ঢাকা ২ শ্রাবণ ১৪৩৩, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
সংসদে কুস্তি ভাইয়ে দোস্তি বিশ্বকাপের পর রেহানের সিনেমার প্রচার শুরু টঙ্গীর ‘শীর্ষ মাদকসম্রাজ্ঞী’ কারিমা গ্রেপ্তার মব একটি ঘৃণিত অপরাধ প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে ক্ষোভের মুখে জেলেনস্কি ১১-দলীয় জামায়াত জোটে ভাঙনের সুর অনির্দিষ্টকালের জন্য চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত ডেটাবেজ করে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ-পুনর্বাসনের টার্গেট শেষ পর্যন্ত লড়বে ইরান আকাশপানে মেসির এক পলক, তারপরই ঝলক স্লুইসগেট খুলবে কে নতুন দেখা উইস্টারিয়া ফুল ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফর স্থগিত রাজনৈতিক প্রভাবে কালো তালিকা থেকে মুক্তির অভিযোগ বৃষ্টির প্রভাবে ডিম মুরগি সবজির দাম বেড়েছে ‘মহাকাব্যেরও মহাকাব্য’ আর্জেন্টিনায় প্রশংসায় স্কালোনি ১৭ জুলাই: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ১৭ জুলাই: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স ‘মহাকাব্যেরও মহাকাব্য’ লাউতারোয় আর্জেন্টিনার নতুন মহাকাব্য যেভাবে সবকিছু ঘটছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য হতাশার মাঝেও আলো গর্ডন নিভে গেল আশার আলো, তবু উজ্জ্বল গর্ডন ১৭ জুলাই  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি মালভিনাস ব্যানারে নতুন বিতর্ক ফিফার দ্বারস্থ ব্রিটেন ব্রিটিশ মিডিয়ায় শোকের মাতম টুখেলের কাঁধে হারের দায় কিংবদন্তি অভিনেত্রী ডলি জহুরের জন্মদিন আজ পুনঃপরীক্ষা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড নৌবাহিনী প্রধান হলেন খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম

আকাশপানে মেসির এক পলক, তারপরই ঝলক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৯ এএম
আকাশপানে মেসির এক পলক, তারপরই ঝলক
ছবি: সংগৃহীত

এক গোলে পিছিয়ে আর্জেন্টিনা। ৫৫ মিনিটে গর্ডনের গোলে ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পর নিজেদের গোলপোস্ট অক্ষত রাখার জন্য চীনের প্রাচীর গড়ে তোলে তারা। ১১ জন খেলোয়াড়ই তখন নিজেদের সীমানা পাহারায় ব্যস্ত। আর্জেন্টিনার একমাত্র গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ছাড়া বাকি সবাই ইংল্যান্ডের সীমানায়। ২১ জন খেলোয়াড় একটি সীমানায় গিজ গিজ করছেন। বলের পেছনে দুই দলের একাধিক খেলোয়াড়। কখনো কখনো খেলোয়াড়দের জটলা এমনই আকার ধারণ করে যে, বলই দেখা যায়নি। এর মাঝে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা নিজেদের মাঝে বল আদান-প্রদান করে গোল করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। ইংল্যান্ডের রক্ষণ ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না। কখনো ভাঙা সম্ভব হলেও প্রাচীর হয়ে উঠছেন গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড। কখনো গোলপোস্ট। আবার কখনো কখনো রক্ষণের কোনো না কোনো খেলোয়াড়। এদিকে খেলার সময় ক্রমেই শেষের দিকে এগোচ্ছে। 

প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে মিসরের বিপক্ষে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পরও মেসি ম্যাজিকে পরে ৩-২ গোলে ম্যাচ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। এবার তো ১-০ গোলে পিছিয়ে। মাত্র একটি গোল। সেটি কি পরিশোধ করা সম্ভব হবে না? তাহলে কি মেসির আর্জেন্টিনার বিদায় ঘটবে। ফাইনালে খেলা হবে না! কোটি কোটি ভক্ত-সমর্থক হতাশায় নিমজ্জিত হবেন। খেলার সময় ৮০ মিনিটের কাঁটা অতিক্রম করে ফেলেছে। দর্শকরা ঘড়ির কাঁটা আর মাঠের খেলার দিকে সমানভাবে চোখ রাখছেন। ম্যাচের ৮৩ মিনিট। বক্সের বাইরে থেকে মেসির বাঁকানো ক্রস বার ঘেঁষে বাইরে চলে যায়। এমন সময় টিভি ক্যামেরা মেসির দিকে তাক করে। দেখা যায় মেসি আকাশপানে তাকাচ্ছেন। মেসি সচরাচর গোল করার পর এভাবে আকাশের পানে চেয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকেন।

