বন্যা ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষার আয়োজন, প্রশ্নপত্রে ভুল, শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য–এসব ঘটনায় দেশজুড়ে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। তারা জেলায় জেলায় বিক্ষোভ, অবরোধ, মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে তারা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের ‘তাচ্ছিল্য’ করে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য দেওয়ার প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার ব্যাপক প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়া দেখায় তারা। ওই দিনই সন্ধ্যার দিকে শিক্ষার্থীরা সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এর প্রায় ১০ ঘণ্টা পর আন্দোলন স্থগিত করে রাজপথ ছাড়ার ঘোষণা দেয় তারা। তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে তারা অনড়। এরই মধ্যে গতকাল বুধবার এইচএসসি শিক্ষার্থীরা আবারও ‘লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরা আবারও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে সড়ক অবরোধ শুরু করেছে।
দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদেও তোপের মুখে পড়েন শিক্ষামন্ত্রী। একদিকে সংসদ ভবনের বাইরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অবস্থান, অন্যদিকে সংসদের ভেতরে বিরোধী ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের প্রশ্ন– কেন বন্যা পরিস্থিতিতেও পরীক্ষা দু-এক দিন পিছিয়ে দেওয়া হলো না? এ কারণে শিক্ষামন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, 'আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি জানিয়েছেন। আমি উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে কাউকে কিছু বলতে চাইনি। তারপরও কেউ যদি আহত হয়ে থাকেন, আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।' একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলে ফিরে যাক। কারণ তাদের চেয়ে আমরাই বেশি উদ্বিগ্ন। কোথাও প্রয়োজন হলে আবারও পরীক্ষা নেব।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তত পাঁচটি কারণে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা শিক্ষামন্ত্রীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা ক্ষোভের কথা প্রকাশও করেছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা খবরের কাগজকে বলেছেন, শুধু অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতাই ক্ষুব্ধ করেনি শিক্ষার্থীদের; বরং আরও চারটি কারণে আন্দোলন গড়ে ওঠে। এর মধ্যে পরীক্ষার দেড় মাস আগে অভিন্ন প্রশ্নের সিদ্ধান্ত, পদার্থবিজ্ঞানে ভুল প্রশ্নপত্র, আইসিটি ও বাংলায় কঠিন প্রশ্ন এবং বিভিন্ন সময়ে শিক্ষামন্ত্রীর অতিকথনকে ক্ষোভের জন্য দায়ী করে তারা। তাদের মতে, শুধু পদার্থবিজ্ঞানের ভুল প্রশ্ন অনেক শিক্ষার্থীকে ড্রপ আউটের মতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে। কারণ বুয়েট, রুয়েট, চুয়েট ও কুয়েটের মতো উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ পাবে না অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ‘ব্রয়লার মুরগি’ আখ্যা দেওয়ার মতো ঘটনা এই আন্দোলনকে আরও উসকে দিয়েছে। অনেকেই এখন ভারতের ককরোচ পার্টির সঙ্গে ব্রয়লার চিকেন পার্টির সংযোগ খুঁজছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। শেষমেশ শিক্ষামন্ত্রীকেও সংসদে দুঃখ প্রকাশ করতে বাধ্য করেছে।
দেশে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলমান। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছে। এ অবস্থা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য চরম হুমকি। বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে প্রশ্নপত্র ভুলের বিষয়টি সামনে এসেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ প্রশ্ন তৈরির সময় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে মডারেট করা হয়। এ অবস্থায় প্রশ্নপত্রে ভুল হলে শিক্ষার্থীদের চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। প্রশ্নের সমাধান করতে গিয়ে পরীক্ষার হলে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায়; যা পরীক্ষার ফলাফলে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা দুই বছরের কম সময় পেয়েছে। এর মধ্যে দেড় মাস আগে শিক্ষামন্ত্রীর অভিন্ন প্রশ্নপত্রের সিদ্ধান্ত তাদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। এ ছাড়া সম্প্রতি অতিবৃষ্টিতে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানিয়েছিল তারা। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় তা আমলে না নিয়ে উল্টো কঠিন ও ভুল প্রশ্নে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে বাধ্য করে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখার দরকার ছিল। তাও করা হয়নি। এটা সংকট পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করেছে। এ সংকট নিরসনে দ্রুত সরকারের উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ আশা করি। শিক্ষার্থীরাও সরকারের উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে পড়ার টেবিলে ফিরে যাবে, এটাই প্রত্যাশা করছি।