ব্রায়ের স্ট্র্যাপটা টাইট করে দিতে দিতে সুছন্দা আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁরে পরি, আজকাল সাউথ সিটিতে কেনাকাটা করছিস? তা কী কিনলি, দেখাবি না? ছন্দার পরি অর্থাৎ পারিজাত ওই অবস্থাতেই ঘুরে দাঁড়িয়ে ঝরনার মতো কলকল করে বলে, তুমি গিয়েছিলে নাকি? অনুযোগের স্বরে বলে–ডাকলে না কেন? আমার মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতাম।
ছন্দা–মাকে তো দেখলাম না, আমি তো দেখলাম একজন জেন্টস কেউ, আমি তো ভাবলাম তোর নতুন প্রডিউসার কেউ হবে।
পরি–উহু! মাসি তোমাকে নিয়ে আর পারি না। আরে ওই তো আমার বাপি। সবাই তো বলে বাপির মুখ কেটে বসানো আমার, আর তুমি কি যে দেখো? বলে কি না, নতুন প্রডিউসার!
ছন্দা–তা, আমি কি আর দূর থেকে অত শত দেখতে পেয়েছি? তোমাকে যেমন বগলদাবা করে...
পরি–গলায় আদুরে স্বর টেনে, মাসি!
ছন্দা মুখ বুজে ওর চুলের ওপর কার্লিং টাচ দিতে থাকে আর মনে মনে বলে, ওই কেটে বসানো মুখটা চিনে নিতে পেরেছিল বলেই তো...!
পরি অনবরত কী সব হাবিজাবি বলে যাচ্ছে, ছন্দার কানে ঢুকছে না, এরপর ওর হাত ধরে হ্যাঁচকা টেনে পরি গায়ের জোরে বলে, মাসি!
তৎক্ষণাৎ ঘোর কাটে ছন্দার, রিতেশ ডাকছে শট রেডি।
ছন্দার কাছ থেকে মুক্তি পেয়েই পারিজাত, যেন নাচতে নাচতে চলে গেল রিতেশের আগে আগে।
রিতেশ ছেলেটা পরিকে খুব চায় কিন্তু পারিজাত এই মুহূর্তে জুনিয়র আর্টিস্ট হলেও, ও অনেক উঁচু উড়ান উড়তে চায়। আর হবে নাই বা কেন, ডিরেক্টর পরিমল তরফদারের মেয়ে ও, অভিনয় ওর রক্তে। তাছাড়া সোনার না-হোক রুপোর চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে সে। তাছাড়া ডানাকাটা পরি না বললেও রূপসী তো বলতেই হবে তাকে। যদিও পরিমল এই ইন্ডাস্ট্রির কেউ নয়, সে থিয়েটার জগতের মানুষ। তা-ও ছেড়ে দিয়েছে, নেই নেই করে হলেও এক দশক তো হবেই।
এই গ্লামার ওয়ার্ল্ডে ছন্দারও তো কম দিন হলো না! সবসুরত তারও তো মন্দ ছিল না, তাছাড়া থিয়েটারে অভিনয় করে করে নিজেকে তৈরি করার পরও ডিরেক্টর-প্রডিউসারদের বায়নাক্কা সহ্য করেছে, কম দিন! কিন্তু, কীসে কী? শেষমেশ কি না মেকাপ আর্টিস্ট! তবে হ্যাঁ! সুছন্দা সেনের হাতে জাদু আছে, একথা টালিগঞ্জের কোনো মাইকালাল অস্বীকার করতে পারবে না।
শটটা শেষ করে এসেই নামি নায়িকাদের মতো ওমনি বায়নাবাজি শুরু হয়ে যায় পারিজাতের, রিতেশদা কোল্ড ড্রিঙ্কসটা কে খেয়ে নিল? জানোই তো, কেঁদে কেঁদে গলা আমার চোকড হয়ে যায়। রিতেশ বেচারা অপরাধীর মতো মুখ করে ছুটে চলে যায়, কোল্ড ড্রিঙ্কস আনতে।
