পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় চরম মানবিক সংকটে রয়েছেন। তলিয়ে গেছে নলকূপ ও শৌচাগার। ফলে বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও স্যানিটেশনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। রান্নার সুযোগ না থাকায় দুর্গতরা শুকনা খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। দুর্গম এলাকাগুলোয় এখনো সরকারি ত্রাণ না পৌঁছানোর অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। প্রশাসন অবশ্য দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের আশ্বাস দিয়েছে। খবরের কাগজে প্রকাশিত সরেজমিন প্রতিবেদন বলছে, বন্যার পানিতে নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির উৎস প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বন্যার পানি ব্যবহার করছে। বাজার, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চাল, ডাল, শিশুখাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার গবাদিপশু ও সামান্য সহায়-সম্বল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে উঁচু স্থান কিংবা ঘরের মাচায়। বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোয় নৌকাই এখন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। দুর্গত এলাকায় দ্রুত বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না গেলে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সরকার বন্যাকবলিত ১১টি জেলার স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে।
সরকারি হিসাবে বন্যায় দেশের সাতটি জেলায় ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৫৪ জনের। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা আক্রান্ত জেলাগুলো হলো খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। বন্যায় মোট ৫৮টি উপজেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮ পরিবার।
আবহাওয়াবিদরা বলেছেন, নিম্নচাপ, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা, বায়ুপ্রবাহের ভিন্ন গতি এবং এল নিনোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে এত বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। চলতি মাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। স্কুলশিক্ষার্থী থেকে শুরু করে হাসপাতালমুখী গুরুতর রোগী- সবাইকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও দ্রুত অবনতি ঘটবে। বন্যাদুর্গত এলাকায় খাদ্যসংকটের পাশাপাশি নানা রকম মানবিক সংকটও দেখা দিয়েছে।
পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে দেশের ৯টি জেলায় হাজারও কৃষক, মৎস্যচাষি এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জীবনে নেমে এসেছে ঘোর দুর্যোগ। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে কয়েক শ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করেছে সংশ্লিষ্ট জেলার কৃষি ও মৎস্যসম্পদ দপ্তরগুলো। খবরের কাগজের খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম), কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলে কৃষি ও মৎস্য খাতে প্রাথমিকভাবে ২৬০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা গেছে। এর মধ্যে কৃষি খাতে ৮৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং মৎস্য খাতে ১৭৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এদিকে মৌলভীবাজারের রাজনগর, কমলগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখনো পানির নিচে রয়েছে। অনেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। ফসল হারিয়ে তারা এখন ঋণ পরিশোধ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বন্যাকবলিত এলাকায় ২৪৮ হেক্টর আউশ ধান, ৮৬ দশমিক ৫০ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা এবং ৬৪ দশমিক ৫০ হেক্টর সবজিখেত পানিতে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছে।
অতি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসে দেশের বিভিন্ন জনপদ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় বন্যাদুর্গতদের জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এমন অনেক দুর্গম এলাকা আছে, যেখানে সময়মতো ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব জায়গায় মেডিকেল টিম, ওষুধ ও স্যালাইন পৌঁছানোও দুরূহ ব্যাপার। তাই সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থায় জরুরি ভিক্তিতে এসব স্থানে ত্রাণ ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তাদের পুনর্বাসনে বিনামূল্যে বীজ, সার ও কৃষি-উপকরণ বিতরণের পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রতিবছরই এ ধরনের দুর্যোগ আসে, তাই সরকারকে সংকট মোকাবিলায় আগাম, টেকসই ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।