এবার আকাশের পানে চেয়ে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করছেন হয়তো গোল না হওয়ার কারণে। মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে সহযোগিতা চাচ্ছিলেন, ‘এ যাত্রায় রক্ষা করো প্রভু। এটি আমার শেষ বিশ্বকাপ। অন্তত আরেকটিবার আমাকে ফাইনাল খেলার সুযোগ করে দাও।’ পরক্ষণেই গোল করে আর্জেন্টিনা। যার উৎস আবার ছিলেন স্বয়ং মেসি । বক্সের বাইরে থেকে লাউতারো মার্তিনেজের বুলেট গতির শট পিকফোর্ড লাফিয়ে পাঞ্চ করে কর্নার করে রক্ষা করেন। কর্নার শট মেসি সরাসরি না মেরে সামনে থাকা দলের একজনকে দেন। সেই বল আবার আসে মেসির কাছে। মেসি বল ধরে নিজের ক্যারিশমা দিয়ে বক্সের দিকে এগিয়ে গিয়ে না ঢুকে বক্সের ওপরে অনেকটা ফাঁকায় দাঁড়ানো এনজো মার্তিনেজকে দেন। এবার আর নিশানা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। না গোলরক্ষক পিকফোর্ট, না গোলপোস্ট, না অন্য কোনো খেলোয়াড় কেউই বাধার প্রাচীর হয়ে উঠতে পারেননি। এনজোর বুলেট গতির শট পিকফোর্ট চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি। বল তার আপন জায়গায় পৌঁছে যায়। উল্লাসে ফেটে পড়েন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা। মাঠে উপস্থিত দর্শকরা। আর টিভির কল্যাণে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অগণিত আর্জেন্টাইন সমর্থক। 

সবাই বলে থাকেন মেসি ‘গড গিফটেড’। বিধাতা যেন তাকে নিজ হাতে বানিয়েছেন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে ৩৯ বছর বয়সে এসেও তিনি যে খেলা খেলছেন, তা উপরওয়ালার আশীর্বাদ ছাড়া সম্ভব নয়। মেসির এই বয়সের খেলা দেখে ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও নিজেই বলেছেন, ‘মেসির বয়সে আমার ওজন ছিল ১২০ কেজি।’ উপরওয়ালার দিকে মাথা তুলে মেসির চাওয়া বিধাতা হয়তো শুনে থাকবেন। যার ফলাফল পাওয়া যায় সমতাসূচক গোল থেকে। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি মেসি। ইনজুরি টাইমে গিয়ে তিনি আবার দেখান ম্যাজিক। ডান প্রান্ত থেকে তার ডান পায়ের মাপা ক্রস কিছুক্ষণ আগে বদলি হিসেবে মাঠে নামা লাউতারো মার্তিনেজ ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের মাঝ থেকে লাফিয়ে উঠে বল জালে পাঠালে গগনবিদারী আওয়াজে সর্বত্র কেঁপে ওঠে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয় পটকা ফোটানো। সঙ্গে ভুভুজেলার আওয়াজ। সেই উল্লাস আর আওয়াজ থামেনি। খেলার শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাত্রা আরও বেড়ে যায়। রাতের আঁধার হারিয়ে গিয়ে চলে জয়োৎসব। এভাবেই আকাশপানে ক্ষণিকের চাহনিতে মেসি ফেরেন নিজের মতো করে। 

জিতেছে আর্জেন্টিনা। স্কোরশিটে নেই মেসির নাম। আছে এনজো ফার্নান্দেজ আর লাউতারো মার্তিনেজের। কিন্তু মেসিই আসল ত্রাতা। দুটি গোলের উৎসই তিনি। তার কারণেই আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো শেষ চার বিশ্বকাপে তিনবারই ফাইনালে। এর আগে তারা ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চার বিশ্বকাপে তিনবার খেলেছিল ফাইনাল। দুইবার হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন। এবার টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অবারিত সুযোগ। ১৯ জুলাই নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মেসি তার দল নিয়ে নামবেন টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মিশনে। যেখানে প্রতিপক্ষ স্পেন। 
ক্যারিয়ারের ক্রান্তিকালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম মাঠে নেমেছিলেন মেসি। ইংল্যান্ডরা টের পেয়েছে মেসির ঝাঁজ কী? ৮৫ মিনিট পর্যন্ত আটকে রাখতে পারলেও পরে আর পারেনি। ৭ মিনিটের ঝাঁজে তারা পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। যেমনটি প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে হয়েছিল মিসর। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও মেসি ঝলকে তারা হেরেছিল ৩-২ গোলে। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন মনে করেন এক মেসির কাছেই তারা হেরেছেন। তিনি বলেন, ‘মেসি তো আর এমনি এমনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হননি।’

ইংল্যান্ডের সাবেক গোলকিপার জো হার্টের মতে, ‘ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিট মেসি একাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন।’ ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের সাবেক খেলোয়াড় মিকা রিচার্ডসের দৃষ্টিতে মেসি হেঁটে হেঁটে খেলেন। তিনি বলেছেন, ‘মাঠের মধ্যে মেসি হেঁটে হেঁটে বেড়ান। কিন্তু বল পাওয়া মাত্রই তিনি জ্বলে ওঠেন এবং অধিকাংশ ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেন।’ তাদের কথার যথার্থতা পাওয়া যায় ম্যচের দিকে নজর ফেরালে। মেসি সফলভাবে ড্রিবলিং করেছেন ৯ বার।গোটা ইংল্যান্ড দলের ড্রিবলিং ছিল ৭টি। ইংল্যান্ডের বক্সে মেসি বল টাচ করেছেন ৭টি। আর্জেন্টিনার সীমানায় ইংল্যান্ড দলের টাচ ছিল মেসির সমান। মেসি একাই গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৪টি। ইংল্যান্ড দলের সুযোগও তৈরি হয়েছিল মেসির সমান ৪টি। মেসি সবচেয়ে বেশি ৯টি ক্রসও করেছেন।

