ঢাকা ১ শ্রাবণ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে যাচ্ছেন মেসি সিসিকের উদ্যোগে স্যাটেলাইট স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ পিকফোর্ডের পানির বোতলে আর্জেন্টিনাকে ঠেকানোর গোপন ছক! জুলাই শহিদদের আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে: এমপি মানিক বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে টম ক্রুজ নেত্রকোণায় আর্জেন্টিনার জয়ে ভিডিও করতে গিয়ে শিক্ষার্থীর মৃত্যু বাংলাদেশেও আসছে নোলানের নতুন ঝড় ‘দ্য ওডিসি’ বাগেরহাটের চিরকুট লিখে চিরতরে হারিয়ে গেলেন স্বামী-স্ত্রী তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের গোলও কি ভাগ্য গড়ে গোল্ডেন বুটের? পাবনায় অ্যাম্বুলেন্স-বাস সংঘর্ষে নিহত ৩ বিষণ্নতায় নারীদের জেনেটিক ঝুঁকি পুরুষদের চেয়ে দ্বিগুণ ডিজিটাল যুগে নারীর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা দেশপ্রেম আর আত্মত্যাগের প্রতীক তারামন বিবি বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পরও টুখেলের ওপর আস্থা ইংল্যান্ডের ‘গণিতের নোবেল’ মারিয়াম মির্জাখানি ইংল্যান্ড বধের জয় মারাডোনাকে উৎসর্গ করলেন মেসি ঘনীভূত হচ্ছে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত মায়ানমারে ট্রলারডুবিতে ৫০০ রোহিঙ্গা মৃত্যুর আশঙ্কা জাতিসংঘের বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগে আগ্রহী সৌদি আরব পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যবস্থা নিন আমরা বঞ্চিত রংপুরকে আলোকিত করব: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জুলাইজুড়ে হোটেল সারিনায় থাকছে আকর্ষণীয় ফুড অ্যান্ড বেভারেজ আয়োজন সাতকানিয়ায় বন্যা শেষে ৮৬ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদানের প্রস্তুতি রাজধানী কিয়েভ ও সমুদ্রবন্দরে রাশিয়ার হামলা উত্তরায় আর্জেন্টিনার খেলা দেখে ফেরার পথে বাসচাপায় দুই সাংবাদিক নিহত ময়মনসিংহে অগ্রণী ব্যাংকের ‘বাংলা কিউআর’ প্রচারণায় মতবিনিময় সভা ইংল্যান্ড ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয়ের রহস্য ফাঁস করলেন স্কালোনি মার্কিন সামরিক অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত রাখবে ইরান টুখেলের সমালোচনায় ইংল্যান্ডের কিংবদন্তিরা অর্থায়নের সূচনা অধ্যায়ের ৫টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, এইচএসসির ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বিমা ১ম পত্র

বিষণ্নতায় নারীদের জেনেটিক ঝুঁকি পুরুষদের চেয়ে দ্বিগুণ

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:১৪ পিএম
বিষণ্নতায় নারীদের জেনেটিক ঝুঁকি পুরুষদের চেয়ে দ্বিগুণ

বিষণ্নতা এখন শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের একটি সমস্যা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মব্যস্ততা, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন–সব মিলিয়ে নারীরা তুলনামূলক বেশি মানসিক চাপের মুখোমুখি হন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এর পেছনে শুধু পরিবেশগত কারণ নয়, জেনেটিক বা বংশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের জেনেটিক ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। অর্থাৎ, একজন নারীর পরিবারে যদি বিষণ্নতার ইতিহাস থাকে, তবে তার নিজেরও এই সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। এতদিন এর কারণ হিসেবে মূলত হরমোনের ওঠানামা, সামাজিক বৈষম্য এবং মানসিক চাপকে দায়ী করা হলেও, সাম্প্রতিক জেনেটিক গবেষণা এই চিত্রকে আরও স্পষ্ট করেছে। গবেষকরা দেখেছেন, কিছু নির্দিষ্ট জিন নারীদের ক্ষেত্রে বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়াতে বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

