সমসাময়িক রাজনীতি, সমকালীন অর্থনীতি ও রহস্য-রোমাঞ্চের বইয়ের দিকে তরুণ পাঠক অধিকতর ঝুঁকে গেছেন বলে অভিমত অমর একুশে বইমেলার প্রকাশকদের। তবে তরুণদের একটা বড় অংশ এখনো সেই চিরায়ত গল্প, কবিতা ও উপন্যাসের প্রেমে বুঁদ হয়ে রয়েছেন।
বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বইমেলার ছাব্বিশতম দিনের পড়তি বেলায় দেখা গেল তারা দল বেঁধে পছন্দের লেখকের নতুন-পুরোনো সেই সব বইয়ের খোঁজ করছেন। প্রিয় লেখকের যে বইটি নেই নিজের বুক শেলফে, সেই বইটি খুঁজে নিয়েছেন তারা। তবে পছন্দের লেখক, কবি আর ঔপন্যাসিকের দেখা না পাওয়ায় মন খারাপ করে ঘরে ফিরতে হয়েছে তাদের।
মেলায় সৃজনশীল বইয়ের মধ্যে পছন্দ ও বিক্রির শীর্ষে রয়েছে উপন্যাস। দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অধ্যায় নিয়ে রচিত উপন্যাসের যেমন চাহিদা রয়েছে, তেমনি পৌরাণিক উপন্যাসের চাহিদাও তুঙ্গে ছিল। বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত নতুন বইয়ের তথ্য বলছে, গতকাল পর্যন্ত ৩৭২টি নতুন উপন্যাস এসেছে মেলায়।
এ বছর শাপলা প্রকাশনী থেকে এসেছে কবি নির্মলেন্দু গুণের প্রথম উপন্যাস ‘আই লাভ ইউ’। অন্যপ্রকাশ থেকে এসেছে স্বকৃত নোমানের 'আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডুলিপি’ ও সাদাত হোসাইনের ‘শঙ্খচূড়’ (দ্বিতীয় খণ্ড)। কথাপ্রকাশ এনেছে হরিশংকর জলদাসের ‘শূর্পণখা’ ও ইমতিয়ার শামীমের ‘শঙ্খগহন সলপকাল’। অক্ষর প্রকাশনী এনেছে রশীদ হায়দারের ‘নষ্ট জোছনায় এ কোন অরণ্য’, সেলিনা হোসেনের ‘মার্গের নীল পাখি’, মঈনুল আহসান সাবেরের ‘জ্যোতির্ময়ী তোমাকে বলি’। পাঞ্জেরী প্রকাশ করেছে কিঙ্কর আহসানের ‘বিবিয়ানা’। ঐতিহ্য এনেছে শফিক রেহমানের ‘ভালোবাসা’। সময় প্রকাশন এনেছে মোস্তফা কামালের ‘বিষাদ বসুধা’। আদর্শ এনেছে মাহবুব মোর্শেদের ‘স্যাপিওসেক্সুয়াল’।
কবিতার বই বিকোয় না, এ কথা ঠিক না। কথাগুলো বলছিলেন একজন প্রকাশক। অমর একুশে বইমেলায় বরাবরই কবিতার বই সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাংলা একাডেমির তথ্য বলছে, গতকাল বুধবার পর্যন্ত ৮০৪টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। বইমেলার প্রকাশকদের একটা বড় আক্ষেপ, হাজারের বেশি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলেও বিক্রি হয় না তেমন।
তবে আনন্দম-এর প্রকাশক শ্রাবণী মজুমদার বলেন, ‘কবিতার বই বিকোয় না, এ কথা ঠিক না। এখনো অনেক তরুণ কবিতা পড়েন। ভালোবেসে প্রিয়জনকে প্রিয় কবির বই উপহার দেন। কবিতার বইয়ের আবেদন এখনো নির্দিষ্ট একটি পাঠক শ্রেণির কাছে রয়ে গেছে।’
রয়েল প্রকাশনীর প্রকাশক মো. মনিরুল ইসলাম জানান, এ বছর তাদের প্রকাশনী থেকে আসা কবিতার বইয়ে প্রাধান্য পেয়েছে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়টি। এবার ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত হয়েছে মুহাম্মদ আবু বকরের ‘হোগলা বনের স্বর’, অনন্যা থেকে এসেছে কবি শিহাব শাহরিয়ারের ‘ব্রহ্মপুত্র দাঁড়াও’, আবদুল হাই শিকদারের ‘আমরা মানুষ আমরা এসেছি’, জাকির আবু জাফরের ‘মন এখন বিপ্লবের নদী’, কাকলী থেকে প্রকাশিত হয়েছে হাসান হাফিজের কাব্যগ্রন্থ ‘ভালোবাসা তার ভাষা’ ও মমতা মজুমদারের ‘তুমি শুধু আমার হয়ে থেকো’। আগামী প্রকাশনী এনেছে ফরহাদ মজহারের ‘আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ বিপ্লবের সামনে’। কথাপ্রকাশ প্রকাশ করেছে মতিন রায়হানের ‘দায় ও দহনের বর্ণমালা’। জাগৃতি প্রকাশনী থেকে এসেছে মাজহার সরকারের ‘ঝিকটি ফুলের ক্ষমতা’ এবং ঝর্না রহমানের ‘দেহের মাদল’।