মেসির সঙ্গে প্রথম দেখাতে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের নোনতা স্বাদ হয়েছে। তারা হয়তো এই ম্যাচ ভুলেই যেতে চাইবে। কিন্তু চাইলেই কি আর ভোলা সম্ভব হবে? ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনোর সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল আর ইতিহাসে শতাব্দীর সেরা গোল যেন বারবার সামনে আসে, তেমনি মেসিময় এই ম্যাচও আসবে আগামীতে। 

 

সব প্রাচীরই একদিন ভাঙে, ভাঙল পিকফোর্ডেরটাও

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
সব প্রাচীরই একদিন ভাঙে, ভাঙল পিকফোর্ডেরটাও
ছবি: সংগৃহীত

কখনো কখনো একজন গোলরক্ষক একাই একটি দলের শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠেন। গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি যেন বুক পেতে ঠেকিয়ে দেন প্রতিপক্ষের সব ঝড়। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে জর্ডান পিকফোর্ড ছিলেন ঠিক তেমনই এক প্রহরী। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তার দৃঢ়তা, ক্ষিপ্রতা আর অবিশ্বাস্য সব সেভ ইংল্যান্ডকে বারবার বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো- সব প্রাচীরেরই একদিন ভাঙন ধরে।

আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বুধবার রাতে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে সেই ভাঙনের সাক্ষী হয়েছে বিশ্ব। শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা হয়নি পিকফোর্ডের ইংল্যান্ডের। অদম্য আর্জেন্টাইনদের কাছে হেরে ফাইনাল খেলার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে।

ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছিল। কিন্তু প্রতিবারই তাদের সামনে অদম্য হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইংলিশ ক্লাব এভারটনে খেলা পিকফোর্ড। কখনো ডান দিকে ঝাঁপিয়ে, কখনো দুই হাত প্রসারিত করে, আবার কখনো বিদ্যুৎগতির প্রতিক্রিয়ায় নিশ্চিত গোল ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। যেন গোলপোস্টের সামনে একজন গোলরক্ষক নন, দাঁড়িয়ে ছিলেন এক অবিচল প্রাচীর।

ইংল্যান্ডও সেই আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে যায় ১-০ গোলে। সময় যত গড়িয়েছে, ইংলিশ সমর্থকদের স্বপ্ন ততই রঙিন হয়েছে। ম্যাচের ৮৪ মিনিট পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, বহু প্রতীক্ষার আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল বুঝি হাতছানি দিচ্ছে। কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝে সময়ের হিসাব মানে না। কয়েক মিনিটেই বদলে যায় ইতিহাসের রং। শেষ সাত মিনিটে যেন জেগে উঠে আর্জেন্টিনা। হঠাৎ করেই ম্যাচের ছন্দ বদলে যায়। একের পর এক আক্রমণে চাপ বাড়তে থাকে ইংল্যান্ডের রক্ষণে। এতক্ষণ যিনি একাই সব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, সেই পিকফোর্ডও শেষ পর্যন্ত আর পারেননি।

প্রথম গোলটি যেন ভেঙে দিয়েছিল ইংল্যান্ডের আত্মবিশ্বাস। আর দ্বিতীয় গোলটি নিভিয়ে দেয় ফাইনালের স্বপ্ন। পিকফোর্ডের গ্লাভস ছুঁয়ে যাওয়া বলও আর থামানো যায়নি। কয়েক মিনিটের ঝড়ে ভেসে গেছে ৮৪ মিনিট ধরে গড়ে তোলা সব আশা। তবু এই পরাজয় পিকফোর্ডের অবদানকে ম্লান করতে পারে না। স্কোরলাইন হয়তো বলবে ইংল্যান্ড হেরেছে ২-১ ব্যবধানে। কিন্তু যারা ম্যাচটি দেখেছেন, তারা জানেন ব্যবধান আরও বড় হতে পারত। পিকফোর্ডের একের পর এক দুর্দান্ত সেভই ইংল্যান্ডকে এতক্ষণ লড়াইয়ে টিকিয়ে রেখেছিল।

গোলরক্ষকের জীবনটাই এমন। অসংখ্য অসাধারণ সেভের পরও শেষ মুহূর্তে একটি বল জালে জড়ালেই সব আলো চলে যায় অন্যদিকে। অথচ সেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দলের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার গল্পটি অনেক সময় ফলাফলের আড়ালে চাপা পড়ে যায়।

