার নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও জানান।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ১ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ কিনতে ব্যয় হয় ৮ কোটি, লোপাট ৭ কোটি টাকা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
বাংলাদেশ রেলওয়ের ১ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ কিনতে ব্যয় হয় ৮ কোটি, লোপাট ৭ কোটি টাকা
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ রেলওয়ের বৈদ্যুতিক বিভাগের জন্য ডয়েজ ডিজেল ইঞ্জিন স্পেয়ার পার্টস কেনাকাটায় ৭ কোটি টাকার লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। রেলের যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় এই অনিয়মের বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে তৎপর হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের চিঠিতে বলা হয়েছে, রেলের এসব যন্ত্রাংশের বাজারমূল্য ছিল ১ কোটি টাকা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও রেলের অসাধু কর্মকর্তারা সেসব যন্ত্রাংশ কিনতে ৮ কোটি টাকা বিল উঠিয়ে নিয়েছেন। অতিরিক্ত ৭ কোটি টাকা এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই কেনাকাটায় প্রধান ভূমিকা পালন করে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তর। তাই এই কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নজরদারিতে রেখেছে দুদক। রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কাছে যন্ত্রাংশ কেনাকাটাসংক্রান্ত সব নথি চেয়ে চিঠি দিয়েছে দুদক। 

গত ২১ জুন দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এসব নথিপত্র চেয়ে পাঠানো হয়েছে। নথি জমা দেওয়ার জন্য আগামী ২২ জুলাই পর্যন্ত রেলওয়েকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এ চিঠি খবরের কাগজের হাতে এসেছে।

দুদকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বৈদ্যুতিক বিভাগের জন্য ১৪ আইটেম ডয়েজ ডিজেল ইঞ্জিন স্পেয়ার পার্টস কেনার ক্ষেত্রে এই নজিরবিহীন জালিয়াতি করা হয়েছে। ১ কোটি টাকার বাজারমূল্যের মালামাল ৮ কোটি টাকায় কেনা দেখিয়ে সরকারের ৭ কোটি টাকা ক্ষতি করা হয়েছে। অতিরিক্ত মূল্যে কেনার মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত এই অর্থ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও রেলওয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়েছে মর্মে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সরঞ্জাম বিভাগ থেকে তিনটি ই-জিপি টেন্ডার আইডির মাধ্যমে এই কেনাকাটা করা হয়।

অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে চারটি টেন্ডারের নথি চেয়ে চিঠি দিয়েছে।

দুদকের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে যে বিষয়গুলো চাওয়া হয়েছে সেগুলো হলো–দরপত্র পদ্ধতি অনুমোদনের পরিপত্র; বাজারদর এবং অনুমোদিত দাপ্তরিক প্রাক্কলনের চিঠি; বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা; দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন; কৃতকার্য দরদাতার ট্রেড লাইসেন্স, দরদাতার আয়কর-ভ্যাট-জাতীয় পরিচয়পত্র এবং সাধারণ অভিজ্ঞতার সনদপত্র।

কৃতকার্য দরদাতাকে দেওয়া রেলওয়ের স্বীকৃতিপত্র (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড), চুক্তিপত্র ও মালামাল সরবরাহসংক্রান্ত সব তথ্যসহ যাবতীয় কাগজপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি চেয়েছে দুদক।

নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তথ্য সরবরাহ না করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বেলাল হোসেন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে খবরের কাগজ। তাকে ফোন করা হয়; বার্তা পাঠানো হয় হোয়াটসঅ্যাপে। কিন্তু তিনি সাড়া দেননি। 

রেলওয়ের সরঞ্জাম কেনাকাটায় দুর্নীতি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। ২০২৩ সালে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে রেলের কেনাকাটায় ৭ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগে অনুসন্ধান চালায় দুদক। ২০২৪ সালে একই কার্যালয় অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ কিনে সরকারের দেড় কোটি টাকা অপচয় করেছে বলে পরিবহন অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। 

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে (সিআরবি) বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে যন্ত্রাংশ ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কিনে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠছে তিন বছর ধরে। ২০২৪ সালে লিফটিং জ্যাক, ড্রিলিং মেশিন ও কাটিং জ্যাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে ১ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিপরীতে ১৭-১৮ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করার অভিযোগও এসেছে অডিট প্রতিবেদনে। এ ছাড়া পণ্যের বাজারমূল্য নির্ধারণে অনিয়ম, টেন্ডারে জালিয়াতির অভিযোগে চট্টগ্রাম জেলা দুদক কার্যালয় একাধিকবার রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কার্যালয়ে (সিআরবি) অভিযান পরিচালনা করেছে।