জিন আমাদের শরীরের নানা বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে। তেমনি মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ মোকাবিলার ক্ষমতার সঙ্গেও কিছু জিনের সম্পর্ক রয়েছে। যদি বাবা-মা বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিষণ্নতার ইতিহাস থাকে, তাহলে সেই জিনগত প্রবণতা পরবর্তী প্রজন্মেও চলে আসতে পারে। তবে জিন থাকলেই যে কেউ অবশ্যই বিষণ্নতায় আক্রান্ত হবেন, বিষয়টি এমন নয়। বরং জিন ও পরিবেশ একসঙ্গে কাজ করে ঝুঁকি তৈরি করে।

নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হরমোন। কৈশোর, গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পরের সময় এবং মেনোপজ–জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিকের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি একই সঙ্গে জেনেটিক ঝুঁকিও থাকে, তাহলে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের বাস্তবতাও এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এখানকার বহু নারী একসঙ্গে কর্মক্ষেত্র ও পরিবারের দায়িত্ব পালন করেন। সংসারের অদৃশ্য শ্রম, সন্তান লালন-পালন, প্রবীণ সদস্যের দেখাশোনা, কর্মস্থলের চাপ–সবকিছু মিলিয়ে অনেকেই দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। আবার অনেক নারী পারিবারিক সহিংসতা, বৈবাহিক দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা সামাজিক কুসংস্কারেরও শিকার হন। এই দীর্ঘস্থায়ী চাপ যদি জেনেটিক প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বিষণ্নতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিষণ্নতার ক্ষেত্রে শুধু দুঃখবোধই একমাত্র লক্ষণ নয়। দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, আগের মতো কোনো কাজে আনন্দ না পাওয়া, সব সময় ক্লান্ত লাগা, ঘুমের সমস্যা, ক্ষুধা কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, অকারণে অপরাধবোধ, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা–এসবও বিষণ্নতার লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় শারীরিক ব্যথা, মাথাব্যথা বা হজমের সমস্যার আড়ালেও বিষণ্নতা লুকিয়ে থাকতে পারে।

একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি–জেনেটিক ঝুঁকি মানেই নিশ্চিত রোগ নয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস বিষণ্নতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। পরিবারে যদি বিষণ্নতার ইতিহাস থাকে, তাহলে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

অনেক নারী এখনো মানসিক সমস্যাকে লজ্জার বিষয় মনে করেন। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা চিকিৎসকের কাছে যান না বা কাউকে নিজের কষ্টের কথা জানান না। অথচ বিষণ্নতা অন্য যেকোনো শারীরিক অসুস্থতার মতোই একটি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা। সময়মতো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলভাবে এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব।

আধুনিক বিজ্ঞান দেখাচ্ছে, বিষণ্নতা শুধু মানসিক দুর্বলতার নাম নয়; এটি জিন, হরমোন, মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি এবং সামাজিক বাস্তবতার জটিল সমন্বয়ের ফল। তাই নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা না করে নিয়মিত যত্ন, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ, সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যই একজন নারীকে পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজে তার পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

/এসএল

ডিজিটাল যুগে নারীর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:১৩ পিএম
ডিজিটাল যুগে নারীর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা

একসময় ব্যক্তিগত তথ্য বলতে বোঝানো হতো ডায়েরি, চিঠি কিংবা কিছু কাগজপত্র। এখন সেই জায়গা দখল করেছে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ব্যাংকিং, ই-কমার্স এবং ক্লাউড স্টোরেজ। আমাদের ছবি, পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, অবস্থান, ব্যাংকিং তথ্য এমনকি ব্যক্তিগত কথোপকথনও ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকে। ফলে প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি বেড়েছে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।

বিশেষ করে নারীরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হন। ব্যক্তিগত ছবি অপব্যবহার, ভুয়া আইডি তৈরি, পরিচয় চুরি, সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইল বা অনলাইন স্টকিংয়ের মতো ঘটনা এখন আর বিরল নয়। অনেক সময় এসব ঘটনার ভয়েই নারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশ বা পেশাগত উপস্থিতি কমিয়ে দেন। অথচ ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপদভাবে অংশগ্রহণ করা এখন শিক্ষা, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটাল যুগে তথ্যই এক ধরনের সম্পদ। একজন ব্যক্তির নাম, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য কিংবা ব্যাংকিং তথ্য অপরাধীদের হাতে গেলে তা দিয়ে পরিচয় জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা বা সামাজিক হয়রানি ঘটানো সম্ভব। এমনকি ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করেও মানসিক চাপ সৃষ্টি বা ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা করা হয়।

কোথায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি?