২০২৬ বিশ্বকাপে ৩২ বছর বয়সী পিকফোর্ডের যাত্রা তাই কেবল একটি হারের গল্প নয়। এটি একজন যোদ্ধার গল্প, যিনি শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন। ভাগ্য শেষ পর্যন্ত তার পাশে দাঁড়ায়নি। কিন্তু তার সাহস, লড়াই আর আত্মনিবেদন বিশ্বকাপের স্মৃতিতে আলাদা জায়গা করে নেবে। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে ওঠা হয়নি ইংল্যান্ডের। শেষ রক্ষা হয়নি পিকফোর্ডেরও। তবু গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়ে যাওয়া সেই প্রহরীর নাম বিশ্বকাপের অধ্যায়ে শ্রদ্ধার সঙ্গেই উচ্চারিত হবে।

তবে পুরো ম্যাচজুড়েই পিকফোর্ডকে ঘিরে উত্তেজনা ছিল চোখে পডার মতো। আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে তার বাগবিতণ্ডাও হয়। অ্যান্থনি গর্ডন গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেওয়ার পর পিকফোর্ড উসকানিমূলক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তবে এনজো ফার্নান্দেজ সমতা ফেরানোর পর আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো তার কাছে দৌড়ে গিয়ে গোল উদযাপন করেন, যা ছিল পিকফোর্ডের আগের সেই উচ্ছ্বাসের জবাব।

ম্যাচজুড়ে বেশ কয়েকটি ভালো সেভ করলেও শেষ পর্যন্ত হার সঙ্গী হয়েছে ইংলিশদের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়া এই গোলরক্ষকের। ম্যাচ শেষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিকফোর্ড বলেন, ‘আমি বিধ্বস্ত। ছেলেদের জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। দল, স্টাফ এবং ভক্ত সবার জন্যই আমি ভীষণ দুঃখিত। আমরা ম্যাচের সিংহভাগ সময় দারুণ ফুটবল খেলেছি। কিন্তু একবার যখন আমরা ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেলাম, আমরা কেবল সেই ব্যবধান ধরে রাখার চেষ্টা করতে লাগলাম; যা এই সর্বোচ্চ স্তরের ফুটবলে মোটেও যথেষ্ট নয়। তাই আমি খুবই হতাশ। আমরা এখানে আসার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলাম। ছেলেরা তাদের দৌড়, ঘাম, রক্ত আর চোখের জল সব উজাড় করে দিয়েছিল। তাই এভাবে শেষ মুহূর্তে এসে হেরে যাওয়াটা সত্যিই বুক ভাঙার মতো।’

ম্যাচটি শুরুর আগে পিকফোর্ড বলেছিলেন তারা লিওনেল মেসি এবং পুরো আর্জেন্টিনা দলের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং মাথা ঠাণ্ডা রেখে ম্যাচটি জিততে চান। ব্যক্তিগতভাবে ম্যাচে তিনি বেশ কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ করে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও মেসির জাদুকরী দুটি অ্যাসিস্ট এবং আর্জেন্টিনার শেষ মুহূর্তের আক্রমণভাগের তীব্রতার কাছে শেষ পর্যন্ত পরাস্ত হতে হয়েছে পিকফোর্ড ও তার রক্ষণভাগকে। ফলে ১৯৬৬ সালের পর ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার স্বপ্ন আরও একবার অধরাই থেকে গেল।

‘মহাকাব্যেরও মহাকাব্য’ আর্জেন্টিনায় প্রশংসায় স্কালোনি

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:০০ এএম
‘মহাকাব্যেরও মহাকাব্য’ আর্জেন্টিনায় প্রশংসায় স্কালোনি
ছবি: সংগৃহীত

অমর প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেই চলেছে আর্জেন্টিনা। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের পর ২০২৬ সংস্করণে অদম্য লা আলবিসেলেস্তেরা। উত্তর আমেরিকায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা পিছিয়ে পড়েও যেভাবে বারবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে তা রূপকথার গল্পকেও হার হারায়। এমনই দলকে নিয়ে বলতে গিয়ে কোচ লিওনেল স্কালোনি বলে উঠলেন, ‘মহাকাব্যেরও মহাকাব্য।’

আটলান্টায় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর থ্রি লায়ন্সরা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়েছিল। সেই মুহূর্তেই জয়ের গন্ধ পেয়েছিল স্কালোনির দল এবং সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাপ্য ২-১ ব্যবধানের সাফল্য নিশ্চিত করে।

শিষ্যদের নজরকাড়া সেই পারফরম্যান্সের পর স্কালোনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়লেই এই দলটি সবচেয়ে ভালো ফুটবল খেলে। এটি ছিল কঠিন একটি ম্যাচ, কঠিন একটি পরিস্থিতি। জয়ের গন্ধ আমরা পেয়ে গিয়েছিলাম, আর আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। অন্তত আমার অনুভূতি ছিল ঠিক এমনই।’

স্কালোনি আরও বলেন, ‘আপনাকে শুধু লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। আমরা (ইংল্যান্ডের বিপক্ষে) ক্রসবারে বল মেরেছি। পোস্টেও বল লেগেছে, কিন্তু গোল হচ্ছিল না। ছয়-সাতটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তারপরও আমি খুবই সন্তুষ্ট, কারণ দলটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে। আমার মনে হয়, এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