এমন কত কী যে দেখছে সুছন্দা, নিজেকেও তো কম মূল্য দিতে হয়নি! প্রথম প্রথম কল শো থেকেই শুরু, তখন সে ফার্স্ট ইয়ার, কতই বা বয়স আঠেরো কি উনিশ। নতুন দিগন্ত পত্রিকায় একটা-দুটো কবিতা বেরিয়েছিল, ওরাই পুজোর আগে কল শো করছে, হিরোইনের পক্স হয়েছে, অথচ শো বাতিল করা মানে, দলের বদনাম, আর্থিক ক্ষতিও বটে। সেদিনই ডিরেক্টরকে প্রথম দেখল সুছন্দা, এর আগে পত্রিকায় কবিতা পড়েই ডুবেছিল। কবি মানুষটিই যখন নাটকের হিরো তখন হৃদয়ের তারে কাঁপন ধরতে বাধ্য। অভিনয়ের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না সুছন্দার, কিন্তু দুই দিনেই একেবারে সাবলীল হয়ে গেল সবটা। এর সব দাবিদার অবশ্য পরিমল তরফদার। মানুষটার ভয়ংকর একটা আকর্ষণ ছিল, না চাইতেও বাঁধা পড়ে গেল সুছন্দা।
লোকটা যে বিবাহিত সেটা অবশ্য অজানা ছিল না কারোরই, কিন্তু পর্দার পেছনে অন্য গল্প সবার মুখে মুখে ঘুরত, সেটা হলো তাদের অসুস্থ বৈবাহিক সম্পর্ক, সেটাই একান্তে সুছন্দার কাছে বলেছিল পরিমল তরফদার। সে কারণেই পিছিয়ে আসতে মন চায়নি বরং ছন্দে গানে হাসিতে কাটল বেশ কিছুদিন। তার পর...
পরি–মাসি, মাসি, মাসি!
ছন্দা অবাক হয়ে পারিজাতের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, এ কে? এ কি ছন্দা নয়?
ভুল ভাঙায় পারিজাত, মাসি আজ বিমল সেন আমাকে অ্যাপ্রিসিয়েট করেছেন। বলেছেন, ওর নেক্সট কাজে নাকি এই রকমই একজনকে খুঁজছিলেন। ভাবো তো! আমি বিমল সেনের হিরোইন।
ছন্দা–বেশ তো! তখন কি আর এই মাসির কথা মনে থাকবে?
পরি–কী যে বলো, মাসি। তুমি হলে গিয়ে আমার নিজের, এক্কেবারে নিজের মাসি। আমি হিরোইন হলে, তুমি হবে আমার নিজস্ব মেকাপ আর্টিস্ট। দেখোনি বড় বড় নায়িকাদের যেমন থাকে।
না, সুছন্দার সুযোগের অপেক্ষায় ছিল না, পরিমল তরফদার। কিন্তু পরিমল তরফদারের জীবনে সুছন্দার কোনো অবদানই কি নেই? বাড়ি থেকে টাকা পাঠানো বন্ধ হতেই সুছন্দা একটা প্রাইভেট স্কুলে জয়েন করে, তখন বাস্তবিক অর্থেই দলের কার্যকরী অফিসঘরই সুছন্দার ঘর। এ ছাড়া নিত্যদিন ছিল পরিমলের সাংসারিক অশান্তির কিসসা, আজ বাবাইয়ের দুধের টাকার জোগার না করলে, বাড়ি ফেরার উপায় নেই। কাল বাবাইয়ের জন্মদিনের পার্টির জন্য হাজার দশেক টাকার প্রয়োজন। কোনো দিন বাবাইয়ের জ্বর নিয়ে বিলাপ, কোনো দিন বাবাইয়ের পছন্দের খেলনা না কিনতে পারার যন্ত্রণা! সেই বাবাই আজকের পারিজাত, বাবা-মায়ের অ্যানিভার্সারিতে সাউথ সিটি মলে শপিং করে বেড়াচ্ছে। ছন্দার শরীর শিরশির করে ওঠে, পরিমল তরফদারকে ছোঁয়া ছন্দার আয়ত্তে নেই কিন্তু তার দেওয়া প্রতিটি অপমানের দাগ যেন এখনো দগদগে হয়ে আছে। কিন্তু কোথায় সেলিব্রেটি জগতের মানুষ পরিমল তরফদার আর কোথায় সামান্য একজন মেকাপ আর্টিস্ট সুছন্দা!