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রগুলোর একটি। অনেকেই নিজের বাসার অবস্থান, কর্মস্থল, দৈনন্দিন রুটিন কিংবা পরিবারের সদস্যদের ছবি নিয়মিত শেয়ার করেন। এসব তথ্য অপরাধীরা বিশ্লেষণ করে বিভিন্নভাবে অপব্যবহার করতে পারে। এছাড়া অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা, অচেনা অ্যাপ ইনস্টল করা কিংবা ভুয়া ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া থেকেও তথ্য চুরির ঘটনা ঘটে। অনেক সময় জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ই-মেইল বা মেসেজ পাঠিয়ে পাসওয়ার্ড কিংবা ওটিপি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যাকে বলা হয় ফিশিং।

নিরাপদ থাকার কিছু কার্যকর অভ্যাস

ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খুব জটিল প্রযুক্তি জানার প্রয়োজন নেই। কয়েকটি নিয়মিত অভ্যাসই বড় ধরনের ঝুঁকি কমাতে পারে। প্রথমত, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। একই পাসওয়ার্ড একাধিক অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করা উচিত নয়। পাসওয়ার্ডে বড় ও ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং বিশেষ চিহ্নের সমন্বয় রাখুন। দ্বিতীয়ত, সম্ভব হলে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু করুন। এতে পাসওয়ার্ড জানলেও অন্য কেউ সহজে আপনার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারবে না। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রাইভেসি সেটিংস নিয়মিত পর্যালোচনা করুন। কে আপনার পোস্ট, ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য দেখতে পারবে, তা নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করুন। চতুর্থত, অচেনা ব্যক্তির ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট গ্রহণ বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার আগে সতর্ক থাকুন। অনলাইন পরিচয় সব সময় বাস্তব পরিচয়ের সমান বিশ্বাসযোগ্য নাও হতে পারে।

ছবি শেয়ার করার আগে ভাবুন

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ছবি ও ভিডিও সম্পাদনা করা আগের চেয়ে অনেক সহজ। ফলে প্রকাশ্যে দেওয়া ছবি বিভিন্নভাবে বিকৃত বা অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কাও বেড়েছে। তাই ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল ছবি প্রকাশের আগে ভেবে দেখা জরুরি। শিশুদের ছবি, পরিচয়পত্র, ভ্রমণের রিয়েল-টাইম লোকেশন কিংবা বাসার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করাও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

হয়রানির শিকার হলে কী করবেন?

অনেক নারী অনলাইন হয়রানির শিকার হলেও লজ্জা বা সামাজিক চাপে বিষয়টি গোপন রাখেন। কিন্তু এতে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়। কোনো ধরনের ব্ল্যাকমেইল, ভুয়া আইডি, অশালীন বার্তা বা ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার হলে প্রথমেই প্রমাণ হিসেবে স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করুন। সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ব্লক ও রিপোর্ট করুন। প্রয়োজনে দেশের সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা বা সাইবার অপরাধ মোকাবিলাকারী কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিন। নিজের নিরাপত্তার প্রশ্নে কখনোই নীরব থাকা উচিত নয়।

ডিজিটাল নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা এবং আত্মরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। প্রযুক্তি থেকে দূরে সরে যাওয়াই সমাধান নয়, বরং প্রযুক্তিকে নিরাপদভাবে ব্যবহার করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।

/এসএল

‘গণিতের নোবেল’ মারিয়াম মির্জাখানি

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:০৫ পিএম
‘গণিতের নোবেল’ মারিয়াম মির্জাখানি

বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণিতের মতো ক্ষেত্রগুলো দীর্ঘদিন পুরুষদের আধিপত্যে ছিল। এমন বাস্তবতায় একজন নারী যখন সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করেন, তখন তার সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জন থাকে না; হয়ে ওঠে প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা। এমনই এক অসাধারণ নারীর নাম মারিয়াম মির্জাখানি।

১৯৭৭ সালের ১২ মে ইরানের রাজধানী তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন মারিয়াম। ছোটবেলায় তার স্বপ্ন ছিল লেখক হওয়ার। গল্পের বই পড়তে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। তখন কেউ ভাবেনি, একদিন এই কিশোরীই গণিতের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখবেন। কৈশোরে এসে গণিতের জ্যামিতিক সৌন্দর্য তাকে আকৃষ্ট করে। ধীরে ধীরে সংখ্যা, আকার ও যুক্তির জগৎ তার কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

স্কুলজীবনেই মারিয়ামের অসাধারণ মেধার পরিচয় মেলে। তিনি আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে টানা দুই বছর স্বর্ণপদক অর্জন করেন। শুধু তাই নয়, দ্বিতীয়বার তিনি পূর্ণ নম্বর পেয়ে ইরানের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েন। এই সাফল্যই ভবিষ্যতের এক বিশ্বমানের গণিতবিদের আগমনের ইঙ্গিত দিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে তিনি তেহরানের শরীফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। গবেষণায় অসাধারণ দক্ষতার কারণে তিনি পরে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি জটিল গণিতের এমন সব সমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন, যেগুলো বহু বছর ধরে গবেষকদের কাছে রহস্য হয়ে ছিল।

মারিয়ামের গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র ছিল রিম্যান সারফেস, হাইপারবোলিক জ্যামিতি, মডুলি স্পেস এবং গতিবিদ্যা। বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে জটিল মনে হলেও এগুলো আধুনিক গণিতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা। তিনি ভিন্ন ভিন্ন গণিতশাস্ত্রের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন। তার গবেষণা শুধু গণিতেই নয়, পদার্থবিজ্ঞানসহ অন্যান্য মৌলিক বিজ্ঞানেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

২০১৪ সালে ইতিহাস সৃষ্টি করেন মারিয়াম মির্জাখানি। তিনি প্রথম নারী এবং প্রথম ইরানি হিসেবে অর্জন করেন ফিল্ডস মেডেল–যাকে গণিতের সর্বোচ্চ সম্মান এবং অনেকেই ‘গণিতের নোবেল’ বলে থাকেন। ১৯৩৬ সালে এই পুরস্কার চালু হওয়ার পর প্রায় আট দশক ধরে কোনো নারী এই সম্মান পাননি। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটান মারিয়াম।
পুরস্কার গ্রহণের পর বিশ্বজুড়ে অসংখ্য কিশোরী ও তরুণী নতুন করে বিশ্বাস করতে শেখে যে, গণিত কিংবা বিজ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের বিষয় নয়। মেধা, কৌতূহল এবং অধ্যবসায় থাকলে যে কেউ সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে। মারিয়ামের অর্জন তাই নারীদের জন্য আত্মবিশ্বাসের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে।

মারিয়ামের কাজের ধরনও ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি জটিল সমস্যার সমাধান করতে কাগজে বড় বড় চিত্র আঁকতেন, বিভিন্ন রঙে নোট লিখতেন এবং সমস্যাকে গল্পের মতো কল্পনা করতেন। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই তাকে করতে হয়েছিল গবেষণাগারের বাইরে। মাত্র ৪০ বছর বয়সে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০১৭ সালের ১৪ জুলাই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। এই অকালমৃত্যু বিজ্ঞানজগতের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে তার গবেষণা, চিন্তাধারা এবং সাফল্য আজও নতুন প্রজন্মকে পথ দেখিয়ে চলেছে।

তার অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে জন্মদিন ১২ মে আন্তর্জাতিক নারী গণিত দিবস হিসেবে পালিত হয়। এই দিনটি শুধু একজন বিজ্ঞানীকে স্মরণ করার জন্য নয়; বরং বিশ্বের প্রতিটি মেয়েকে গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করার একটি প্রতীকী দিন।