রেলের অভ্যন্তরীণ তদন্তে একাধিক কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হলেও পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। 
সার্বিক বিষয়ে জানতে ও কথা বলতে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিনের দপ্তরে যাওয়ার অনুমতি চান এই প্রতিবেদক। তবে তিনি সাড়া দেননি।

ব্যবস্থাপনার সংকটে ডুবছে ঢাকা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫২ এএম
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:২২ এএম
ব্যবস্থাপনার সংকটে ডুবছে ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে আবারও নগর ব্যবস্থাপনার সংকট সামনে এসেছে। রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি–অসংখ্য এলাকা গত শনি ও রবিবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে তলিয়ে ছিল। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় পানি নামতে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও নগরজীবনে ব্যাপক ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় বিভিন্ন সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে, তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে গেছে, কোথাও আবার চুরি হয়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

রাজধানীর এই বেহাল অবস্থার জন্য শুধু অতিবৃষ্টিকে দায়ী করছেন না সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরাও। বরং তারা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, খাল দখল, নদী ভরাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নগর পরিচালনায় দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতাই জলাবদ্ধতাকে ভয়াবহ করে তুলেছে। যদিও সমস্যা চিহ্নিত হলেও সমাধানে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এখনো করেননি। 

এর আগে গত শুক্র-শনি-রবিবারের টানা বৃষ্টিতে হাজারও পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। নিচতলার বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদেরও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেক ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল পানিতে বিকল হয়ে পড়ে।

এসব বিষয়ে গতকাল বুধবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আয়োজিত এক সেমিনারে রাজধানীর জলাবদ্ধতার কারণ ও নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে রাজধানীর জলাবদ্ধতার দুটি প্রধান কারণ উঠে আসে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং খাল-নদী দখল। জলাবদ্ধতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ঢাকার প্রাকৃতিক খাল দখল ও ভরাট হওয়ার কারণেই জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যেসব খাল এখনো টিকে আছে, সেগুলো উদ্ধার, পরিষ্কার এবং নদীর সঙ্গে পুনঃসংযোগ করা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। 

মন্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, ‘তুরাগ নিয়মিতভাবে দখলের শিকার হয়েছে। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ দখলমুক্ত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। এই নদীগুলোকে বাঁচাতে না পারলে ঢাকা শহরকেও রক্ষা করা সম্ভব হবে না!’ 

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্যে দীর্ঘদিন থাকা সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক ও সমন্বয়হীনতার সংকট রয়েছে। তার ভাষায়, সিটি করপোরেশনগুলোকে আরও স্বাবলম্বী ও পূর্ণাঙ্গ কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সময়ের দাবি। রাজউক, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, ট্রাফিক পুলিশসহ নগর উন্নয়নে নিয়োজিত সব সংস্থাকে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামোর আওতায় না আনলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো সাময়িক বা মৌসুমি সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ড্রেনেজব্যবস্থা এবং অকার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলই এখন প্রতি বর্ষায় ভয়াবহ আকারে দেখা দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একসময়ে রাজধানীর বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম ছিল প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার। কিন্তু দখল ও ভরাটের কারণে অধিকাংশ খাল স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। কোথাও খাল সংকুচিত হয়েছে, কোথাও ময়লা-আবর্জনা ও পলিতে ভরে গেছে।

বুধবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, টানা জলাবদ্ধতায় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় অনেক সড়কের কার্পেটিং উঠে খোয়া ছড়িয়ে পড়েছে এবং ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে।

বাড্ডা লিংক রোডের একটি অংশ ধসে লেকে পড়ে গেছে। এ ছাড়া নিকেতন, মহানগর প্রজেক্ট, কাঁঠালবাগান, কলাবাগান, হাতিরপুল, রাজাবাজার, মীরবাগ, বংশাল, কদমতলীর পাটেরবাগ ও কোদারবাজার এলাকায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরা অংশের সার্ভিস রোডও দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। পুরান ঢাকার ধোলাইখালসংলগ্ন নারিন্দা মোড়ে ওয়াসার পুরোনো পানির পাইপ ফেটে মাটি সরে যাওয়ায় সড়কের একটি অংশ ধসে পড়েছে। ফলে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

জলাবদ্ধতার পাশাপাশি রাজধানীতে খোলা ম্যানহোলও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, রাজধানীর অসখ্য ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে গেছে। আবার কোথাও রাস্তা ভেঙে পড়ায় ম্যানহোলের ঢাকনা সহজে আলাদা হয়ে থাকছে, তা রিকশা-সিএনজিচালিত অটোচালকরা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

এর আগে গত রবিবার মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় কোমরসমান পানি জমে যায়। ওই সময় খোলা ম্যানহোলে এক পথচারী পানির স্রোতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেন। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গতকাল বুধবার ধানমন্ডি, পান্থপথ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পুরান ঢাকার একাধিক এলাকায় ম্যানহোলের ঢাকনা ছিল না–খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে না। রাজধানীর প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজব্যবস্থা চালু এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করার পাশাপাশি রাজউক, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও অন্য সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।