কিন্তু মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে তার, তার হাতের জাদুতে যেমন রূপসী পারিজাত অনন্যা হয়ে ওঠে, তেমনই যদি কোনো দিন একটু...!
না, তেমন কিছুই করা হয়ে ওঠে না আর। মনে মনে কামনা করত ছন্দা রিতেশের মতো সাধারণ কারও সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে যদি কোনো স্ক্যান্ডাল-ট্যান্ডাল। কিন্তু সে মেয়ের নজর আরও ওপরে। শেষমেশ বিমল সেনের চোখে পড়া চাট্টিখানি কথা নয়। পরিমল তরফদার আজীবন চেষ্টা করে যা পারেনি, ওই মেয়ে সেটাই সত্যি করে তুলছে। মুখে যাই বলুক সুছন্দা জানে, টিভির দুনিয়া ছেড়ে সিলভার স্ক্রিনে পা রাখলে আর পেছনের কথা কেউ মনে রাখে না। পরিমল তরফদার গ্রামগঞ্জের মঞ্চ দাপিয়ে বেড়িয়েই তার যা দাপট! সুছন্দা একা তো নয়, আরও কত যে মেয়ে তখন ওর আশপাশে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াত, আজ অবশ্য তাদের কোনো হদিশই নেই। বেশির ভাগই থিয়েটারকে বিদায় জানিয়ে হয় সুখে সংসার করছে, নয়তো অন্ধকারের পথে তলিয়ে গেছে।
সুছন্দা ভাবে, এই পরিমল তরফদারের জন্যই তার জীবনটা কী থেকে কী হয়ে গেল? নিজের প্রতি তার রাগ হয় মাঝে মাঝে, ঘৃণাও হয় কখনো কখনো। ইচ্ছে হয় প্রতিশোধ নেয়। আবার ভাবে, মেয়েটার কী দোষ? যে পথে পা বাড়িয়েছে, কত যে হোঁচট খেতে হবে! তখন আবার কেমন গুটিয়ে যায় নিজেই। কত রাত জেগে জেগে নানারকম ভেবে ভেবে চোখের নিচে জমাট অন্ধকার যেন বাসা বাঁধছে, আগামী মাসের প্রথম শনিবার স্টার জলসায় সন্ধ্যে ৭টায় শুঁয়োপোকার যাত্রা শুরু। তার পর বছরের পর বছর ধরে বাঙালির বসার ঘর থেকে শোবার ঘর সর্বত্রই শুঁয়োপোকার মতো ঘুরে বেড়াবে। আর একবার যদি হিট হয়ে যায়, তাহলেই কেল্লা ফতে। সুছন্দা জানে সে নিতান্তই সামান্য মানুষ, অতি ক্ষুদ্র সে। ইচ্ছে করলেও সে পরির মুখটা নষ্ট করে দিতে পারে না। আর শুধু পরিমলের মেয়ে কেন, কোনো মেয়েরই না। না কোনো দুর্বলতার জন্য নয়, সে আসলেই পারে না। কখনো এসব করেনি বলেই হয়তো পারে না। আসলে ভয়ংকর একটা কিছু করতে অনেকটা সাহস লাগে, সে সব তার নেই, কোনো কালেও ছিল না।
