প্রশাসনে পদোন্নতি-পদায়নে জটিলতা যেন কাটছেই না। সম্প্রতি প্রশাসন বিভাগে বড় সংখ্যক পদোন্নতি এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
ভুক্তভোগী একাধিক কর্মকর্তা ও প্রশাসন-সংশ্লিষ্টতা জানান, গত ৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১৭৯ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেয়, যাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিভাগীয় শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং বিগত সরকারের সময়ে বিতর্কিতরাও রয়েছেন।
মূলত, এই পদোন্নতির তালিকা প্রকাশের পর থেকেই নতুন করে প্রশাসনে অসন্তোষ এবং ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। মাঠ প্রশাসন ও সচিবালয়ের শীর্ষ পদগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং বিতর্কিত ও দণ্ডপ্রাপ্তদের পদোন্নতির তালিকায় রাখার অভিযোগ ঘিরে প্রশাসনজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) প্রায় আট মাস যাচাই-বাছাই করার পর এই পদোন্নতির তালিকা তৈরি হয়। কিন্তু এর পরও কেন বঞ্চিত ও অবহেলিতরা তালিকার বাইরে থাকল তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনাও জরুরি।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর কর্মকর্তারা প্রশাসনের পদোন্নতি প্রদানসংক্রান্ত বৈষম্য দূর হওয়ার আশা করলেও বর্তমানে ‘অবমূল্যায়ন’ বা অবহেলার মাঝে অনেককেই দিন পার করতে হচ্ছে। ফলে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে একশ্রেণির কর্মকর্তার মাঝে। যার প্রভাব পড়ছে প্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রমেও। বর্তমানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আগের তুলনায় কমেছে। আগে যেসব ফাইল নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হতো, এখন সেগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে। এতে একটি ফাইল নিষ্পত্তিতে অতিরিক্ত সময় লাগছে এবং প্রশাসনের গতি কমে যাচ্ছে।
খবরের কাগজের প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নানা হতাশার চিত্র উঠে এসেছে। কর্মকর্তাদের দাবি, একটি প্রভাবশালী অদৃশ্য সিন্ডিকেট প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে বলে সচিবালয়জুড়ে গুঞ্জন রয়েছে। এই সিন্ডিকেট প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রকৃত তথ্য পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করছে এবং তুলনামূলক কম যোগ্য কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে প্রশাসনের ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে। মূলত এই সিন্ডিকেটের প্রভাবেই সম্প্রতি পদোন্নতি নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হয়। তাই পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতা ,সততা ও প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ বিবেচনা করেই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সমর্থক হলেই ভালো পদে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ নেই। এতে সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি-পদায়নের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি যাদের আনুগত্য রয়েছে তাদের মূল্যায়ন করা উচিত। তা না হলে জনপ্রশাসনে হতাশা-ক্ষোভ বাড়তেই থাকবে।
প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতিবঞ্চিত ও অবহেলিত কর্মকর্তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ ও টানাপোড়েন চলছে তা দূর করতে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না করে মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পদোন্নতি ও পদায়ন নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনের কাজে গতি বাড়বে এবং তাদের মধ্যে প্রেরণা তৈরি হবে। রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে একটি নিরপেক্ষ, দক্ষ ও মেধাভিত্তিক জনকল্যাণমূলক প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার সচেষ্ট হবে এটিই প্রত্যাশা।