বিশেষ তহবিল থেকে ঋণদান কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে। যদি এই কার্যক্রম সঠিকভাবে ব্যবহার করা না যায় তাহলে সম্পূর্ণ পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং তা দেশের অর্থনীতি বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।...
দেশে কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সামাজিক নানা কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশা মতো বাড়তে পারেনি বরং কমেছে। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।
বর্তমান অবস্থায় অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকই নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। ফলে যে মাত্রায় নতুন বিনিয়োগ হওয়া প্রয়োজন ছিল তা হয়নি। সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক, জিডিপি-বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের রেশিও দাঁড়িয়েছে ২২.০৩ শতাংশ, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২০১৬) জুলাই-এপ্রিল সময়ে প্রাইভেট সেক্টরে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৩.২০ শতাংশ।
সরাসরি নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যদিও আন্তকোম্পানি ঋণ এবং পুনর্বিনিয়োগ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনি অঙ্গীকার হচ্ছে, আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি অর্জন।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। এজন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী ৮ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন চলমান কাঠামোগত রূপান্তর প্রক্রিয়ার মৌলিক পুনর্গঠন এবং একটি নতুন উন্নয়ন কাঠামো গ্রহণ, যা দেশের অর্থনীতি ও সমাজের অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই উন্নয়নে সহায়ক হবে।
নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্থাৎ ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে এই মুহূর্তে গড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এ অবস্থায় গত ২৩ মে চলমান দেশি ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যে বন্ধ ও সংকটগ্রস্ত শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, বেসরকারি খাতের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা ও সার্বিকভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এ প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো থেকে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা সরকারি প্যারান্টির অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে। এই পুনঃঅর্থায়ন সহায়তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান, কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট-মাঝারি শিল্প পুনরুজ্জীবন, কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনয়ন।
এই প্যাকেজের আওতায় বৃহৎশিল্পের জন্য গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। পুনঃঅর্থায়ন অংশের অধীনে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বরাদ্দ করা হয়েছে। অর্থাভাবে যেসব প্রকল্প বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারছে না, অথবা চলতি মূলধনের অভাবে প্রকল্প বন্ধ হয়ে আছে, এমন প্রকল্পের জন্য এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। একটি কোম্পানি সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ শতাংশ সুদে সিডিউল ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেবে আর ব্যাংকগুলো গ্রাহক পর্যায়ে ঋণদানকালে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ আরোপ করবে। কৃষি ও গ্রামীণ কার্যক্রদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা, সিএনএসএমইর জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ কার্যক্রমের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উত্তরবঙ্গের কৃষি উন্নয়নের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে কয়েকটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়নও পরিচালনা করবে, যার মধ্যে রয়েছে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্সিংয়ের জন্য হাজার কোটি টাকা, কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, চামড়া ও জুতা রপ্তানি এবং হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানির জন্য ২ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া, স্টার্টআপ, সৃজনশীল অর্থনীতি প্রকল্প, সবুজ অর্থায়ন ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং বেকার যুবকদের জন্য পৃথক বরাদ্দ রাখা হবে।
৬০ হাজার কোটি টাকার যে ঋণদান কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব তহবিল থেকে একটি অংশ বিনিয়োগ করতে হবে। দেশের অধিকাংশ ব্যাংক এখন বিনিয়োগযোগ্য আমানত সংকটে ভুগছে। তারা কি বিশেষ তহবিলের আওতায় ঋণদান করতে সক্ষম হবে? আর বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ তহবিলের যে অংশ পুনঃঅর্থায়ন করবে সেই ঋণও তো সিডিউল ব্যাংকগুলোকে প্রাথমিক পর্যায়ে নিজেদের তহবিল থেকেই বিনিয়োগ করতে হবে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারা পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই অর্থ বিনিয়োগের জন্য তারা কীভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, সেটাই বিবেচ্য বিষয়।
ঋণদানের ক্ষেত্রে এমন সব প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে যারা চলতি মূলধন পেলেই তাদের উৎপাদন কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবে। বিশেষ তহবিল থেকে ঋণগ্রস্তদের ক্ষেত্রে কয়েকটি দিক বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রশ্ন হলো, এই তহবিল থেকে কাদের ঋণদান করা হবে? ঢালাওভাবে ঋণদানের কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি প্রকল্পকে কেস-টু-কেস যাচাই করে উপযুক্ততা মোতাবেক ঋণ দান করতে হবে।
যেসব প্রকল্প দক্ষ ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে কিন্তু চলতি মূলধনের অভাবে লাভ করতে পারছে না অথবা উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না, এমন প্রকল্পগুলোকে খানদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কিছু কিছু প্রকল্প আছে যেগুলো ব্যবস্থাপনা অদক্ষতা বা পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে বন্ধ হয়ে আছে অথবা অপটিমাম লেভেলে উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে পারছে না, তাদের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান না করে নতুনভাবে ঋগদান করা হলে কোনো লাভ হবে না। এতে শুধু অর্থের অপচয় হবে।
বিশেষ তহবিল থেকে ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রোডাকটিভ সেক্টরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এমন সব প্রকল্প বাছাই করতে হবে যেখানে ঋণদান করা হলে বিপুল সংখ্যক নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ ঋণদানের ক্ষেত্রে শ্রমঘন শিল্প প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেমন– ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ঋণদানের চেয়ে উৎপাদনশীল শিল্প-কারখানার জন্য ঋণদান করা হলে তা বেশি যৌক্তিক হবে। একই এলাকায় যাতে শিল্পের স্থানীয়করণ না হয় তা বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষ তহবিল থেকে ঋণদানের ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলা-উপজেলাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এ ছাড়া, এমন প্রকল্পে ঋণদান করতে হবে যা রপ্তানিনির্ভর।
বিশেষ তহবিলের মাপ এমনভাবে বিতরণ করা যাবে না যাতে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। অর্থাৎ আমরা বলতে চাচ্ছি, যারা ইচ্ছাকৃত এবং পরীক্ষিত ঋণখেলাপি কিন্তু পরবর্তী সময়ে আইনি সুবিধার আওতায় নিজেদের ঋণখেলাপিমুক্ত দেখিয়েছেন, তাদের বিশেষ তহবিল থেকে ঋণপ্রাপ্তির জন্য সর্বাবস্থায় অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। যারা বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা জটিলতার কারণে উৎপাদন শুরু করতে পারছে না অথবা উৎপাদন শুরু করলেও পূর্ণোদ্যমে উৎপাদনে যেতে পারছে না তাদের ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রত্যন্ত এলাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাবে তাদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারছেন না। তাদের বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। রিয়েল সেক্টর উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত এবং অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম এমন প্রকল্পে ঋণ দান করা হলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। বৃহৎশিল্প বিকাশের প্রয়োজন আছে। তবে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হচ্ছে সিএমএসএমই খাতের বিকাশ ঘটানো। সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ঋণখেলাপির হার তুলনামূলকভাবে কম।
বিশেষ তহবিল থেকে ঋণদান কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে। যদি এই কার্যক্রম সঠিকভাবে ব্যবহার করা না যায় তাহলে সম্পূর্ণ পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং তা দেশের অর্থনীতি বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তী
সরকারের অর্থ উপদেষ্টা
.jpg)