অসংখ্য মেয়ে, যারা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি কিংবা গণিত নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়, তাদের জন্য মারিয়াম মির্জাখানি এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তার গল্প মনে করিয়ে দেয়–সামাজিক বাধা, প্রচলিত ধারণা কিংবা প্রতিকূলতা নয়, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জিজ্ঞাসা, নিষ্ঠা ও স্বপ্ন দেখার সাহস। আর সেই সাহসই একদিন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে।

/এসএল

বিষণ্নতায় নারীদের জেনেটিক ঝুঁকি পুরুষদের চেয়ে দ্বিগুণ

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:১৪ পিএম
বিষণ্নতায় নারীদের জেনেটিক ঝুঁকি পুরুষদের চেয়ে দ্বিগুণ

বিষণ্নতা এখন শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের একটি সমস্যা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মব্যস্ততা, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন–সব মিলিয়ে নারীরা তুলনামূলক বেশি মানসিক চাপের মুখোমুখি হন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এর পেছনে শুধু পরিবেশগত কারণ নয়, জেনেটিক বা বংশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের জেনেটিক ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। অর্থাৎ, একজন নারীর পরিবারে যদি বিষণ্নতার ইতিহাস থাকে, তবে তার নিজেরও এই সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। এতদিন এর কারণ হিসেবে মূলত হরমোনের ওঠানামা, সামাজিক বৈষম্য এবং মানসিক চাপকে দায়ী করা হলেও, সাম্প্রতিক জেনেটিক গবেষণা এই চিত্রকে আরও স্পষ্ট করেছে। গবেষকরা দেখেছেন, কিছু নির্দিষ্ট জিন নারীদের ক্ষেত্রে বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়াতে বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

জিন আমাদের শরীরের নানা বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে। তেমনি মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ মোকাবিলার ক্ষমতার সঙ্গেও কিছু জিনের সম্পর্ক রয়েছে। যদি বাবা-মা বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিষণ্নতার ইতিহাস থাকে, তাহলে সেই জিনগত প্রবণতা পরবর্তী প্রজন্মেও চলে আসতে পারে। তবে জিন থাকলেই যে কেউ অবশ্যই বিষণ্নতায় আক্রান্ত হবেন, বিষয়টি এমন নয়। বরং জিন ও পরিবেশ একসঙ্গে কাজ করে ঝুঁকি তৈরি করে।

নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হরমোন। কৈশোর, গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পরের সময় এবং মেনোপজ–জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিকের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি একই সঙ্গে জেনেটিক ঝুঁকিও থাকে, তাহলে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের বাস্তবতাও এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এখানকার বহু নারী একসঙ্গে কর্মক্ষেত্র ও পরিবারের দায়িত্ব পালন করেন। সংসারের অদৃশ্য শ্রম, সন্তান লালন-পালন, প্রবীণ সদস্যের দেখাশোনা, কর্মস্থলের চাপ–সবকিছু মিলিয়ে অনেকেই দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। আবার অনেক নারী পারিবারিক সহিংসতা, বৈবাহিক দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা সামাজিক কুসংস্কারেরও শিকার হন। এই দীর্ঘস্থায়ী চাপ যদি জেনেটিক প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বিষণ্নতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিষণ্নতার ক্ষেত্রে শুধু দুঃখবোধই একমাত্র লক্ষণ নয়। দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, আগের মতো কোনো কাজে আনন্দ না পাওয়া, সব সময় ক্লান্ত লাগা, ঘুমের সমস্যা, ক্ষুধা কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, অকারণে অপরাধবোধ, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা–এসবও বিষণ্নতার লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় শারীরিক ব্যথা, মাথাব্যথা বা হজমের সমস্যার আড়ালেও বিষণ্নতা লুকিয়ে থাকতে পারে।

একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি–জেনেটিক ঝুঁকি মানেই নিশ্চিত রোগ নয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস বিষণ্নতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। পরিবারে যদি বিষণ্নতার ইতিহাস থাকে, তাহলে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

