মানুষের জীবনের অন্যতম সুন্দর এবং পবিত্র অধ্যায় হলো বিয়ে। এটি কেবল দুটি মানুষের শারীরিক বা মানসিক চাহিদার মিলন নয়, বরং আজীবনের এক দায়িত্ব ও সামাজিক বন্ধন। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে কেউ কেউ যখন লিভ-ইন টুগেদার বা চুক্তির নামে ক্ষণস্থায়ী সম্পর্ককে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—ইসলামি শরিয়াহ কি এমন কোনো অস্থায়ী সম্পর্কের সুযোগ দেয়? ঠিক এখানেই চলে আসে মুতা বিয়ে বা সাময়িক বিবাহের প্রসঙ্গটি। ইসলামে এই বিধানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মুতা বিয়ে কী?
মুতা শব্দের অর্থ হলো ভোগ বা আনন্দ লাভ করা। ইসলামি পরিভাষায়, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ মোহরানার বিনিময়ে কোনো নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে মুতা বিয়ে বলা হয়। এই বিয়ের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, চুক্তির সময়সীমা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই কোনো তালাক ছাড়াই বিয়েটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
অনুমতির প্রাথমিক প্রেক্ষাপট
ইসলামের প্রাথমিক যুগে দীর্ঘ সফর বা যুদ্ধক্ষেত্রে সাহাবিদের চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো। সেই বিশেষ ও জরুরি প্রয়োজনে সাময়িকভাবে এই বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সহিহ মুসলিম শরিফের ৩২৮৫ হাদিসে বর্ণনায়ে এসেছে জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) উল্লেখ করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এবং আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতকালের প্রথম দিকেও বিশেষ প্রয়োজনে এর চর্চা ছিল। মূলত জাহেলি যুগের একটি অভ্যাসকে ইসলাম ধাপে ধাপে সংস্কার করার উদ্দেশ্যে শুরুতে কিছুটা শিথিলতা রেখেছিল।
ইসলামি শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ রূপায়ণের সাথে সাথে মুতা বিয়ের এই সাময়িক অনুমতি চিরতরে রহিত করা হয়। আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, খায়বার যুদ্ধের সময়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুতা বিয়ে এবং গৃহপালিত গাধার মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেন (সুনান আত তিরমিজি, ১১২১)।
মক্কা বিজয়ের পর এই নিষেধাজ্ঞা আরও দৃঢ়ভাবে ঘোষিত হয়। রাবি বিন সাবরাহ (রহ.) তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমি তোমাদেরকে মেয়েদের সাথে মুতা করার অনুমতি দিয়েছিলাম। অবশ্য আল্লাহ তায়ালা এখন কিয়ামত পর্যন্ত তা হারাম করে দিয়েছেন। (বুলুগুল মারাম, ৯৯৭)।
সাহাবি ইবনু আব্বাস (রা.) শুরুতে এর বৈধতার পক্ষে মতামত দিলেও, নিষেধাজ্ঞা ও রহিতকরণের হাদিস জানতে পেরে পরবর্তীতে নিজের মত প্রত্যাহার করে নেন।
কোরআনের ব্যাখ্যা ও আলেমদের ঐকমত্য
সুরা আন-নিসার ২৪ নম্বর আয়াতের একটি অংশকে কেউ কেউ ভুল ব্যাখ্যা করে মুতা বিয়ের দলিল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। তবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের ইমাম ও মুফাসসিরদের মতে, এই আয়াতটি সাধারণ ও স্থায়ী বিবাহের মোহরানা আদায়ের নির্দেশ দেয়, সাময়িক বিয়ের নয়। ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাক (রহ.)-সহ অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতে, মুতা বিয়ে সম্পূর্ণ বাতিল এবং কিয়ামত পর্যন্ত হারাম।
ইসলাম বিয়েকে একটি দীর্ঘমেয়াদি, দায়িত্বশীল ও সম্মানজনক পারিবারিক কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই সাময়িক আনন্দের মোড়কে কোনো অস্থায়ী চুক্তি ইসলামি শরিয়ায় কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক