বিষণ্নতা এখন শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের একটি সমস্যা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মব্যস্ততা, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন–সব মিলিয়ে নারীরা তুলনামূলক বেশি মানসিক চাপের মুখোমুখি হন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এর পেছনে শুধু পরিবেশগত কারণ নয়, জেনেটিক বা বংশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের জেনেটিক ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। অর্থাৎ, একজন নারীর পরিবারে যদি বিষণ্নতার ইতিহাস থাকে, তবে তার নিজেরও এই সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। এতদিন এর কারণ হিসেবে মূলত হরমোনের ওঠানামা, সামাজিক বৈষম্য এবং মানসিক চাপকে দায়ী করা হলেও, সাম্প্রতিক জেনেটিক গবেষণা এই চিত্রকে আরও স্পষ্ট করেছে। গবেষকরা দেখেছেন, কিছু নির্দিষ্ট জিন নারীদের ক্ষেত্রে বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়াতে বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
জিন আমাদের শরীরের নানা বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে। তেমনি মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ মোকাবিলার ক্ষমতার সঙ্গেও কিছু জিনের সম্পর্ক রয়েছে। যদি বাবা-মা বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিষণ্নতার ইতিহাস থাকে, তাহলে সেই জিনগত প্রবণতা পরবর্তী প্রজন্মেও চলে আসতে পারে। তবে জিন থাকলেই যে কেউ অবশ্যই বিষণ্নতায় আক্রান্ত হবেন, বিষয়টি এমন নয়। বরং জিন ও পরিবেশ একসঙ্গে কাজ করে ঝুঁকি তৈরি করে।
নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হরমোন। কৈশোর, গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পরের সময় এবং মেনোপজ–জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিকের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি একই সঙ্গে জেনেটিক ঝুঁকিও থাকে, তাহলে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এখানকার বহু নারী একসঙ্গে কর্মক্ষেত্র ও পরিবারের দায়িত্ব পালন করেন। সংসারের অদৃশ্য শ্রম, সন্তান লালন-পালন, প্রবীণ সদস্যের দেখাশোনা, কর্মস্থলের চাপ–সবকিছু মিলিয়ে অনেকেই দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। আবার অনেক নারী পারিবারিক সহিংসতা, বৈবাহিক দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা সামাজিক কুসংস্কারেরও শিকার হন। এই দীর্ঘস্থায়ী চাপ যদি জেনেটিক প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বিষণ্নতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিষণ্নতার ক্ষেত্রে শুধু দুঃখবোধই একমাত্র লক্ষণ নয়। দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, আগের মতো কোনো কাজে আনন্দ না পাওয়া, সব সময় ক্লান্ত লাগা, ঘুমের সমস্যা, ক্ষুধা কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, অকারণে অপরাধবোধ, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা–এসবও বিষণ্নতার লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় শারীরিক ব্যথা, মাথাব্যথা বা হজমের সমস্যার আড়ালেও বিষণ্নতা লুকিয়ে থাকতে পারে।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি–জেনেটিক ঝুঁকি মানেই নিশ্চিত রোগ নয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস বিষণ্নতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। পরিবারে যদি বিষণ্নতার ইতিহাস থাকে, তাহলে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
অনেক নারী এখনো মানসিক সমস্যাকে লজ্জার বিষয় মনে করেন। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা চিকিৎসকের কাছে যান না বা কাউকে নিজের কষ্টের কথা জানান না। অথচ বিষণ্নতা অন্য যেকোনো শারীরিক অসুস্থতার মতোই একটি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা। সময়মতো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলভাবে এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব।
আধুনিক বিজ্ঞান দেখাচ্ছে, বিষণ্নতা শুধু মানসিক দুর্বলতার নাম নয়; এটি জিন, হরমোন, মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি এবং সামাজিক বাস্তবতার জটিল সমন্বয়ের ফল। তাই নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা না করে নিয়মিত যত্ন, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ, সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যই একজন নারীকে পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজে তার পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।
/এসএল