দায়িত্বে অবহেলাকারী সরকারি সংস্থাগুলোকে চিহ্নিত করে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ঢাকার নদী, খাল ও জলাশয়ের দখলদারদের তালিকা অনেক আগেই নদী রক্ষা কমিশন সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। কিন্তু এখনো তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের সহযোগী এবং দায়িত্বে অবহেলাকারী সরকারি সংস্থাগুলোকে চিহ্নিত করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শুধু বক্তব্য নয়, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শিল্পকারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ইটিপি ছাড়া পরিচালিত কারখানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নদীতীরের অননুমোদিত শিল্পকারখানা নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করা জরুরি।

ড. আদিলের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকলে খাল-নদী দখল ও দূষণ বন্ধ হবে না। এর ফলে ঢাকার বাতাস, পানি ও মাটির দূষণ যেমন বাড়বে, তেমনি প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

সাতকানিয়ায় সাঙ্গু নদীতে অন্ধকার নামলে শুরু হয় বালু লুট

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৬ এএম
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫১ এএম
সাতকানিয়ায় সাঙ্গু নদীতে অন্ধকার নামলে শুরু হয় বালু লুট
সাঙ্গু নদী থেকে অবাধে বালু উত্তোলন/ সংগৃহীত

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে সাঙ্গু নদী। দিনের বেলায় নদীর চারপাশ নীরব থাকলেও রাত হলেই দৃশ্যপট বদলে যায়। অন্ধকার নামার পর থেকে ভোর পর্যন্ত নদী থেকে দেদার বালু উত্তোলন করা হয়। সেই বালু চলে যায় ভিটা ভরাট কিংবা সড়ক সংস্কারের কাজে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে অবাধে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ হুমকির মুখে পড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড় ও চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নে সাঙ্গু নদীর বিভিন্ন অংশে রাতের আঁধারে ইঞ্জিনচালিত বোটের ওপর শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আবার অনেক জায়গায় নদীর চর কেটে বালু লুট করে ডাম্প ট্রাকে করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। 

সরেজমিনে ধোপাছড়ি বাজার, শঙ্খরকুল, বড়খোলা, পুরানগড় নতুনহাট, শীলঘাটা, বৈতরণি, কালীনগর ও লতাবুনিয়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন সময় রাতের আঁধারে সাঙ্গু নদী থেকে বালু উত্তোলন করে ভিটা ভরাটের পাশাপাশি সড়ক সংস্কারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত শ্যালো মেশিন স্থাপন করা ইঞ্জিনচালিত বোটগুলো তীরেই বেঁধে রাখা হয়েছে। আবার নদীর বেশ কয়েকটি অংশে ভেকুর সাহায্যে ২০ থেকে ২৫ ফুট গভীর গর্ত করে চরের বালু অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ধোপাছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন, ‘দিনের বেলায় মানুষ পারাপার ছাড়া নদীতে তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। তবে রাত গভীর হলে ড্রেজার, শ্যালো মেশিন, ভেকু ও ডাম্প ট্রাকের আনাগোনা বেড়ে যায়। বালু ব্যবসায়ীদের রোষানলে পড়ার ভয়ে স্থানীয়রা কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না। এ ছাড়া আমাদের ইউনিয়নটি উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি রয়েছে।’

পুরানগড় ইউনিয়নের বৈতরণি এলাকার মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘মাঝেমধ্যে নদীর এপারে বোটের ওপর শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করে ভিটা ভরাট করা হয়। তবে নদীর ওপারে প্রায় সময় রাতের আঁধারে ভেকুর সাহায্যে চর কেটে বালু লুট করা হয়। ওই সময় ভেকু ও ডাম্প ট্রাকের বিকট শব্দে ঘুমানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। নদী ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত অভিযান, কঠোর নজরদারি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’

দোহাজারী পৌরসভার দিয়াকুল গ্রামের যুবক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে বালু উত্তোলন চলছে। এতে নদীর তীর ভাঙনের পাশাপাশি বসতভিটাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের আশঙ্কা আরও বেড়ে যাচ্ছে। তাই দ্রুত অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’ 

স্থানীয় নদী সংরক্ষণ কর্মী নাছির উদ্দিন বলেন, নদী থেকে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এভাবে বালু তুললে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। এ ছাড়া নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। নদীভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘নদী ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন সর্বদা সচেষ্ট। বালু উত্তোলনের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছি। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।’

চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমান বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ পাওয়ার পর গ্রামপুলিশ পাঠিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়েছে। ধোপাছড়ি এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় সার্বক্ষণিক তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই আমরা অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’