হরমুজ প্রণালিকে ইরানের জন্য অলঙ্ঘনীয় ‘রেড লাইন’ বলে ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সব অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে টানা পঞ্চম দিনের মতো ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন আবারও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শনিবার ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।
প্রথম দফার হামলার পর ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্তিত্বের লড়াই করছি।’
বৃহস্পতিবার ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহনের পথ ছিল হরমুজ প্রণালি। এটি ইরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ এবং এর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতেই রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল দক্ষিণ উপকূলে আমাদের কয়েকটি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে এই কৌশলগত প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। কিন্তু ইরান তার ভূখণ্ডের প্রতিটি অংশ থেকেই হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম। এটি উপকূল বা দ্বীপের ওপর নির্ভরশীল নয়।’
রয়টার্সকে তিন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, হরমুজ খুলে দেওয়ার লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনার আগে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করাও এর উদ্দেশ্য।
ইরানের সেনাবাহিনীও এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যাব এবং এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ব্যর্থ করে দেব।’
তেহরানের দাবি, হরমুজ পুনরায় চালু করার একমাত্র উপায় হলো জুনে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক মেনে চলা এবং জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত ইরানের নির্ধারিত বিধি বাস্তবায়ন করা।
অবকাঠামোতে হামলা হলে পাল্টা জবাব
ট্রাম্প গত মঙ্গলবার হুমকি দেন, তেহরান আলোচনায় না ফিরলে আগামী সপ্তাহে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলা চালানো হবে।
এর জবাবে আকরামিনিয়া বলেন, এমন হামলা হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘অবশিষ্ট সব অবকাঠামো’ লক্ষ্যবস্তু করবে। তিনি বলেন, ইরানের প্রতিক্রিয়া আগের যেকোনো হামলার তুলনায় আরও কঠোর, বিস্তৃত ও ধ্বংসাত্মক হবে।
কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনে উত্তেজনা
ইরান জানিয়েছে, তারা কুয়েত ও জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিলে তার জবাব দেওয়া হবে বলে প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ভোরে বাহরাইনে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। কুয়েতও জানায়, তারা শত্রুপক্ষের ড্রোন হামলার হুমকি মোকাবিলা করছে।
ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, তারা জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটির স্যাটেলাইট যোগাযোগকেন্দ্র, আগাম সতর্কীকরণ রাডার এবং আল-শুয়াইবা এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক জেটি ধ্বংস করা হয়েছে।
বাহরাইনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ছোঁড়া একাধিক আকাশপথের হামলা সফলভাবে প্রতিহত করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ বন্ধ রাখা, উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার হুমকি এবং ইয়েমেনের হুতিদের মাধ্যমে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও অচল করে দেওয়ার সম্ভাবনা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
চলমান যুদ্ধে ইরান ও লেবাননে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সূত্র: রয়টার্স