অনেক নারী এখনো মানসিক সমস্যাকে লজ্জার বিষয় মনে করেন। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা চিকিৎসকের কাছে যান না বা কাউকে নিজের কষ্টের কথা জানান না। অথচ বিষণ্নতা অন্য যেকোনো শারীরিক অসুস্থতার মতোই একটি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা। সময়মতো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলভাবে এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব।

আধুনিক বিজ্ঞান দেখাচ্ছে, বিষণ্নতা শুধু মানসিক দুর্বলতার নাম নয়; এটি জিন, হরমোন, মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি এবং সামাজিক বাস্তবতার জটিল সমন্বয়ের ফল। তাই নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা না করে নিয়মিত যত্ন, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ, সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যই একজন নারীকে পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজে তার পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

/এসএল

নারীর মুড সুইংয়ের বৈজ্ঞানিক কারণ

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম
নারীর মুড সুইংয়ের বৈজ্ঞানিক কারণ

কখনো খুব আনন্দ, আবার হঠাৎই অকারণ মন খারাপ, বিরক্তি কিংবা কান্না–এমন অনুভূতির পরিবর্তন অনেক নারীর কাছেই পরিচিত। সমাজে এখনো অনেকেই এটিকে ‘অতিরিক্ত আবেগ’ বা ‘নারীদের স্বভাব’ বলে উড়িয়ে দেন। অথচ বাস্তবতা হলো, নারীর মুড সুইংয়ের পেছনে রয়েছে শরীরের জটিল হরমোনগত পরিবর্তন, মস্তিষ্কের রাসায়নিক ক্রিয়া এবং নানা শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। তাই মুড সুইংকে দুর্বলতা নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

হরমোনের ওঠানামাই সবচেয়ে বড় কারণ

নারীর শরীরে প্রধানত ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন নামের দুটি হরমোন মেজাজ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাসিক চক্রের বিভিন্ন সময়ে এই হরমোনগুলোর মাত্রা পরিবর্তিত হয়। এর প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কে থাকা সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারের ওপর, যা আমাদের আনন্দ, শান্তি ও মানসিক স্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

বিশেষ করে মাসিক শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে অনেক নারীর মধ্যে বিরক্তি, উদ্বেগ, ক্লান্তি, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা বা মন খারাপ দেখা দেয়। একে বলা হয় প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম। কারও ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো এতটাই তীব্র হতে পারে যে, দৈনন্দিন জীবনও ব্যাহত হয়। তখন সেটিকে প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার বলা হয়।

মস্তিষ্কের রাসায়নিক বার্তাবাহকের পরিবর্তন

মুড নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিউরো ট্রান্সমিটারগুলোর একটি হলো সেরোটোনিন। এটি কমে গেলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও খিটখিটে মেজাজ দেখা দিতে পারে।

ইস্ট্রোজেনের মাত্রা পরিবর্তিত হলে সেরোটোনিন উৎপাদন ও কার্যকারিতাও পরিবর্তিত হয়। ফলে অনেক নারী মাসিকের আগে বা পরে আবেগের ওঠানামা বেশি অনুভব করেন। অর্থাৎ, এটি শুধুই মানসিক বিষয় নয়; বরং মস্তিষ্কের জৈবিক পরিবর্তনেরও ফল।

গর্ভাবস্থায় কেন আবেগ বেশি পরিবর্তিত হয়?

গর্ভধারণের পর শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে শরীরকে নতুন একটি প্রাণের জন্য মানিয়ে নিতে হয়। এই পরিবর্তনের কারণে গর্ভবতী নারীরা কখনো খুব আনন্দিত, আবার কখনো অকারণ উদ্বিগ্ন বা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তে পারেন। এ সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়া, বমিভাব, শারীরিক অস্বস্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাও মুড সুইংকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

সন্তান জন্মের পর মানসিক পরিবর্তন

প্রসবের পর হরমোনের মাত্রা খুব দ্রুত কমে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় ঘুমের ঘাটতি, শিশুর যত্নের চাপ এবং নতুন দায়িত্ব। ফলে অনেক মা কয়েক দিনের জন্য আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, যা সাধারণভাবে ‘বেবি ব্লুজ’ নামে পরিচিত।

