কখনো কখনো একটি গোল শুধু স্কোরলাইন বদলায় না। বদলে দেয় পুরো একটি জাতির স্বপ্নের রং। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলটি ঠিক তেমনই ছিল। মুহূর্তের মধ্যে ইংল্যান্ড স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, দীর্ঘ ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসান বুঝি এবারই হতে যাচ্ছে।
গর্ডনের গোলের পর আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ইংলিশ সমর্থকদের উল্লাসে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। কিন্তু ফুটবল যে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কোনো গল্পের সমাপ্তি লিখে না, সেটিই আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
শেষ দিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। ফলে ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
তবে ইংলিশদের এই পরাজয়ের অন্ধকারে গর্ডনের পারফরম্যান্স হারিয়ে যায়নি। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন গোলরক্ষকের প্রশংসা করে বলেন, ‘অ্যান্থনি গর্ডন অসাধারণ খেলেছে।
বড় মঞ্চে সে ভয় পায়নি। এমন ম্যাচে গোল করা সহজ নয়। আমরা ফল পাইনি, কিন্তু ও ভবিষ্যতের জন্য বড় বার্তা দিয়েছে।’ ইংল্যান্ডের কোচও গর্ডনের প্রশংসায় ছিলেন উদার।
টমাস টুখেলে বলেন, ‘গর্ডন পুরো ম্যাচে দারুণ শক্তি, গতি আর সাহস দেখিয়েছে। শুধু গোল নয়, সে প্রতিপক্ষকে সারাক্ষণ চাপে রেখেছে। এই পারফরম্যান্সই প্রমাণ করে, আগামী বছরগুলোতে ইংল্যান্ডের আক্রমণের অন্যতম ভরসা হতে পারে সে।’
সাবেক ইংলিশ ফুটবলারদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গর্ডনের প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, সেমিফাইনালের মতো চাপের ম্যাচে যেভাবে তিনি সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন, সেটি একজন পরিণত ফরোয়ার্ডের লক্ষণ।
অনেকেই লিখেছেন, ফল হতাশাজনক হলেও গর্ডন মাথা উঁচু করেই মাঠ ছাড়তে পারে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রাও গর্ডনের পারফরম্যান্সকে সম্মান জানিয়েছেন। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার নাহুয়েল মলিনা বলেন, ‘গর্ডন খুবই বিপজ্জনক ছিল। ওকে সামলাতে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে।’
তবে সবচেয়ে আবেগঘন কথাগুলো এসেছে গর্ডনের নিজের মুখ থেকেই। ম্যাচ শেষে চোখে স্পষ্ট হতাশা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা খুব কষ্টের। আমরা ফাইনালের খুব কাছে ছিলাম। গোল করার মুহূর্তটা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অনুভূতি ছিল। কিন্তু এখন সেটা উপভোগ করাও কঠিন। কারণ আমরা জিততে পারিনি।’
স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায় খেলা ২৫ বছর বয়সী এই উইঙ্গার বলেন, ‘আমি আমার সতীর্থদের নিয়ে গর্বিত। আমরা শেষ পর্যন্ত লড়েছি। সমর্থকদের জন্য খারাপ লাগছে, কারণ তারা আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিল। কিন্তু আমরা ফিরে আসব। এই দল আরও শক্তিশালী হবে।’
নিজের গোল নিয়ে গর্ডনের মন্তব্য ছিল সংযত, ‘ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলের জয় আমার কাছে অনেক বড়। গোল করেছি, কিন্তু সেটা কোনো আনন্দ এনে দিচ্ছে না। যদি সেই গোল আমাদের ফাইনালে তুলতে পারত, তাহলে হয়তো আজকের অনুভূতিটা অন্যরকম হতো।’
বিশ্বকাপের এই আসরে গর্ডনের উত্থানও কম নাটকীয় নয়। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউট; প্রতিটি ধাপে নিজের গতি, নির্ভীক ড্রিবলিং এবং গোল করার দক্ষতায় তিনি নজর কেড়েছেন। সেমিফাইনালের গোলটি যেন সেই আত্মবিশ্বাসেরই প্রতিচ্ছবি।
ইংল্যান্ডের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি। গর্ডনের জ্বালানো আশার আলোও শেষ বাঁশির আগে নিভে গেছে। কিন্তু অনেক সময় হারও ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো ইংল্যান্ডকে আরেকটি হৃদয়ভাঙার গল্প উপহার দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি নতুন নায়কের জন্মও দেখেছে।
ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙেছে, কিন্তু গর্ডনের নামটি থেকে গেছে আলোচনার কেন্দ্রেই। ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ গোলের আত্মবিশ্বাস হয়তো তার সামনের পথচলায় টনিক হিসেবে কাজ করবে।