ষাটের দশকে যে কজন লেখক সাহিত্যের নানা শাখায় সমান স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করেছেন, আহমদ ছফা তাদের অন্যতম। সাহিত্যের চূড়ান্ত মূল্যায়ন মহাকালের হাতে ন্যস্ত হলেও সমকালেই তিনি পাঠক ও সমালোচকদের বিশেষ মনোযোগ অর্জন করেছিলেন। ‘ওঙ্কার’ আহমদ ছফার তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীকধর্মী উপন্যাস। ‘ওঙ্কার’ একটি পারিবারিক উপন্যাস নয়; এটি বাঙালির ভাষাচেতনা, আত্মপরিচয় এবং স্বাধিকার আন্দোলনের এক অনন্য প্রতীকী আখ্যান। মুখ থেকে ঝরে পড়া রক্ত শহিদ আসাদের আত্মত্যাগের সঙ্গে মিলেমিশে একটি বৃহত্তর জাতীয় ইতিহাসের রূপ ধারণ করে। ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এখানে পরিণত হয় সমষ্টিগত আত্মজাগরণের শিল্পরূপে।...
আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বহুমাত্রিক লেখক। প্রাবন্ধিক হিসেবে তাঁর খ্যাতি সর্বাধিক হলেও তিনি কবিতা, উপন্যাস, গান, অনুবাদ ও শিশুসাহিত্যেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। ষাটের দশকে যে কজন লেখক সাহিত্যের নানা শাখায় সমান স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করেছেন, আহমদ ছফা তাঁদের অন্যতম। সাহিত্যের চূড়ান্ত মূল্যায়ন মহাকালের হাতে ন্যস্ত হলেও সমকালেই তিনি পাঠক ও সমালোচকদের বিশেষ মনোযোগ অর্জন করেছিলেন।
১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ‘ওঙ্কার’ আহমদ ছফার একটি ছোট আকারের কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীকধর্মী উপন্যাস। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি পারিবারিক কাহিনি হলেও এর অন্তর্লীন বিষয় বাঙালির আত্মপরিচয়, ভাষাচেতনা এবং স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাস। একটি পরিবারের সংকটের ভেতর দিয়ে লেখক পুরো জাতির রাজনৈতিক জাগরণকে রূপকধর্মী শিল্পভাষায় প্রকাশ করেছেন।
উপন্যাসের কথক একটি ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারের সন্তান। দেশভাগ ও জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর পরিবারটি আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সুযোগে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সুবিধাভোগী আবু নসর মোক্তার নিজের বোবা মেয়ের সঙ্গে কথকের বিয়ে দেন। কথক ভীরু, আত্মকেন্দ্রিক এবং রাজনীতিবিমুখ। কিন্তু তাঁর বোবা স্ত্রী সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের। রাজপথে মিছিলের শব্দ উঠলেই সে জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে থাকে; যেন বাইরে উচ্চারিত প্রতিবাদের ভাষা তার নিঃশব্দ অন্তর্জগতে প্রতিধ্বনিত হয়। সেই সময়ের দেশের পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা জানা যায় ঔপন্যাসিকের বিবরণে–
‘শেখ মুজিব জেলে। আগরতলা মামলার বিচার চলছে। এখানে ওখানে বোমা ফুটছে, মিটিং চলছে। ঝাঁকে-ঝাঁকে মিছিল বেরিয়ে আসে। গুলি চলে। লাল তাজা খুনে শহরের রাজপথ রঞ্জিত হয়। সরকারী পত্রিকার অফিসগুলোতে হুতাশনের মতো প্রলয়করী অগ্নিশিখা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। প্রতিটি সকালেই খবরের কাগজের পাতা উল্টোলেই টের পাওয়া যায় ভয়ংকর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। গতিকটি সুবিধের নয় বলে মনে হলো। আইয়ুব খানের সিংহাসন ঝড়ে পাওয়া নায়ের মতো টলছে। শক্ত মানুষ ফিল্ড মার্শালের জন্য চিন্তিত হলাম। মার্শাল যদি যান আমার শ্বশুরও তো চিৎপটাং হবেন। যাদের করুণার বদৌলতে আমি পাড়া-গাঁয়ের ধূলিশয্যা থেকে এই বড় কর্তার আসনে উঠে এসেছি, তাঁরা সকলে যাবেন অথচ আমি একা থাকব সে কেমন করে হয়। শ্বশুরের জন্যে চিন্তিত হলাম। কথাটি পুরোপুরি সত্যি নয়। আসলে আমার মনেই দুশ্চিন্তা শত শত হুল ফোঁটাচ্ছিল।’
এই অংশে আহমদ ছফা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ব্যঙ্গের মাধ্যমে কথকের মানসিকতা উন্মোচন করেছেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে যখন সমগ্র পূর্ববাংলা আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে উত্তাল, তখন কথক জনগণের মুক্তির চেয়ে নিজের নিরাপত্তা ও সুবিধা হারানোর আশঙ্কায় বেশি উদ্বিগ্ন। আইয়ুব খানের পতন মানেই শ্বশুরের ক্ষমতা ও নিজের সামাজিক অবস্থানের অবসান–এই চিন্তাই তাকে গ্রাস করে। ফলে কথক এখানে স্বাধিকারবিরোধী সুবিধাবাদী মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি, যার ব্যক্তিস্বার্থ জাতীয় স্বার্থকে আড়াল করে রেখেছে।
