এক গোলে পিছিয়ে আর্জেন্টিনা। ৫৫ মিনিটে গর্ডনের গোলে ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পর নিজেদের গোলপোস্ট অক্ষত রাখার জন্য চীনের প্রাচীর গড়ে তোলে তারা। ১১ জন খেলোয়াড়ই তখন নিজেদের সীমানা পাহারায় ব্যস্ত। আর্জেন্টিনার একমাত্র গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ছাড়া বাকি সবাই ইংল্যান্ডের সীমানায়। ২১ জন খেলোয়াড় একটি সীমানায় গিজ গিজ করছেন। বলের পেছনে দুই দলের একাধিক খেলোয়াড়। কখনো কখনো খেলোয়াড়দের জটলা এমনই আকার ধারণ করে যে, বলই দেখা যায়নি। এর মাঝে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা নিজেদের মাঝে বল আদান-প্রদান করে গোল করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। ইংল্যান্ডের রক্ষণ ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না। কখনো ভাঙা সম্ভব হলেও প্রাচীর হয়ে উঠছেন গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড। কখনো গোলপোস্ট। আবার কখনো কখনো রক্ষণের কোনো না কোনো খেলোয়াড়। এদিকে খেলার সময় ক্রমেই শেষের দিকে এগোচ্ছে।
প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে মিসরের বিপক্ষে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পরও মেসি ম্যাজিকে পরে ৩-২ গোলে ম্যাচ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। এবার তো ১-০ গোলে পিছিয়ে। মাত্র একটি গোল। সেটি কি পরিশোধ করা সম্ভব হবে না? তাহলে কি মেসির আর্জেন্টিনার বিদায় ঘটবে। ফাইনালে খেলা হবে না! কোটি কোটি ভক্ত-সমর্থক হতাশায় নিমজ্জিত হবেন। খেলার সময় ৮০ মিনিটের কাঁটা অতিক্রম করে ফেলেছে। দর্শকরা ঘড়ির কাঁটা আর মাঠের খেলার দিকে সমানভাবে চোখ রাখছেন। ম্যাচের ৮৩ মিনিট। বক্সের বাইরে থেকে মেসির বাঁকানো ক্রস বার ঘেঁষে বাইরে চলে যায়। এমন সময় টিভি ক্যামেরা মেসির দিকে তাক করে। দেখা যায় মেসি আকাশপানে তাকাচ্ছেন। মেসি সচরাচর গোল করার পর এভাবে আকাশের পানে চেয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকেন।
এবার আকাশের পানে চেয়ে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করছেন হয়তো গোল না হওয়ার কারণে। মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে সহযোগিতা চাচ্ছিলেন, ‘এ যাত্রায় রক্ষা করো প্রভু। এটি আমার শেষ বিশ্বকাপ। অন্তত আরেকটিবার আমাকে ফাইনাল খেলার সুযোগ করে দাও।’ পরক্ষণেই গোল করে আর্জেন্টিনা। যার উৎস আবার ছিলেন স্বয়ং মেসি । বক্সের বাইরে থেকে লাউতারো মার্তিনেজের বুলেট গতির শট পিকফোর্ড লাফিয়ে পাঞ্চ করে কর্নার করে রক্ষা করেন। কর্নার শট মেসি সরাসরি না মেরে সামনে থাকা দলের একজনকে দেন। সেই বল আবার আসে মেসির কাছে। মেসি বল ধরে নিজের ক্যারিশমা দিয়ে বক্সের দিকে এগিয়ে গিয়ে না ঢুকে বক্সের ওপরে অনেকটা ফাঁকায় দাঁড়ানো এনজো মার্তিনেজকে দেন। এবার আর নিশানা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। না গোলরক্ষক পিকফোর্ট, না গোলপোস্ট, না অন্য কোনো খেলোয়াড় কেউই বাধার প্রাচীর হয়ে উঠতে পারেননি। এনজোর বুলেট গতির শট পিকফোর্ট চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি। বল তার আপন জায়গায় পৌঁছে যায়। উল্লাসে ফেটে পড়েন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা। মাঠে উপস্থিত দর্শকরা। আর টিভির কল্যাণে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অগণিত আর্জেন্টাইন সমর্থক।
