যে সময় কোনো নারী চিকিৎসকই ছিল না, সে সময় নারীরা যেন ডাক্তারি পেশায় আসতে পারেন এবং দরিদ্র নারী ও শিশুরা যেন যথাযোগ্য চিকিৎসা পান, তার জন্য অসীম সাহসিকতা নিয়ে কাজ করে গেছেন তিনি। বলছি, এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েলের কথা।
১৮২১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ব্রিস্টলের কাছে ইংল্যান্ডের কাউন্টারস্লিপ নামক এক ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন এলিজাবেথ। ৯ ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তার বাবা স্যামুয়েল ব্ল্যাকওয়েল বিভিন্ন সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ছেলেমেয়ে উভয়ের সমান শিক্ষা ও অধিকারে বিশ্বাস করতেন। প্রতিবন্ধকতা দূর করে কুসংস্কারকে সংস্কার করার শিক্ষা বোধহয় বাবার কাছেই পেয়েছিলেন এলিজাবেথ। তারা সব ভাইবোন গণিত, অধিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, সংগীত, চিত্রকলা ইত্যাদি নানান বিষয়ে দক্ষ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
১৯৩২ সালে ইংল্যান্ড থেকে তার পরিবারের সঙ্গে নিউইয়র্কে চলে আসেন তিনি। ১৮৪৫ সালে সংগীতের শিক্ষক হিসেবে একটি স্কুলে যোগদান করেন। তার এক বন্ধু ক্যানসারে মারা যাওয়ার সময় তাকে বলেছিলেন, ‘তোমার উচিত চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পড়ালেখা করা এবং নারী রোগীদের সেবায় নিয়োজিত হওয়া। আমি যদি একজন নারী ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করাতাম, তাহলে এই যন্ত্রণা থেকে হয়তো মুক্তি পেতাম।’ বন্ধুর এই কথা শোনার পর চিকিৎসাবিজ্ঞানকে ভালো না বাসা সত্ত্বেও চিকিৎসক হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন এলিজাবেথ।
১৮৪৭ সালে যখন তিনি নিউইয়র্কের জেনেভা কলেজের মেডিকেল ফ্যাকাল্টির কাছে ভর্তির জন্য আবেদন করেন, তখন তারা বিস্মিত হন। কারণ, তখনো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মেডিকেল খাতে শুধু পুরুষরা আধিপত্য বিস্তার করছিলেন। ফ্যাকাল্টি শিক্ষার্থীদের কাছে এ বিষয়ে মতামত জানতে চান, তারা কোনো নারীকে তাদের সহপাঠী হিসেবে মেনে নিতে পারবেন কি না। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই তাতে সম্মত হন। তারা মূলত মজা দেখতে চেয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, শেষপর্যন্ত নারী শিক্ষার্থী ভর্তি হবেন না কিংবা ভর্তি হলেও তিনি তার পড়াশোনা সম্পন্ন করতে সক্ষম হবেন না। কিন্তু সব অবিশ্বাসকে তুড়ি মেরে তিনি ভর্তি হন মেডিকেল কলেজে। সর্বোচ্চ নম্বর নিয়ে স্নাতক পাস করেন। চ্যালেঞ্জের সঙ্গে তিনি তার পড়াশোনা সম্পন্ন করলেও যুক্তরাষ্ট্র তখনো নারী ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ছিল। বাধ্য হয়েই তিনি প্যারিস এবং লন্ডনে তার প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখেন। লন্ডনে তিনি মেডিকেলের নেতৃস্থানীয় পুরুষদের সঙ্গে থেকে কাজ করার সুযোগ পান এবং অপারেশন পর্যবেক্ষণ করার অনুমতি পান। পরবর্তী সময়ে তিনি প্যারিসের ‘লা মেটারনিটি’ হাসপাতালে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পান, যা বিশ্বের বৃহত্তম প্রসূতি হাসপাতালগুলোর মধ্যে একটি এবং ধাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
চক্ষু রোগে আক্রান্ত একটি শিশুর চিকিৎসা করার সময়, ব্ল্যাকওয়েল নিজেই এই রোগে আক্রান্ত হন। তার বাম চোখ শেষ পর্যন্ত অপসারণ করতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, ব্ল্যাকওয়েল তার চিকিৎসা প্রশিক্ষণ চালিয়ে গেছেন। ব্ল্যাকওয়েল তার ক্যারিয়ারের জন্য ইংল্যান্ডে থাকাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছিলেন। সে অনুযায়ী ১৮৫১ সালের গ্রীষ্মে ব্ল্যাকওয়েল দেশে ফিরে আসেন এবং ধীরে ধীরে তিনি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৮৫৩ সালে তিনি দরিদ্র নারী ও শিশুদের জন্য ডিসপেনসারি খুলেছিলেন। একজন অসুস্থ নারী সেখানে মারা গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা ডিসপেনসারির ভবনে হামলা চালায় এবং চিৎকার করে যে, নারী ডাক্তার তার রোগীদের হত্যা করছে। তবু সব বাধা পেরিয়ে তিনি কাজ চালিয়ে যান। ১৮৫৭ সালে ডিসপেনসারিটিকে ‘নিউইয়র্ক ইনফার্মারি ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন’ হিসেবে পুনঃনামকরণ করা হয়। পরবর্তী ৯০ বছরে, সেখান থেকে এক মিলিয়নেরও বেশি রোগী সেবা নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে, ব্ল্যাকওয়েল নার্স নিয়োগে ইউনিয়ন সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেন। ১৮৬৮ সালে নিউইয়র্কে নারীদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মেডিকেল কলেজ। ১৮৬৯ সালে বিশেষ কারণে তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান এবং সংক্রামক রোগ আইন বাতিলের জন্য এবং স্যানিটারি জ্ঞানের প্রচারের জন্য কাজ করেন।
তিনি কিছু বইও লিখেছিলেন। যেমন- সন্তানদের নৈতিক শিক্ষার বিষয়ে ‘পিতা-মাতার পরামর্শ’; সামাজিক আচরণের ভুল এবং সঠিক পদ্ধতি; দ্য হিউম্যান এলিমেন্ট ইন সেক্স; চিকিৎসা সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি। অসুস্থতার কারণে ব্ল্যাকওয়েল ১৮৯৫ সালের পর রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া বন্ধ করে দেন। ১৯১০ সালের ৩১ মে হেস্টিংসে মারা যান এই মহীয়সী নারী। স্কটল্যান্ডে তাকে সমাহিত করা হয়।
জাহ্নবী
.jpg)