বইমেলার প্রয়োজন ছিল। আমাদের বইয়ের বিপণন খুবই সংকুচিত। বই প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে, তেমন ব্যবস্থা নেই। প্রকাশকরা বিজ্ঞাপন দিতে চান না। একটা বই প্রকাশ হওয়ার পর তা নিয়ে আলোচনা বা মন্তব্য শোনা যায় না, যা আগের দিনে ছিল। বইমেলা শুরু হয়েছিল বলতে গেলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা অনেক বই প্রকাশ করেছিলেন। তিনি দেখলেন যে, তার বইগুলো বিক্রি করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলেন। ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি নিজের বই নিয়ে বাংলা একাডেমিতে বসেছিলেন এবং পরে সেটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। পরে বইমেলাটা বাংলা একাডেমির কর্তৃত্বে চলে যায়। বইমেলার কর্তৃত্ব ও ব্যবস্থাপনাটা যদি প্রকাশকরা নিজেরা নিতেন, তাহলে এটার ব্যবস্থাপনাটা আরও ভালো হতো। কিন্তু সেটা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। কারণ প্রকাশকরা আমাদের এখানে নানাভাবে বিভক্ত। প্রকাশকরা নিজেদের স্বার্থ দেখেন, সমষ্টিগত স্বার্থ দেখেন না। বইমেলা বেশি বাণিজ্যিক হয়ে গেছে। বইয়ের সঙ্গে পাঠকের পরিচিতি হোক। অনেক বই বের হচ্ছে ভালো কথা, কিন্তু ভালো মানের বই খুব কম বের হচ্ছে। আবার কিছু ভালো মানের বইও বের হচ্ছে।
এবারের বইমেলায় আমার ঊনসত্তরের অভ্যুত্থানের ওপর বই লিখেছি। ‘ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান ও জনমুক্তির প্রশ্ন’ নামে প্রথমা থেকে বই বের হয়েছে। এ ছাড়া কথাপ্রকাশ থেকে ‘উন্নতি উত্থান অভ্যুত্থান’ ও ‘হাউসম্যানের কাব্যের স্বভাব’ নামে বই বের হয়েছে।
আমি সংবাদ পত্রিকায় ‘সময় বহিয়া যায়’ শিরোনামে গাছপাথর ছদ্মনামে বিভিন্ন প্রবন্ধ লিখতাম। তার নেপথ্যে দুটি কারণ আছে। একটি কারণ ব্যক্তিগত। আমি সব সময় নিজেকে প্রচ্ছন্ন রাখার পক্ষপাতি ছিলাম। নিজেকে গোপন রেখে ছদ্মনামে লিখে আপেক্ষিক একটা স্বাধীনতা ভোগ করতাম। সেটা হলো আমি নিজে দায়িত্ব নিচ্ছি না। পাঠক হয়তো জেনে যাচ্ছে কে লিখছে। কিন্তু তারা তো আমাকে বলতে পারছে না যে আমার লেখা। নিজের নামে প্রকাশিত না হওয়ার মধ্যে একধরনের স্বাধীনতা রয়েছে।
মূল কারণটা হচ্ছে আমি যখন এভাবে লিখতাম, তখন দেশে একধরনের বুদ্ধিভিত্তিক শূন্যতা ছিল। তার প্রধান কারণ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। তখন সমাজতান্ত্রিক যে চিন্তাধারা, তা বড় একটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। সমাজতন্ত্র ছাড়া পুঁজিবাদের যে দৌরাত্ম্য, সেখান থেকে মুক্তির কোনো সুযোগ নেই। ব্যক্তিমালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানার ব্যবস্থা করতে হবে। ওই চিন্তাকে ধারণ করেই আমি লিখতাম। আমার কলামে সব সময় সাহিত্য, ইতিহাস থেকে উল্লেখ করতাম। আমার লেখা পাঠকের কাছে হৃদয়গ্রাহী করতে চাই। তবে আমার লেখার পেছনে অবশ্যই কিছু কারণ থাকত, তাহলো পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্য।
বর্তমান সময়ের কবিতা, গল্প, উপন্যাস সময়কে ধারণ করে। তবে সেটা কীভাবে ধারণ করে, তা দেখতে হবে। বাস্তবতার ভেতর আরেকটা বাস্তবতা রয়েছে। কোনো লেখাই ইতিহাসের বাইরে নয়। সব লেখাতেই ইতিহাস ও বাস্তবতার প্রতিফলন থাকে। মানুষের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, অনুভূতি তা গভীরভাবে লেখক প্রকাশ করেন কি না, সেটা দেখতে হবে।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন: সানজিদ সকাল