কবিতা ছাড়া এবার জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি নিয়ে শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। আদর্শ থেকে প্রকাশিত হয়েছে সাংবাদিক ও প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব আহম্মদ ফয়েজের ‘সংবাদপত্রে জুলাই অভ্যুত্থান’ ও ফাহমিদুল হকের ‘জুলাই জাগরণের দিনলিপি’। টি অ্যান্ড টি পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত সম্পাদিত গ্রন্থ ‘জুলাই বিপ্লবের রক্তাক্ত দলিল’। পাঁচ খণ্ডের এই বইটির সম্পাদক এস এম বিপাশ আনোয়ার। প্রকাশক জানান, জুলাই বিপ্লবের ৩৬ দিনের বিভিন্ন পত্রিকার প্রায় সব খবরাখবর, সংবাদ বিশ্লেষণ, ছবি, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়সহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য ছাপা হয়েছে এই সিরিজে। ৩৬ জুলাই থিঙ্কট্যাঙ্ক গ্রুপ প্রকাশ করেছে সাংবাদিক মুহাম্মদ নূরে আলমের গবেষণামূলক বই ’৩৬ শে জুলাই গণঅভ্যুত্থান’। বইমেলায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ৯৬২ নম্বর স্টলে বইটি পাওয়া যাচ্ছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ওপরে সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে প্রকাশনা সংস্থা ‘ঐতিহ্য’ থেকে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ওপরে বিভিন্ন ধারার ১০টি বই প্রকাশ করেছে তারা। বইগুলোর মধ্যে রয়েছে আরমান আহমেদ সিদ্দিকীর ‘৩৬ জুলাই ২০২৪’, মঈন শেখের ‘জুলাইয়ের অশেষ পাখিরা’, ফরিদ উদ্দিন রনির ‘আত্মনিবেদন: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে জীবন দিলেন যারা’, দেবদাস চক্রবর্তীর ‘রক্তাক্ত জুলাই’। প্রথমা থেকে এসেছে আসিফ নজরুলের ‘শেখ হাসিনার পতনকাল’, আলতাফ পারভেজের ‘লাল জুলাই: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পথ পরিক্রমা’, অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানউজ্জামানের ‘ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান: নতুন পথে বাংলাদেশ’। সংস্কৃতি প্রকাশন থেকে এসেছে লেখক, গবেষক, ইতিহাসবিদ বদরুদ্দীন উমরের ‘বাঙলাদেশে জুলাই-এর গণ-অভ্যুত্থান’।
গতকাল বইমেলায় আরও নতুন কিছু বই এসেছে। আগামী এনেছে পলাশ মাহমুদ অনূদিত ‘নির্বাচিত নোবেল বক্তৃতা’। জ্ঞানকোষ থেকে প্রকাশিত হয়েছে অলাত এহসানের গল্পগ্রন্থ ‘বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি’। বেঙ্গল বুকস প্রকাশ করেছে একই লেখকের সাক্ষাৎকারের সংকলন ‘দশ কথা: বিশিষ্টজনের মুখোমুখি’।
গতকাল বিকেলে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জুলাই প্রজন্ম ও প্রযুক্তি: নতুন সামাজিক বন্দোবস্তের খোঁজে’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সামিনা লুৎফা নিত্রা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন কল্লোল মোস্তফা এবং এহসান মাহমুদ। সভাপতিত্ব করেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
লেখক বলছি মঞ্চে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন শিশুসাহিত্যিক ফরিদ সাঈদ এবং কবি এ বি এম সোহেল রশীদ।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি শ্যামল জাকারিয়া, মানব সুরত, এ বি এম সোহেল রশীদ, ইউসুফ রেজা, রোকন জহুর, জামিল জাহাঙ্গীর, ক্যামেলিয়া আহমেদসহ আরও অনেকে।
গতকাল বইমেলায় আরও নতুন কিছু বই এসেছে। আগামী এনেছে পলাশ মাহমুদ অনূদিত ‘নির্বাচিত নোবেল বক্তৃতা’। জ্ঞানকোষ থেকে প্রকাশিত হয়েছে অলাত এহসানের গল্পগ্রন্থ ‘বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠা কফি হাউসটি’। বেঙ্গল বুকস প্রকাশ করেছে একই লেখকের গৃহীত সাক্ষাৎকারের সংকলন ‘দশ কথা: বিশিষ্টজনের মুখোমুখি’।