নকআউট পর্বে এটি দ্বিতীয়বার, যখন ম্যাচে পিছিয়ে থেকেও জয় তুলে নিল আর্জেন্টিনা। এর আগে শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষেও নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিতেছিল তারা। সেই জয়কে তখন স্কালোনি ‘মহাকাব্যিক’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়কে কীভাবে বর্ণনা করবেন–এমন প্রশ্নের জবাবে স্কালোনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘মহাকাব্যেরও মহাকাব্য।’ রবিবার নিউ জার্সিতে ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে খেলবে আর্জেন্টিনা। স্কালোনির মতে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয় ছিল পুরো দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল, ‘এই দলটিকে ভাষায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটি আমাদের দলগত শক্তি, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতার এক অসাধারণ উদাহরণ।’

২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের আগে ও পরে দুটি কোপা আমেরিকা জিতে ইতোমধ্যেই তিনটি বড় শিরোপা জিতেছে আর্জেন্টিনা। এবার স্কালোনির সামনে সুযোগ রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দলটিকে টানা চারটি বড় শিরোপা এনে দেওয়ার।

স্কালোনি বলেন, ম্যাচে পিছিয়ে পড়লেও তার দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনো ধরনের ভয় বা চাপ কাজ করেনি, ‘আমি এই ছেলেদের চিনি। তারা কোনো কিছুকেই ভয় পায় না। তারা কাঁধে কোনো চাপ অনুভব করে না। তারা যেন সাত-আট বছরের শিশুদের মতো খেলছে। তারা এটা ভাবছে না যে, ‘সুযোগ মিস করলে কী হবে?’ কিংবা তারা সেমিফাইনাল বা ফাইনাল নিয়ে বাড়তি কিছু ভাবছে না।”

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স
ছবি: সংগৃহীত

চার বছর আগে মনে হয়েছিল, লিওনেল মেসির গল্প শেষ হয়ে গেছে। ৩৫ বছর বয়সে তিনি অবশেষে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সেটিই হবে বিশ্বকাপে তার শেষ ম্যাচ। আর অনেকের দৃষ্টিতে, সেটিই তাকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এরও চার বছর আগে, যখন তার বয়স ছিল ৩১, তখন অনেকেই এমনকি তার আশপাশের লোকেরাও মনে করেছিলেন, তিনি হয়তো নিজের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন এবং বিশ্বকাপ না জিতেই ক্যারিয়ার শেষ করবেন।

কিন্তু এখন মেসি ৩৯ বছর বয়সে। ইংল্যান্ডকে কার্যত বিধ্বস্ত করে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। মেসির দুটি অ্যাসিস্টের সৌজন্যে পিছিয়ে পড়েও ২-১ ব্যবধানে জয় পায় দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। ২০২৬ বিশ্বকাপে তার অ্যাসিস্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪-এ, সঙ্গে রয়েছে ৮টি গোল। তিনি এখন টুর্নামেন্টের যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতা। আগামী রবিবার নিউ জার্সিতে ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে স্পেন–যে দেশেই বার্সেলোনার হয়ে নিজের ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় খেলেছেন মেসি।

আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, ‘সে ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়। এটা প্রমাণ করার জন্য তার আর কী করার বাকি আছে, আমি জানি না। স্পেনের অধিকাংশ মানুষই তাকে ভালোবাসে।’ বিবিসির বিশ্লেষক মাইকা রিচার্ডস বলেন, “তাদের দলে লিওনেল মেসি আছে। তাদের দলে ‘গোট’ আছে। সর্বকালের সেরা। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো জুড বেলিংহাম কিংবা হ্যারি কেইন ম্যাচের ভাগ্য গড়বে। কিন্তু এ কারণেই সে রাজা।”

যেভাবে ভাঙলেন ইংল্যান্ডের স্বপ্ন
সাবেক বার্সেলোনা ও পিএসজি ফরোয়ার্ড মেসি এর আগে কখনোই ক্যারিয়ারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেননি। থমাস টুখেল এবং ইংল্যান্ডের প্রতিটি সমর্থক নিশ্চয়ই চাইবেন, সেটি যেন এখনো সত্যি থাকত। অভিজ্ঞ এই ফুটবলার প্রথমার্ধে মাঝমাঠের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থেকে কয়েকটি দারুণ ছোঁয়া দেখিয়েছিলেন। কিন্তু অ্যান্থনি গর্ডন ৫৫ মিনিটে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেওয়ার পরই যেন প্রাণ ফিরে পায় আর্জেন্টিনা।

টুখেল আরও ডিফেন্ডার নামানোর পর ইংল্যান্ড রক্ষণাত্মক হয়ে যায়। এর পরের ৩৭ মিনিটে আর্জেন্টিনার বল দখল ছিল ৮৮ শতাংশ। আর ডান প্রান্তে সরে যাওয়ার পর যেন উৎসব শুরু হয় মেসির। ম্যাচ শেষে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বলেন, ‘মেসিকে উইংয়ে নিয়ে যাওয়াটাই ছিল আমাদের জন্য মূল চাবিকাঠি।’ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসি ৯টি সফল ড্রিবল করেছেন এবং দুটি গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এক ম্যাচে এই দুটি কীর্তি একসঙ্গে গড়া প্রথম খেলোয়াড় তিনি।

