এবারের বইমেলা নিয়ে অনেক উদ্বেগ ছিল যে, মেলা হবে কি হবে না। দু-একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও মেলা চলছে ভালোই। প্রকাশকরা বলছেন, বই বিক্রি অনেক কমে গেছে। এবার আমার আত্মজৈবনিক গদ্য ‘পালকের চিহ্নগুলি’ বেঙ্গল বুকস থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ভেবেছিলাম কোনোদিন স্মৃতিগদ্য লিখব না। এ দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সবসময় সত্য কথা লেখা যায় না। সত্য কথা যদি নাই-বা লেখা যায়, তাহলে স্মৃতিগদ্য লিখে লাভ কী? আমি ফেসবুকে কিছু পোস্ট দিয়েছিলাম, সেখানে কিছু বিপণ্নতার কথা ছিল। আমার দাম্পত্য জীবন নিয়ে পজিটিভ ও নেগেটিভ দুই ধরনের কথাই লিখেছি। তখন মনে হলো যে আমার স্মৃতিগদ্য লিখে ফেলি।
সৃষ্টিশীল মানুষকে টানে বেদনা। সে বেদনার কাছে যেতে চায় না, কিন্তু বেদনা তাকে কাছে টেনে নেয়। সৃষ্টিশীল মানুষ বেলুন ওড়ানো দেখে আনন্দ পাবে, কিন্তু যখন রাস্তার পাশে একজন মানুষকে কাঁদতে দেখবে, তখন সৃষ্টিশীল মানুষ হাজারো প্রশ্ন করবে। সে বাসায় এসেও ছটফট করবে তাকে নিয়ে। আমি আড্ডা পছন্দ করি। কিন্তু যখন লিখি, তখন আমি অন্য মানুষ হয়ে যাই।
সারা জীবন শুনেছি, লেখকের সঙ্গে পাঠক দেখা করতে আসেন। এখন লেখকরা জোর করে পাঠকের হাতে বই গছিয়ে দেন। এমন হলে কীভাবে লেখক শ্রদ্ধা পাবেন। পাঠকের কাছে লেখক যদি শ্রদ্ধাই না পান, তাহলে লেখক হিসেবে জন্ম নেওয়া বৃথা। লেখকের ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠতে হবে।
প্রযুক্তি অনেক জায়গা দখল করে নিয়েছে। অ্যানালগ সিস্টেম বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বই বন্ধ হয়ে যায়নি। ই-বুক বের হলেও যারা পাঠের আনন্দ পান, একটা অক্ষরের মধ্যে হাজারটা অক্ষর খুঁজে পান এবং বহুমাত্রিকতা খুঁজে পান, তারা কখনো শুনে অভ্যস্ত হবেন না। তাহলে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা হতো না। আমরা বইয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
যখন লিখতে বসি, তখন আমি নারী না পুরুষ তা ভুলে যাই। যখন পুরুষ চরিত্র নিয়ে লিখতে যাই, তখন বেমালুম ভুলে যাই, আমি নারী। আমি লেখক টেবিলে একা। আমি যেহেতু নারী, চেতনে-অবচেতনে এবং অভিজ্ঞতায় নারীর বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠতেই পারে।
এখন অনেকেই তাড়াহুড়া করে বই বের করে ফেলেন। আমি দেখেছি, অনেক বাক্যই হয়নি, অথচ বই বের করে ফেলেছেন। বইমেলায় ৭৫ শতাংশ বইয়ের মান খারাপ। তরুণ লেখকদের উদ্দেশ্যে বলি, ভালো করে পঠন-পাঠন করো, মানুষকে পর্যবেক্ষণ করো, তার পর বই বের করো। লেখা ভালোমানের না হলে কালের অতলে বই হারিয়ে যাবে। যাদের কলম জাদরেল, তারাই টিকে থাকবে।
বইমেলায় বসার জায়গা কখনোই ছিল না। প্রকাশকদের উচিত লেখকদের জন্য স্টলের বাইরে বসার ব্যবস্থা করা, কিন্তু তারা তা করেন না। স্টলের সামনে প্রত্যেক প্রকাশক বসার ব্যবস্থা করতে পারেন। এতে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের আড্ডা জমবে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
অনুলিখন: সানজিদ সকাল