সবাই বলে থাকেন মেসি ‘গড গিফটেড’। বিধাতা যেন তাকে নিজ হাতে বানিয়েছেন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে ৩৯ বছর বয়সে এসেও তিনি যে খেলা খেলছেন, তা উপরওয়ালার আশীর্বাদ ছাড়া সম্ভব নয়। মেসির এই বয়সের খেলা দেখে ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও নিজেই বলেছেন, ‘মেসির বয়সে আমার ওজন ছিল ১২০ কেজি।’ উপরওয়ালার দিকে মাথা তুলে মেসির চাওয়া বিধাতা হয়তো শুনে থাকবেন। যার ফলাফল পাওয়া যায় সমতাসূচক গোল থেকে। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি মেসি। ইনজুরি টাইমে গিয়ে তিনি আবার দেখান ম্যাজিক। ডান প্রান্ত থেকে তার ডান পায়ের মাপা ক্রস কিছুক্ষণ আগে বদলি হিসেবে মাঠে নামা লাউতারো মার্তিনেজ ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের মাঝ থেকে লাফিয়ে উঠে বল জালে পাঠালে গগনবিদারী আওয়াজে সর্বত্র কেঁপে ওঠে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয় পটকা ফোটানো। সঙ্গে ভুভুজেলার আওয়াজ। সেই উল্লাস আর আওয়াজ থামেনি। খেলার শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাত্রা আরও বেড়ে যায়। রাতের আঁধার হারিয়ে গিয়ে চলে জয়োৎসব। এভাবেই আকাশপানে ক্ষণিকের চাহনিতে মেসি ফেরেন নিজের মতো করে।
জিতেছে আর্জেন্টিনা। স্কোরশিটে নেই মেসির নাম। আছে এনজো ফার্নান্দেজ আর লাউতারো মার্তিনেজের। কিন্তু মেসিই আসল ত্রাতা। দুটি গোলের উৎসই তিনি। তার কারণেই আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো শেষ চার বিশ্বকাপে তিনবারই ফাইনালে। এর আগে তারা ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চার বিশ্বকাপে তিনবার খেলেছিল ফাইনাল। দুইবার হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন। এবার টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অবারিত সুযোগ। ১৯ জুলাই নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মেসি তার দল নিয়ে নামবেন টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মিশনে। যেখানে প্রতিপক্ষ স্পেন।
ক্যারিয়ারের ক্রান্তিকালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম মাঠে নেমেছিলেন মেসি। ইংল্যান্ডরা টের পেয়েছে মেসির ঝাঁজ কী? ৮৫ মিনিট পর্যন্ত আটকে রাখতে পারলেও পরে আর পারেনি। ৭ মিনিটের ঝাঁজে তারা পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। যেমনটি প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে হয়েছিল মিসর। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও মেসি ঝলকে তারা হেরেছিল ৩-২ গোলে। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন মনে করেন এক মেসির কাছেই তারা হেরেছেন। তিনি বলেন, ‘মেসি তো আর এমনি এমনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হননি।’
ইংল্যান্ডের সাবেক গোলকিপার জো হার্টের মতে, ‘ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিট মেসি একাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন।’ ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের সাবেক খেলোয়াড় মিকা রিচার্ডসের দৃষ্টিতে মেসি হেঁটে হেঁটে খেলেন। তিনি বলেছেন, ‘মাঠের মধ্যে মেসি হেঁটে হেঁটে বেড়ান। কিন্তু বল পাওয়া মাত্রই তিনি জ্বলে ওঠেন এবং অধিকাংশ ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেন।’ তাদের কথার যথার্থতা পাওয়া যায় ম্যচের দিকে নজর ফেরালে। মেসি সফলভাবে ড্রিবলিং করেছেন ৯ বার।গোটা ইংল্যান্ড দলের ড্রিবলিং ছিল ৭টি। ইংল্যান্ডের বক্সে মেসি বল টাচ করেছেন ৭টি। আর্জেন্টিনার সীমানায় ইংল্যান্ড দলের টাচ ছিল মেসির সমান। মেসি একাই গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৪টি। ইংল্যান্ড দলের সুযোগও তৈরি হয়েছিল মেসির সমান ৪টি। মেসি সবচেয়ে বেশি ৯টি ক্রসও করেছেন।
মেসির সঙ্গে প্রথম দেখাতে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের নোনতা স্বাদ হয়েছে। তারা হয়তো এই ম্যাচ ভুলেই যেতে চাইবে। কিন্তু চাইলেই কি আর ভোলা সম্ভব হবে? ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনোর সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল আর ইতিহাসে শতাব্দীর সেরা গোল যেন বারবার সামনে আসে, তেমনি মেসিময় এই ম্যাচও আসবে আগামীতে।