আটলান্টায় পুরো ইংল্যান্ড দল মিলিয়ে সফল ড্রিবল করেছে ৭টি। প্রতিপক্ষের বক্সে মেসির বল স্পর্শ ছিল ৭ বার, যা পুরো ইংল্যান্ড দলের সম্মিলিত সংখ্যার সমান। একইভাবে তার তৈরি করা ৪টি সুযোগও পুরো ইংল্যান্ড দলের সমান। এছাড়া ম্যাচে সর্বোচ্চ ৯টি ক্রসও করেছেন তিনি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আর্জেন্টিনার দুটি গোলই এসেছে তার পাস থেকে। প্রথমটি ছিল কর্নার থেকে সাজানো আক্রমণে। সেখানে এনজো ফার্নান্দেজকে খুঁজে নেন মেসি, যিনি ৮৫ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শটে সমতা ফেরান।

এরপর ইনজুরি সময়ে লাউতারো মার্টিনেজের মাথায় বল তুলে দেন মেসি, যা থেকে আসে জয়সূচক গোল। সাবেক ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার মাইকা রিচার্ডস বলেন, ‘সে মাঠে হেঁটে বেড়ায়, তারপর বল পায়ে এলেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। তার সেই প্রতিভা তখনই সামনে আসে। আর অনেক সময় সেটাই পার্থক্য গড়ে দেয়।’ সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জো হার্ট বলেন, ‘ছেলেরা মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে যা করেছিল, আবার সেটাই করেছে–দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে লিওনেল মেসি পুরোপুরি স্বাধীনতা পেয়েছে। আর তার হাতেই ছিল সেই মাস্টার চাবি। শেষ ১৫ মিনিটে সে একাই পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে।’

ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন বলেন, ‘ম্যাচের বড় একটি সময় আমরা তাকে খুব ভালোভাবে সামলেছি। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড়দের মতোই, বল পায়ে পেলেই সে কিছু না কিছু সৃষ্টি করতে পারে। সে যে ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়, তার কারণ এটাই।’

গোল্ডেন বুট জিততে পারবেন?
এই গ্রীষ্মেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন মেসি। বিশ্বকাপে তার গোল এখন ২১টি, যা আর্জেন্টিনার হয়ে করা মোট ১২৫ গোলের অংশ। এই ২১ গোলের মধ্যে ১৫টিই এসেছে তার ৩৫তম জন্মদিনের পর। এই টুর্নামেন্টেই তিনি করেছেন ৮ গোল, যা ২০২২ বিশ্বকাপে করা তার ৭ গোলকে ছাড়িয়ে গেছে। সে বছর গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, যিনি করেছিলেন ৮ গোল। এবারও মেসি ও এমবাপ্পে দুজনেরই গোল ৮টি। শনিবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলবে এমবাপ্পের ফ্রান্স।

ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম ও হ্যারি কেইনের গোল ৬টি করে। তারাও এখনো প্রতিযোগিতায় রয়েছেন।

যদি একাধিক খেলোয়াড় সমান গোল করেন, তাহলে টাইব্রেকার হবে অ্যাসিস্ট। সেখানে মেসির ৪টি অ্যাসিস্ট, এমবাপ্পের ৩টি। এই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতাও হতে পারেন মেসি। বর্তমানে তিনি ফ্রান্সের মাইকেল অলিসের চেয়ে মাত্র একটি অ্যাসিস্ট পিছিয়ে। 

সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক পল রবিনসন বিবিসিকে বলেন, ‘সে এক ছোট্ট জাদুকর, সত্যিই তাই। পুরো টুর্নামেন্টে সে এটা করে যাচ্ছে। সে যত গোল করেছে, আবার ইংল্যান্ডের বক্সে যত বল পাঠিয়েছে–সবই দেখুন।’

কখনো কি ধীর হবেন?
অনেকেই ভুলে যান, ২০১৬ সালে বার্সেলোনার হয়ে খেলা ২৯ বছর বয়সী মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই অবসর নিয়েছিলেন। তার আগে তিনি ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরেছিলেন এবং টানা তিনটি কোপা আমেরিকার ফাইনালেও পরাজিত হয়েছিলেন। অবসর ভেঙে ফিরে আসার পর তিনি দুটি কোপা আমেরিকা জিতেছেন। ২০২২ সালে পিএসজির খেলোয়াড় হিসেবে কাতারে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পর মনে হয়েছিল, তার ক্যারিয়ারের ধাঁধার শেষ টুকরোটিও পূরণ হয়ে গেছে।

অনেকেই মনে করেছিলেন, সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়ের বিতর্কে এটিই ছিল শেষ প্রমাণ। কারণ বিশ্বকাপজয়ী পেলে ও ডিয়েগো ম্যারাডোনাকেই অনেকে এতদিন সবার ওপরে রাখতেন। ২০২২ সালের ফাইনালের আগে মেসি বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপ যাত্রা একটি ফাইনাল দিয়ে শেষ করতে পারছি, শেষ ম্যাচটি ফাইনালেই খেলব–এতে আমি খুবই আনন্দিত। এখন থেকে পরের বিশ্বকাপ পর্যন্ত অনেক বছর। আমি মনে করি না, আমি সেখানে খেলতে পারব। এভাবেই শেষ করতে পারা অসাধারণ।’

