রাজধানীতে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতেই আঁচ করা গেছে ব্যবস্থাপনার সংকট কতটা গভীরে। অলিতে-গলিতে নগরবাসীর দুর্ভোগ এখনো যেন কাটছেই না। গত শনি ও রবিবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে তলিয়ে ছিল রাজধানীর অসংখ্য এলাকা। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বড় ধরনের ছেদ পড়ে।
বৃষ্টিতে পানিবন্দি হয়ে পড়ে হাজারও পরিবার। নিচতলার বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর অনেক ক্ষতি হয়। বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অনেকের ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল পানিতে বিকল হয়ে পড়ে।
খবরের কাগজের এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় বিভিন্ন সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে, তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে গেছে, কোথাও আবার চুরি হয়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও স্বীকার করছেন, রাজধানীর এই সংকটকালীন অবস্থার জন্য শুধু অতিবৃষ্টি দায়ী নয়, এর পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে। ঢাকার প্রাকৃতিক খাল দখল ও ভরাট হওয়ার কারণেই জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একসময় রাজধানীর বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম ছিল প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার। দখল ও ভরাটের কারণে অধিকাংশ খাল স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে।
কোথাও খাল সংকুচিত হয়েছে, কোথাও ময়লা-আবর্জনা-পলিতে ভরে গেছে। এ ছাড়া রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক ও সমন্বয়হীনতার সংকট বিরাজমান। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জলাবদ্বতা কোনো সাময়িক বা মৌসুমি সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ড্রেনেজব্যবস্থা এবং অকার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলই এখন প্রতি বর্ষায় ভয়াবহ আকারে দেখা দিচ্ছে।
শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে না। রাজধানীর প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজব্যবস্থা চালু এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করার পাশাপাশি রাজউক, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও অন্য সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ঢাকার নদী, খাল ও জলাশয় দখলদারদের তালিকা অনেক আগেই নদী রক্ষা কমিশন সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। কিন্তু এখনো তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের সহযোগী এবং দায়িত্বে অবহেলাকারী সরকারি সংস্থাগুলোকে চিহ্নিত করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শুধু বক্তব্য নয়, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শিল্প-কারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ইটিপি ছাড়া পরিচালিত কারখানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নদীতীরের অননুমোদিত শিল্প-কারখানা নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করা জরুরি। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকলে খাল-নদী দখল ও দূষণ বন্ধ হবে না। এর ফলে ঢাকার বাতাস, পানি ও মাটির দূষণ যেমন বাড়বে, তেমনি প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
নগর ব্যবস্থাপনায় যে তীব্র সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা নিরসনে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেসব খাল দখল হয়েছে, সেগুলো উদ্ধার করে নদীর সঙ্গে পুনঃসংযোগ করতে হবে। নদীতীরের অননুমোদিত শিল্প-কারখানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সিটি
করপোরেশনগুলোকে শক্তিশালী করে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে। এ ছাড়া নগর উন্নয়নে নিয়োজিত সব সংস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে, যাতে নগরবাসীর ভোগান্তি দূর করে নগরীর কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হয়। আশা করছি, সরকার ব্যবস্থাপনার সংকট কাটিয়ে রাজধানীকে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।