ফুটবলে কিছু গল্প থাকে অপেক্ষার। কিছু গল্প প্রত্যাবর্তনের। আর কিছু গল্প লেখা হয় সেসব খেলোয়াড়দের নিয়ে, যারা ব্যর্থতার অন্ধকার পেরিয়ে একদিন আলোর কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে যান। ২০২৬ বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনার জার্সিতে লাউতারো মার্তিনেজের গল্পটা ঠিক তেমনই।
চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই সাফল্যের উজ্জ্বল আলোয় দাঁড়িয়েও কোথাও যেন আড়ালে রয়ে গিয়েছিলেন লাউতারো। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে একের পর এক গোল করা এই স্ট্রাইকার চূড়ান্ত পর্বে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছিলেন নিজেকে। কোনো লক্ষ্যভেদ নেই। গোলশূন্য এক বিশ্বকাপ শেষ হয়েছিল তার জন্য। সমালোচনা, হতাশা আর অপূর্ণতার ভার নিয়ে ফিরতে হয়েছিল তাকে।
কিন্তু বড় খেলোয়াড়রা কিছু নিয়ম মেনে চলেন। ব্যর্থতাও তাদের সঙ্গী হয়। তবে ব্যর্থতাকে শেষ অধ্যায় হতে দেন না। তারা সেটিকে নতুন শুরুর ভিত্তি বানান। লাউতারোও তাই করেছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপের পথে আর্জেন্টিনার অন্যতম ভরসার নাম ছিলেন তিনি। বাছাইপর্বে ধারাবাহিক গোল করে দলের আক্রমণভাগকে শক্তিশালী করেছেন। কিন্তু প্রকৃত উত্তর তিনি দিয়েছেন বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে।
গ্রুপ পর্বে জর্ডানের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করা দিয়ে শুরু। এরপর নকআউট পর্বে তার গুরুত্ব আরও বাড়তে থাকে। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনার ৩-১ গোলের জয়ে শেষ গোলটি করে ম্যাচের ভাগ্য নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। তখনই বোঝা যাচ্ছিল, কাতারের সেই গোলহীন লাউতারো আর নেই।
কিন্তু সবচেয়ে বড় মুহূর্তটি তিনি তুলে রাখেন সেমিফাইনালের জন্য। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। দুই পরাশক্তির লড়াইয়ে যখন ম্যাচ এগোচ্ছে স্নায়ুচাপের চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন কোচের নির্দেশে বেঞ্চ থেকে মাঠে নামেন লাউতারো মার্তিনেজ। দুই দলের সমর্থকরা অপেক্ষা করছে একটি ভুল কিংবা একটি জাদুকরী মুহূর্তের।
আর সেই জাদুকরী মুহূর্তের মালিক হন লাউতারো। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষ। ইনজুরি সময়ে আর্জেন্টিনার আক্রমণ থেকে সৃষ্টি হওয়া সুযোগে দুর্দান্ত ফিনিশে বল জড়িয়ে দেন জালে। অধিনায়ক লিওনেল মেসির ডান প্রান্ত থেকে বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া বলে শূন্যে ভেসে অসাধারণ এক হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় ইংল্যান্ডের স্বপ্ন, আর বিস্ফোরিত হয় আর্জেন্টিনার উল্লাস। সেই গোলই নির্ধারণ করে ম্যাচের ভাগ্য। ২-১ গোলের জয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা।
গোলটি শুধু একটি জয়সূচক গোল ছিল না। সেটি ছিল চার বছরের অপেক্ষার অবসান। ছিল সমালোচকদের জবাব। ছিল নিজের ওপর বিশ্বাস না হারানোর পুরস্কার। লাউতারোর ক্যারিয়ার পরিসংখ্যানও এখন তার গুরুত্বের সাক্ষ্য দেয়। জাতীয় দলের জার্সিতে ৮৪ ম্যাচে ৪০ গোল করেছেন তিনি। আর্জেন্টিনার ইতিহাসে অন্যতম নির্ভরযোগ্য গোলদাতাদের কাতারে নিজের নাম আরও উজ্জ্বল করে তুলছেন প্রতিনিয়ত। তবে সংখ্যার বাইরেও তার মূল্য এখন অনেক বেশি। কারণ বড় ম্যাচে, বড় মঞ্চে, বড় মুহূর্তে তিনি দলের জন্য পার্থক্য গড়ে দিচ্ছেন।
ফুটবলের ইতিহাসে অনেক নায়ক আছেন, যারা শুরু থেকেই আলোয় ছিলেন। আবার কিছু নায়ক আছেন, যারা অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসে আলো কেড়ে নিয়েছেন নিজেদের জন্য। লাউতারো মার্তিনেজ এখন সেই দ্বিতীয় দলের প্রতিনিধি।
কাতারের বিশ্বকাপে যে ফরোয়ার্ড একটি গোলের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন, আমেরিকার বিশ্বকাপে সেই ফরোয়ার্ডই আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছেন। ব্যর্থতার স্মৃতি পেছনে ফেলে তিনি আজ শুধু একজন গোলদাতা নন, তিনি আর্জেন্টিনার নতুন আশার প্রতীক, নতুন মহাকাব্যের এক উজ্জ্বল চরিত্র।
আর্জেন্টিনা যদি শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতে যায়, তাহলে হয়তো ইতিহাস লিখবে- ২০২৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির স্বপ্নযাত্রার অন্যতম মহান সহযাত্রীর নাম ছিল লাউতারো মার্তিনেজ। তার একটি গোল বদলে দিয়েছিল পুরো টুর্নামেন্টের গল্প।