বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অসংখ্য নারী নীরবে ও নিঃস্বার্থভাবে অবদান রেখেছেন। তাদের অনেকের নাম ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বলভাবে লেখা থাকলে অনেকেই দীর্ঘদিন ছিলেন আড়ালে। সেই সাহসী নারীদের অন্যতম হলেন বীরপ্রতীক তারামন বিবি। যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে লড়াই করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন–দেশপ্রেম, সাহস আর আত্মত্যাগের কোনো লিঙ্গ নেই।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির স্বাধীনতার লড়াই। এই যুদ্ধে লাখো মানুষ অংশ নিলেও নারীদের ভূমিকা দীর্ঘদিন যথাযথভাবে আলোচিত হয়নি। তারামন বিবি সেই নারীদেরই একজন, যিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তিনি শুধু একজন যোদ্ধাই নন, বরং নারীর অদম্য শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
কুড়িগ্রাম জেলার রাজিবপুর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া তারামন বিবির শৈশব কেটেছে সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ খুব বেশি পাননি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সাহসী, পরিশ্রমী ও দৃঢ়চেতা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে চারপাশের ভয়াবহতা তাকেও আন্দোলিত করে। দেশের স্বাধীনতার জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুক্ত হন।
প্রথমদিকে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করা, তথ্য আদান-প্রদান, অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহনে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার দায়িত্ব বাড়তে থাকে। প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি অস্ত্র চালানো শেখেন এবং একসময় সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। বিভিন্ন অভিযানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তার উপস্থিতি সহযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করত এবং শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করত।
তারামন বিবির সাহসিকতার অন্যতম দিক ছিল ভয়কে জয় করার ক্ষমতা। মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও তিনি দায়িত্ব থেকে কখনো পিছিয়ে যাননি। একজন তরুণী হিসেবে সে সময়ের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নেওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ নেই; দেশের প্রয়োজনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
স্বাধীনতার পর অনেক বছর ধরে তার অবদান প্রায় বিস্মৃত ছিল। দেশের নানা প্রান্তে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার মতো তিনিও সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। পরে তার যুদ্ধের অবদান নতুন করে মূল্যায়িত হয় এবং রাষ্ট্র তাকে বীরপ্রতীক খেতাবে সম্মানিত করে। এই স্বীকৃতি শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সব নারী যোদ্ধার সম্মানেরও প্রতীক।
বর্তমান প্রজন্মের নারীদের জন্য তার জীবন এক অনুপ্রেরণার উৎস। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, বিজ্ঞান, ক্রীড়া কিংবা সমাজসেবায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে যে সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন, তার বাস্তব উদাহরণ তারামন বিবি। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে অজুহাত না বানিয়ে নিজের শক্তিকে কাজে লাগানোর শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন।
২০২১ সালে তারামন বিবি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তার সাহসিকতার গল্প বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকবে। তিনি শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা নন; তিনি এমন এক আলোকবর্তিকা, যিনি দেখিয়ে গেছেন–দেশের জন্য ভালোবাসা থাকলে সাধারণ মানুষও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। নারীশক্তির উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে তার জীবন আগামী প্রজন্মকে বারবার মনে করিয়ে দেবে, স্বাধীনতার পেছনে নারীর রক্ত, ত্যাগ ও বীরত্বও সমানভাবে জড়িয়ে আছে।
/এসএল