এরপরের বছর ইউরোপ ছেড়ে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর মনে হয়েছিল, তিনি ধীরে ধীরে ক্যারিয়ারের শেষের দিকে এগোচ্ছেন। এমনকি গত বছরের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও, যেখানে তিনি খেলেছিলেন, তখনো নিশ্চিত ছিল না যে তিনি এ গ্রীষ্মের বিশ্বকাপে খেলবেন কি না। কিন্তু তিনি এখনো আছেন। এখনো যেন অপ্রতিরোধ্য। যদিও তার খেলার ধরন বদলে গেছে। ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে এই টুর্নামেন্টে তিনি যে দূরত্ব অতিক্রম করেছেন, তার ৪৭ শতাংশই হেঁটে। আউটফিল্ড খেলোয়াড়দের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। স্প্যানিশ সাংবাদিক গিয়েম বালাগে, যিনি মেসির জীবনী লিখেছেন, বলেন–কৌশলগতভাবে মেসি অন্তত পাঁচবার নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন।

ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনার হয়ে টানা ১৩ ম্যাচে গোল করেছেন অথবা অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালেও যদি তিনি কোনো গোলে অবদান রাখেন, তাহলে ২০১১ সালে গড়া টানা ১৪ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্ট করার নিজের রেকর্ড স্পর্শ করবেন। এছাড়া তিনি কাফুর পর মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার কীর্তি গড়বেন। নিশ্চয়ই এটিই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ? কারণ ২০৩০ সালে তার বয়স হবে ৪৩।

কিন্তু এই পর্যায়ে এসে হয়তো আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ীকে নিয়ে আর কোনো কিছুই আগে থেকে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

‘মহাকাব্যেরও মহাকাব্য’

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
‘মহাকাব্যেরও মহাকাব্য’
ছবি: সংগৃহীত

অমর প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেই চলেছে আর্জেন্টিনা। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের পর ২০২৬ সংস্করণে অদম্য লা আলবিসেলেস্তেরা। উত্তর আমেরিকায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা পিছিয়ে পড়েও যেভাবে বারবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে তা রূপকথার গল্পকেও হার হারায়। এমনই দলকে নিয়ে বলতে গিয়ে কোচ লিওনেল স্কালোনি বলে উঠলেন, ‘মহাকাব্যেরও মহাকাব্য।’

আটলান্টায় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর থ্রি লায়ন্সরা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়েছিল। সেই মুহূর্তেই জয়ের গন্ধ পেয়েছিল স্কালোনির দল এবং সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাপ্য ২-১ ব্যবধানের সাফল্য নিশ্চিত করে। শিষ্যদের নজরকাড়া সেই পারফরম্যান্সের পর স্কালোনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়লেই এই দলটি সবচেয়ে ভালো ফুটবল খেলে। এটি ছিল কঠিন একটি ম্যাচ, কঠিন একটি পরিস্থিতি। জয়ের গন্ধ আমরা পেয়ে গিয়েছিলাম, আর আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। অন্তত আমার অনুভূতি ছিল ঠিক এমনই।’

স্কালোনি আরও বলেন, ‘আপনাকে শুধু লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। আমরা (ইংল্যান্ডের বিপক্ষে) ক্রসবারে বল মেরেছি। পোস্টেও বল লেগেছে, কিন্তু গোল হচ্ছিল না। ছয়-সাতটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তারপরও আমি খুবই সন্তুষ্ট, কারণ দলটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে। আমার মনে হয়, এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

নকআউট পর্বে এটি দ্বিতীয়বার, যখন ম্যাচে পিছিয়ে থেকেও জয় তুলে নিল আর্জেন্টিনা। এর আগে শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষেও নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিতেছিল তারা। সেই জয়কে তখন স্কালোনি ‘মহাকাব্যিক’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়কে কীভাবে বর্ণনা করবেন–এমন প্রশ্নের জবাবে স্কালোনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘মহাকাব্যেরও মহাকাব্য।’ রবিবার নিউ জার্সিতে ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে খেলবে আর্জেন্টিনা। স্কালোনির মতে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয় ছিল পুরো দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল, ‘এই দলটিকে ভাষায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটি আমাদের দলগত শক্তি, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতার এক অসাধারণ উদাহরণ।’

২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের আগে ও পরে দুটি কোপা আমেরিকা জিতে ইতোমধ্যেই তিনটি বড় শিরোপা জিতেছে আর্জেন্টিনা। এবার স্কালোনির সামনে সুযোগ রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দলটিকে টানা চারটি বড় শিরোপা এনে দেওয়ার। স্কালোনি বলেন, ম্যাচে পিছিয়ে পড়লেও তার দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনো ধরনের ভয় বা চাপ কাজ করেনি, ‘আমি এই ছেলেদের চিনি। তারা কোনো কিছুকেই ভয় পায় না। তারা কাঁধে কোনো চাপ অনুভব করে না। তারা যেন সাত-আট বছরের শিশুদের মতো খেলছে। তারা এটা ভাবছে না যে, ‘সুযোগ মিস করলে কী হবে?’ কিংবা তারা সেমিফাইনাল বা ফাইনাল নিয়ে বাড়তি কিছু ভাবছে না।”