এককাপ কফি নিয়ে সুছন্দা বারান্দায় বেরিয়ে এসেছিল, ভেতরে খাবার আর ড্রিঙ্কসের গন্ধ মিলেমিশে কি ভয়ংকর একটা বোটকা গন্ধে পরিণত হয়েছে, গা গুলিয়ে ওঠে। দেখতে দেখতে ইন্ডাস্ট্রিতে তো কম দিন হলো না, কিন্তু সুছন্দার ওসবে মন নেই। পার্টিটার্টি তার একদম ভালো লাগে না, তবু যেতেই হয়। শখ-আহ্লাদ সবকিছুই হারিয়ে ফেলেছে সে, তার যা কিছু ছিল একসময়। এমনকি দুর্নাম রটায় স্কুলের চাকরিটাও তার চলে গেল সে সময়, যখন চাকরির দরকার ছিল সবচেয়ে বেশি। টাকাটা তো একটা ফ্যাক্টর বটেই কিন্তু ওই বাচ্চাদের সঙ্গে মনের একটা সেতু গড়ে উঠেছিল যেন।
সেটাও গেল ধ্বংস হয়ে, দলে থাকতে মেকাপের কাজ কিছুটা শিখে গিয়েছিল, সেই কাজেই হাত পাকালো অবশেষে। কফির কাপটা শেষ হতে যেই না কাপটা ফেলার জন্য ঘুরতে যাবে ওমনি রিতেশের সঙ্গে প্রায় ধাক্কা। ছেলেটার চোখে-মুখে স্পষ্ট ভয়ংকর একটা ক্রুঢ়তা, দেখে চমকে উঠল সুছন্দা। ওর চোখদুটো যে কাকে খুঁজছে, অজানা নয় তার। রিতেশ তাকাতেই সুছন্দা বলল গাড়িতে গিয়ে বোস। রিতেশ বলল, মাসি আমি ওকে অনেক...। সুছন্দা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, একটাও কথা নয়, রাত শেষ হওয়ার আগেই যা করার করতে হবে, তোমরা কজন। রিতেশ টলতে টলতে বাম হাতের তিনটে আঙুল দেখাল। সুছন্দা পারিজাতকে কৌশলে পার্টি থেকে বাইরে নিয়ে এল। তাদের মধ্যে সামান্য যে কথোপকথন এইরকম–
পরি–মাসি! বিমল সেনকে দেখেছ?
ছন্দা–অনেক রাত হয়ে গেছে, তুমি এখন বাড়ি যাও।
পরি–বিমল সেন?
ছন্দা–তোমার নেশা হয়ে গেছে। এখন আর নয়।
পরি–কিন্তু...!
ছন্দা–কোনো কিন্তু নয়, রিতেশ তোমাকে পৌঁছে দেবে।
পরি–রিতেশ! রিতেশ মাই ফুট!
আমি...আমি...ওই স্ক্রাউন্ডেলটা...
এরপরই ছন্দার হাত থেকে পারিজাতের ফুটফুটে শরীরটা রিতেশদের হাতের মধ্যদিয়ে কালো স্করপিওটার মধ্যে চালান হয়ে গেল। তার পর রাতের আলোকে ম্রিয়মাণ করে সবার অলক্ষ্যেই কালো স্করপিওটা গতি বাড়িয়ে চলে গেল দূর! বহুদূরে। সুছন্দা জানে না, পারিজাতের পাপড়িগুলো দিনের আলোয় প্রজাপতি হয়ে ডানা মেলবে কি না। নাকি শুঁয়োপোকা রিলিজ করার আগেই পারিজাতের বাগানটা তছনছ হয়ে যাবে, শুঁয়োপোকার অত্যাচারে। ছন্দার ইচ্ছে হলো একটা দীর্ঘ ঘুমের মধ্যে চলে যায়, অনেক কালের পার্থিত সে ঘুম। গভীর সে ঘুম!