এই বোবা নারী কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি হয়ে ওঠেন দীর্ঘদিন ধরে বাকরুদ্ধ বাঙালি জাতির প্রতীক। অন্যদিকে কথক প্রতিনিধিত্ব করেন সেই সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে, যারা ইতিহাসের সংকটময় মুহূর্তেও নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে চায়। এই দ্বৈত প্রতীক নির্মাণের মধ্য দিয়েই আহমদ ছফা উপন্যাসটিকে পারিবারিক আখ্যানের সীমা অতিক্রম করে জাতীয় ইতিহাসের শিল্পরূপে উন্নীত করেছেন।
উপন্যাসের চূড়ান্ত মুহূর্তটি আসে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমিতে। ছাত্রনেতা আসাদের শাহাদাতের পর রাজপথ যখন উত্তাল, তখন সেই প্রতিবাদী জনতার প্রাণশক্তি এসে আঘাত করে বোবা বউয়ের অবরুদ্ধ চেতনাকে। দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে সে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে–‘বাঙলা’। শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসে এবং সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। উপন্যাসের কথক বলেন–
‘আচানক বোবা বৌ জানলা-সমান লাফিয়ে বাঙলা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করল। তার মুখ দিয়ে গলগল রক্ত বেরিয়ে আসে। তারপর মেঝেয় সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে থাকে। ভেতরে কী একটা বোধহয় ছিঁড়ে গেছে। আমি মেঝের ছোপ-ধোপ টাটকা লালরক্তের দিকে তাকাই, অচেতন বৌটির দিকে তাকাই। মন ফুড়েই একটা প্রশ্ন জাগে–কোন রক্ত বেশি লাল? শহীদ আসাদের, না আমার বোবা বৌয়ের?’
বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় প্রতীকী মুহূর্ত এটি। বোবা বউয়ের কণ্ঠমুক্তি আসলে একটি জাতির কণ্ঠমুক্তি। তাঁর মুখে উচ্চারিত ‘বাঙলা’ শব্দটি কেবল ভাষার নাম নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। মুখ থেকে ঝরে পড়া রক্ত শহীদ আসাদের আত্মত্যাগের সঙ্গে মিলেমিশে একটি বৃহত্তর জাতীয় ইতিহাসের রূপ ধারণ করে। ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এখানে পরিণত হয় সমষ্টিগত আত্মজাগরণের শিল্পরূপে।
আহমদ ছফা অত্যন্ত সংযত শিল্পকৌশলে দেখিয়েছেন, কীভাবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক দমনের বিরুদ্ধে একটি জাতির প্রতিবাদ ক্রমে স্বাধিকারের আন্দোলনে রূপ নেয়। বোবা বউয়ের কণ্ঠ ফিরে পাওয়া সেই ঐতিহাসিক উত্তরণেরই প্রতীক। ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার এখানে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক অর্থ লাভ করে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে কেউ কেউ ‘ওঙ্কার’কে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস হিসেবে অভিহিত করার চেষ্টা করছেন। এই মূল্যায়ন ইতিহাসসম্মত বলে মনে হয় না। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় সময় ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং বাঙালির স্বাধিকারচেতনা। এখানে উচ্চারিত ‘বাঙলা’ ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার আন্দোলনের ধারাবাহিকতাকে ধারণ করে; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সামরিক বাস্তবতা বা স্বাধীনতার যুদ্ধ এর বিষয় নয়। ফলে একে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস উপন্যাসটির প্রকৃত ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি করে। এর অর্থ এই নয় যে, ‘ওঙ্কার’-এর গুরুত্ব কমে যায়। বরং এই উপন্যাসের অসামান্য সাফল্য এখানেই যে, মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী বাঙালির রাজনৈতিক আত্মজাগরণকে আহমদ ছফা একটি শক্তিশালী প্রতীকের মাধ্যমে শিল্পরূপ দিয়েছেন। একটি মাত্র শব্দ ‘বাঙলা’ এবং একটি রক্তাক্ত দৃশ্যের মধ্য দিয়ে তিনি ইতিহাসের এক যুগান্তকারী মুহূর্তকে ধারণ করেছেন।
‘ওঙ্কার’ তাই কেবল একটি পারিবারিক উপন্যাস নয়; এটি বাঙালির ভাষাচেতনা, আত্মপরিচয় এবং স্বাধিকার আন্দোলনের এক অনন্য প্রতীকী আখ্যান। বাংলা উপন্যাসে প্রতীকের এমন সংযত, গভীর এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহার বিরল। এই কারণেই ছোট আকারের হলেও ওঙ্কার আহমদ ছফার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পসাফল্য এবং বাংলা কথাসাহিত্যের একটি স্মরণীয় সৃষ্টি।