হতাশার মাঝেও আলো গর্ডন নিভে গেল আশার আলো, তবু উজ্জ্বল গর্ডন

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:০০ এএম
হতাশার মাঝেও আলো গর্ডন নিভে গেল আশার আলো, তবু উজ্জ্বল গর্ডন
অ্যান্থনি মাইকেল গর্ডন। ছবি: সংগৃহীত

কখনো কখনো একটি গোল শুধু স্কোরলাইন বদলায় না। বদলে দেয় পুরো একটি জাতির স্বপ্নের রং। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলটি ঠিক তেমনই ছিল। মুহূর্তের মধ্যে ইংল্যান্ড স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, দীর্ঘ ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসান বুঝি এবারই হতে যাচ্ছে।

গর্ডনের গোলের পর আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ইংলিশ সমর্থকদের উল্লাসে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। কিন্তু ফুটবল যে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কোনো গল্পের সমাপ্তি লিখে না, সেটিই আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

শেষ দিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। ফলে ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

তবে ইংলিশদের এই পরাজয়ের অন্ধকারে গর্ডনের পারফরম্যান্স হারিয়ে যায়নি। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন গোলরক্ষকের প্রশংসা করে বলেন, ‘অ্যান্থনি গর্ডন অসাধারণ খেলেছে।

বড় মঞ্চে সে ভয় পায়নি। এমন ম্যাচে গোল করা সহজ নয়। আমরা ফল পাইনি, কিন্তু ও ভবিষ্যতের জন্য বড় বার্তা দিয়েছে।’ ইংল্যান্ডের কোচও গর্ডনের প্রশংসায় ছিলেন উদার।

টমাস টুখেলে বলেন, ‘গর্ডন পুরো ম্যাচে দারুণ শক্তি, গতি আর সাহস দেখিয়েছে। শুধু গোল নয়, সে প্রতিপক্ষকে সারাক্ষণ চাপে রেখেছে। এই পারফরম্যান্সই প্রমাণ করে, আগামী বছরগুলোতে ইংল্যান্ডের আক্রমণের অন্যতম ভরসা হতে পারে সে।’

সাবেক ইংলিশ ফুটবলারদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গর্ডনের প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, সেমিফাইনালের মতো চাপের ম্যাচে যেভাবে তিনি সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন, সেটি একজন পরিণত ফরোয়ার্ডের লক্ষণ।

অনেকেই লিখেছেন, ফল হতাশাজনক হলেও গর্ডন মাথা উঁচু করেই মাঠ ছাড়তে পারে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রাও গর্ডনের পারফরম্যান্সকে সম্মান জানিয়েছেন। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার নাহুয়েল মলিনা বলেন, ‘গর্ডন খুবই বিপজ্জনক ছিল। ওকে সামলাতে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে।’

তবে সবচেয়ে আবেগঘন কথাগুলো এসেছে গর্ডনের নিজের মুখ থেকেই। ম্যাচ শেষে চোখে স্পষ্ট হতাশা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা খুব কষ্টের। আমরা ফাইনালের খুব কাছে ছিলাম। গোল করার মুহূর্তটা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অনুভূতি ছিল। কিন্তু এখন সেটা উপভোগ করাও কঠিন। কারণ আমরা জিততে পারিনি।’

স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায় খেলা ২৫ বছর বয়সী এই উইঙ্গার বলেন, ‘আমি আমার সতীর্থদের নিয়ে গর্বিত। আমরা শেষ পর্যন্ত লড়েছি। সমর্থকদের জন্য খারাপ লাগছে, কারণ তারা আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিল। কিন্তু আমরা ফিরে আসব। এই দল আরও শক্তিশালী হবে।’

নিজের গোল নিয়ে গর্ডনের মন্তব্য ছিল সংযত, ‘ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলের জয় আমার কাছে অনেক বড়। গোল করেছি, কিন্তু সেটা কোনো আনন্দ এনে দিচ্ছে না। যদি সেই গোল আমাদের ফাইনালে তুলতে পারত, তাহলে হয়তো আজকের অনুভূতিটা অন্যরকম হতো।’

বিশ্বকাপের এই আসরে গর্ডনের উত্থানও কম নাটকীয় নয়। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউট; প্রতিটি ধাপে নিজের গতি, নির্ভীক ড্রিবলিং এবং গোল করার দক্ষতায় তিনি নজর কেড়েছেন। সেমিফাইনালের গোলটি যেন সেই আত্মবিশ্বাসেরই প্রতিচ্ছবি।

ইংল্যান্ডের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি। গর্ডনের জ্বালানো আশার আলোও শেষ বাঁশির আগে নিভে গেছে। কিন্তু অনেক সময় হারও ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো ইংল্যান্ডকে আরেকটি হৃদয়ভাঙার গল্প উপহার দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি নতুন নায়কের জন্মও দেখেছে।

ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙেছে, কিন্তু গর্ডনের নামটি থেকে গেছে আলোচনার কেন্দ্রেই। ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ গোলের আত্মবিশ্বাস হয়তো তার সামনের পথচলায় টনিক হিসেবে কাজ করবে।