মেনোপজেও বাড়তে পারে মুড সুইং

৪৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে অধিকাংশ নারী মেনোপজের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমে আসে। এর ফলে শুধু মাসিক বন্ধ হয় না, বরং ঘুমের সমস্যা, হট ফ্ল্যাশ, উদ্বেগ, মনোযোগের ঘাটতি এবং মেজাজের পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। অনেক নারী এই সময় নিজেদের আগের মতো প্রাণবন্ত অনুভব করেন না। কিন্তু এটি বয়সজনিত দুর্বলতা নয়; বরং শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক পরিবর্তনের অংশ।

শুধু হরমোন নয়, জীবনযাপনও দায়ী

মুড সুইংয়ের জন্য শুধু হরমোনকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অতিরিক্ত কাজের চাপ, অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা, থাইরয়েডের সমস্যা, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ কিংবা নিয়মিত শরীরচর্চার অভাবও মেজাজের ওঠানামা বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া পারিবারিক দায়িত্ব, কর্মক্ষেত্রের চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনও নারীর মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে।

মুড সুইং পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলেও কিছু অভ্যাস এর তীব্রতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করা, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া উপকারী।

এছাড়া মেডিটেশন, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, নিজের অনুভূতি পরিবারের সদস্য বা বন্ধুর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং নেওয়াও কার্যকর হতে পারে।

নারীর মুড সুইংকে ‘নাটক’, ‘অতিরিক্ত আবেগ’ বা ‘হরমোনের অজুহাত’ বলে অবহেলা করার সময় এখন আর নেই। বিজ্ঞান বলছে, এটি শরীর ও মস্তিষ্কের জটিল পারস্পরিক ক্রিয়ার স্বাভাবিক ফল। তাই সমালোচনার বদলে প্রয়োজন সচেতনতা, সহমর্মিতা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা।

/এসএল

নারীরা কেন এত ক্লান্ত? অদৃশ্য শ্রম ও মানসিক চাপের বোঝা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০১:২১ পিএম
নারীরা কেন এত ক্লান্ত? অদৃশ্য শ্রম ও মানসিক চাপের বোঝা

একজন নারী হিসেবে আপনার মাথার ভেতরে কি সব সময় এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খায়–বাড়িতে যথেষ্ট খাবার আছে তো? সন্তানের টিকা সময়মতো দেওয়া হয়েছে? আমি কাজে থাকাকালে অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা করবে কে? এমন অসংখ্য সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও দায়িত্বের তালিকা প্রতিনিয়ত কারও না কারও মাথায় ঘুরতেই থাকে। 

এই অদৃশ্য মানসিক দায়িত্বকেই বলা হয় ‘মেন্টাল লোড’ বা মানসিক বোঝা। অধিকাংশ পরিবারে এই দায়িত্বের বড় অংশই বহন করেন নারীরা। পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়া, ঘরের কাজের পরিকল্পনা করা, প্রয়োজন অনুমান করা, সবকিছু ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা–এসবই এমন শ্রম, যার স্বীকৃতি খুব কমই মেলে। এই দায়িত্ব যদি একা একজনের কাঁধে পড়ে, যথেষ্ট সহযোগিতা, বিশ্রাম বা স্বীকৃতি না থাকে, তাহলে তা থেকে সৃষ্টি হতে পারে কেয়ারগিভার বার্নআউট বা পরিচর্যাকারীর চরম মানসিক ও শারীরিক অবসাদ। 

অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য হিসাব করলে, অনেক দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। অথচ এই শ্রমকে এখনও স্বাভাবিক বা অবমূল্যায়িত হিসেবেই দেখা হয়।

মেন্টাল লোড কী?

মেন্টাল লোড হলো সেই অদৃশ্য মানসিক ও আবেগগত শ্রম, যার মাধ্যমে মানুষ প্রতিদিনের অসংখ্য কাজের পরিকল্পনা করে, দায়িত্ব ভাগ করে, প্রয়োজন আগে থেকেই অনুমান করে এবং শেষ পর্যন্ত কাজটি সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে।

কেন নারীরাই বেশি বহন করেন এই বোঝা?

