সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব সরস্বতী পূজা আজ সোমবার। হিন্দু ধর্মীয় বিধান অনুসারে শ্বেত হংসের পিঠে চড়ে পৃথিবীতে নেমে আসবেন বিদ্যা ও ললিতকলার দেবী। কৃপা লাভের আশায় দেবীকে আহ্বান করবেন ভক্তরা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে আয়োজন করা হয়েছে পূজার। ঢাকঢোল-কাঁসর, শঙ্খ ও উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ।
হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে, মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা হয়। এ তিথি বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত। শ্বেত-শুভ্র বসনা স্বরসতী দেবীর এক হাতে বেদ, অন্য হাতে বীণা। এ জন্য তাকে বীণাপাণিও বলা হয়। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জ্ঞান ও বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী তার আশীর্বাদের মাধ্যমে মানুষের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করতে প্রতিবছর আবির্ভূত হন ভক্তদের মাঝে। সরস্বতী খুশি হলে বিদ্যা ও বুদ্ধি অর্জিত হবে। ঐশ্বর্যদায়িনী, বুদ্ধিদায়িনী, জ্ঞানদায়িনী, সিদ্ধিদায়িনী, মোক্ষদায়িনী এবং শক্তির আঁধার হিসেবে সরস্বতী দেবীর আরাধনা করা হয়। তিনি বাগদেবী। বাগদেবী অর্থে তিনি নব হৃদ পবিত্র করেন। তিনি সুন্দর ও মর্ত্যবাক্যের প্রেরণকাত্রী। তিনি মহাসমুদ্রের মতো পরমাত্মার প্রকাশ করেন। তিনি সমুদয় মানব-মানবীর হৃদয়ে জ্যোতি সঞ্চারিত করেন। পরমাত্মার মুখ থেকে তার আবির্ভাব।
মধ্যরাতে প্রতিমা প্রতিষ্ঠার পর ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সকালে দেবীকে দুধ, মধু, দই, ঘি, কর্পূর, চন্দন দিয়ে স্নান করানো হয়। এরপর চরণামৃত নেবেন ভক্তরা। এসবের পরে হবে বাণী অর্চনা। পুরোহিতরা ‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে/বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাংদেহী নমোহস্তুতে’ এ মন্ত্রে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা করবেন, পূজার আচার পালন করবেন। এরপর ভক্তরা দেবেন পুষ্পাঞ্জলি। সকাল থেকে উপবাস থেকে মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে ভক্তরা প্রার্থনা জানাবেন বিদ্যাধিষ্ঠাত্রীর।
সারা দেশের পূজামণ্ডপ ছাড়াও স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও ঘরে ঘরে সরস্বতী পূজার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পূজা ছাড়াও অন্য অনুষ্ঠানমালায় আছে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ বিতরণ, ধর্মীয় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সন্ধ্যা আরতি, আলোকসজ্জা প্রভৃতি। দেবীর সামনে ‘হাতেখড়ি’ দিয়ে শিশুদের বিদ্যাচর্চার সূচনা হবে অনেক স্থানে।
ঢাবির জগন্নাথ হলের ৭৩ বিভাগ-ইনস্টিটিউটের মণ্ডপে এবারের আরাধনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জগন্নাথ হলে ৭৩ বিভাগ-ইনস্টিটিউটের মণ্ডপে এবার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গতকাল রবিবার হল প্রাঙ্গণে ১৫ বছর ধরে ঢাবির জগন্নাথ হলে সরস্বতী পূজার প্রতিমা নির্মাণকাজে নিয়োজিত থাকা কারিগর বিষু পালের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, এ বছর সব মিলিয়ে ৫০টির মতো প্রতিমা নির্মাণ করা হয়েছে। সবচেয়ে ছোটটির নির্মাণ খরচ পড়েছে ২ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকার প্রতিমা নির্মাণ করা হয়েছে।
এদিকে জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ ও সরস্বতী পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক দেবাশীষ পাল বলেন, ‘সরস্বতী পূজা ঘিরে সার্বিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধানে হল প্রশাসনের মোট ১১টি উপকমিটি কাজ করছে। আগত পুণ্যার্থীদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতার জন্য বেশ কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী নিয়োজিত থাকবেন। এ ছাড়া পূজামণ্ডপ থেকে শুরু করে সমগ্র হল প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় লোকবল ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আমাদের পাশে থাকবেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।’
জবির ৩৯ মণ্ডপে সরস্বতী পূজা
জবি প্রতিনিধি জানান, বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতীকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। প্রতিবছরের মতো এবারও নানা আয়োজনে জবিতে হতে যাচ্ছে সরস্বতী পূজা। ৩৯টি মণ্ডপে পালিত হবে সরস্বতী পূজা। চলছে প্রতিমা বানানোর কাজ।
গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল এসব বিষয় জানান। তিনি বলেন, ‘এ বছর আমাদের মণ্ডপ সংখ্যা বেড়েছে। মোট ৩৯টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন হবে। ছাত্রী হলের মণ্ডপটি হলের ভেতরেই করা হবে। ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। রাতের মধ্যেই সব মণ্ডপ প্রস্তুতির কাজ শেষ করবেন সংশ্লিষ্টরা। আইনশৃঙ্খলার বিষয়েও সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, এ বিষয়ে প্রক্টরের সঙ্গেও আমাদের বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে।’
রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল আরও বলেন, ‘পূজা সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে। রাত ৮টায় সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও পুরান ঢাকা ও আশপাশের এলাকার মানুষ এই পূজায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। আশা করছি সম্মিলিত অংশগ্রহণে জমজমাট আয়োজনের মধ্য দিয়ে সুষ্ঠুভাবে আমরা পূজা সম্পন্ন করতে পারব।’