বন্যা-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সরকার ডেটাবেজ তৈরি করে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডেটাবেজের আওতায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে তাদের প্রয়োজন অনুসারে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ বিতর্কমুক্ত রাখতে দলীয় নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ত না করে মাঠ প্রশাসনের যোগ্য কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে সাত জেলায় আকস্মিক বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সমন্বিত পরিকল্পনা কাজে লাগানোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই আন্তমন্ত্রণালয় সভায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সভা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত, বীজ ও সারসহ বিশেষ কৃষি প্যাকেজ বিতরণ, ক্ষতিগ্রস্তদের জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি, বাঁধ ও সড়ক দ্রুত মেরামত, স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা এবং ত্রাণ বিতরণে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বন্যা নিয়ে অপপ্রচার ঠেকাতে প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলন করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই ভয়াবহ বন্যাকে শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সুশাসনের জন্য পরীক্ষা হিসেবেও দেখতে চাইছে সরকার। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় দেশের বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ, উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ত্রাণ বিতরণে দলীয় হস্তক্ষেপ এড়িয়ে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করাই সরকারের লক্ষ্য। কার্যতালিকার আওতায় রয়েছে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত, পুনর্বাসনের জন্য জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি এবং বন্যা-পরবর্তী পুনর্গঠনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভায় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বক্তারা জানিয়েছেন, বন্যা মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন ত্রাণ বিতরণ নয়; বরং পানি নেমে যাওয়ার পর দুর্গত মানুষকে পুনর্বাসন করা। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনাও রয়েছে সরকারের লক্ষ্যে। এ জন্যই সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে।
আন্তমন্ত্রণালয় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং কার্যক্রম সফল করতে ত্রাণ বিতরণে কোনো অনিয়ম, অপচয় বা বিতর্কের সুযোগ রাখা যাবে না। স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি স্লুইসগেট পরিচালনায় ইজারাভিত্তিক ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনারও আহ্বান জানান, যেন পানি নিষ্কাশনে কোনো বাধা না থাকে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের একটি নির্ভুল ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। সেই ডেটাবেজের ভিত্তিতেই পুনর্বাসন, কৃষি সহায়তা ও আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে। তিনি সরকারি ত্রাণ কার্যক্রমে দলীয় ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত না করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এতে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও একই মত দিয়ে বলেন, সরকারি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হলে সবচেয়ে কার্যকর হবে।
সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, সাত জেলার ৫৯ উপজেলা, ৩৬৮ ইউনিয়ন ও ১২ পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। প্রায় ৬ লাখ ৯ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেড় লাখের বেশি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। পাহাড়ধস ও বন্যায় ৫৪ জন নিহত হয়েছেন। ইতোমধ্যে এক হাজার ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, ১০ হাজার ৫০৪ হেক্টর বীজতলা নষ্ট হয়েছে। কৃষকদের পুনর্বাসনে ধানের বীজ ও সারসহ বিশেষ কৃষি প্যাকেজ দেওয়া হবে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন (বকুল) জানান, পানিবাহিত রোগ মোকাবিলায় বিপুল পরিমাণ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, স্যালাইন ও অ্যান্টি-স্নেক ভেনম সরবরাহ করা হয়েছে এবং দুর্গত এলাকার চিকিৎসক-নার্সদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
সভায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বন্যা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব প্রতিরোধে নিয়মিত সরকারি ব্রিফিং করা হবে। এ জন্য সব মন্ত্রণালয়কে প্রতিদিন তথ্য সরবরাহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সভায় নেওয়া কয়েকটি সিদ্ধান্তের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি, বীজ ও সার প্যাকেজ বিতরণ, সড়ক-বাঁধ দ্রুত মেরামত, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু, পশুসম্পদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি পানি নেমে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।