আজও সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা হলো–নারীরাই স্বভাবগতভাবে ভালো পরিচর্যাকারী, রাঁধুনি, গৃহপরিচালক কিংবা সন্তান লালন-পালনে বেশি দক্ষ। কিন্তু বাস্তবে এগুলো জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়; বরং সামাজিকভাবে শেখানো ভূমিকা।

ফলে নারীরা চাকরি করলেও, এমনকি পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হলেও, ঘরের অধিকাংশ দায়িত্ব তাদেরই কাঁধে থেকে যায়। একই সঙ্গে বহু কাজ সামলানোর কারণে তাদের ‘মাল্টিটাস্কিং’-এ দক্ষ বলা হয়। অথচ এক কাজ থেকে আরেক কাজে বারবার মনোযোগ সরানো মানসিক ও শারীরিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর।

অন্যদিকে, পুরুষদেরও ছোটবেলা থেকে এমন ধারণা দেওয়া হয় যে ঘরের দায়িত্বে নেতৃত্ব দেওয়া তাদের কাজ নয়। ফলে অনেক সময় তারা সহকারী বা দর্শকের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকেন।

বাস্তবে গবেষণা বলছে, পুরুষরাও সমান দক্ষতার সঙ্গে পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। লিঙ্গভিত্তিক সক্ষমতার প্রচলিত ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

মাতৃত্বের পর নারীরা প্রায়ই আয়, পদোন্নতি ও কর্মজীবনের অগ্রগতিতে পিছিয়ে পড়েন। এমনকি সন্তান নেওয়ার আগেই অনেক নিয়োগকর্তা মাতৃত্বকালীন ছুটির সম্ভাবনা বিবেচনায় নারীদের নিয়োগে অনীহা দেখান। 

ইউরোপের একাধিক দেশে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, লিঙ্গভিত্তিক বেতন বৈষম্যের বড় একটি অংশই এই ‘মাদারহুড পেনাল্টি’র কারণে তৈরি হয়।

সংঘাত, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের সময় নারীদের পরিচর্যার দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। ভঙ্গুর ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি সময় অবৈতনিক পরিচর্যার কাজে ব্যয় করেন।

বাবারা কি দায়িত্ব নিতে চান না?

গবেষণা বলছে, অধিকাংশ বাবাই সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোকে জীবনের অন্যতম আনন্দের বিষয় মনে করেন। কিন্তু সেই ইচ্ছা সব সময় বাস্তবে দায়িত্ব ভাগাভাগিতে রূপ নেয় না। এর একটি বড় কারণ সামাজিক ধারণা। অনেক পুরুষ মনে করেন, সন্তানের যত্নে বেশি সময় দিলে তাদের ‘ভালো উপার্জনকারী’ পরিচয় ক্ষুণ্ন হতে পারে। আবার অনেক দেশে মাতৃত্বকালীন ছুটি দীর্ঘ হলেও পিতৃত্বকালীন ছুটি খুবই সীমিত, ফলে দায়িত্বের ভারসাম্য তৈরি হয় না।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব বাবা সন্তানের পরিচর্যায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, তারা মানসিকভাবে বেশি সুস্থ থাকেন, আত্মবিশ্বাসী হন, সামাজিক সম্পর্কও উন্নত হয়। পরিচর্যা কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি। তাই উন্নত পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন সরকারি বিনিয়োগ, কার্যকর আইন, উন্নত সেবা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

এই লক্ষ্যেই জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা বিভিন্ন দেশে পরিচর্যার দায়িত্ব ভাগাভাগি, পরিচর্যাকারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন এবং পরিচর্যা ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে।

সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট–একটি পরিবার কিংবা সমাজকে টিকিয়ে রাখতে সবারই কখনো না কখনো পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, আবার অন্যের পরিচর্যাও করতে হয়। তাই নারীদের ওপর একতরফাভাবে এই দায়িত্ব চাপিয়ে না দিয়ে নারী-পুরুষ, পরিবার, সমাজ, সরকার এবং কর্মক্ষেত্র–সবাইকে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই কমবে মানসিক চাপ, রোধ হবে পরিচর্যাকারীদের অবসাদ এবং তৈরি হবে আরও সমতাভিত্তিক সমাজ।

/এসএল