স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন ছেড়ে যখন কেউ দুই চাকার বাইকে অজানা পথের পেছনে ছুটতে বের হয়, তখন কী ঘটে? ঠিক এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই নোরালি স্কুনমেকার নিজের সবকিছু ছেড়ে অজানা গন্তব্যে বেরিয়ে পড়লেন। ২০১৮ সালে তিনি তার চাকরি ছেড়ে দেন, নিজের সবকিছু বিক্রি করে দেন এবং শুধু একটি মোটরবাইক আর সাহসী মন নিয়ে পৃথিবীর পথে রওনা হন।
তারপর থেকে তিনি একাই ৫০টিরও বেশি দেশ বাইকে ঘুরে বেড়িয়েছেন, পাড়ি দিয়েছেন ১ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ, আর গড়ে তুলেছেন বিশাল অনলাইন অনুসারী। ইউটিউবে তার চ্যানেল ইচি বুটসের (Itchy Boots) সাবস্ক্রাইবার এখন ২ দশমিক ৮ মিলিয়নেরও বেশি, যা তাকে একটি বৈশ্বিক ভ্রমণ সেনসেশনে পরিণত করেছে। কিন্তু হেলমেটের আড়ালে থাকা সেই নারী আসলে কে?
নোরালি স্কুনমেকার হলেন নেদারল্যান্ডসের ছোট্ট শহর নুভকর্কে জন্ম নেওয়া এক সাধারণ মেয়ে। জন্ম ৩০ জুন, ১৯৮৭। ছোটবেলা থেকেই তার ভেতরে ছিল অস্থির প্রশ্ন- এই পৃথিবীর বাইরে কী আছে? দূরের মানুষের জীবন কেমন? প্রকৃতির গভীরে কী রহস্য লুকিয়ে আছে? এ কৌতূহল তাকে নিয়ে যায় পড়াশোনায়। তিনি ইউটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূবিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করেন। এরপর অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম প্রান্তরে পাথর ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণার কাজ শুরু করেন। তখনই প্রথম তিনি দূর-দূরান্তের নিঃসঙ্গ পথ, প্রকৃতির শক্তি আর নিজের ভেতরের স্বাধীন ইচ্ছাকে ভালোভাবে চিনতে শেখেন।
পরবর্তী কয়েক বছর তিনি কাজ করেন এক আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক প্রতিষ্ঠানে। কাজের সূত্রে কখনো বাহামা, কখনো ব্রাজিল, কখনো কাজাখস্তান বিশ্বের নানা দেশে পাড়ি দিতে হয় তাকে। তার চাকরি ছিল সুরক্ষিত, আয় ভালো, ভবিষ্যৎও স্থির। কিন্তু কোথাও যেন এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকা তার স্বভাবের সঙ্গে মানানসই ছিল না। কাজের ব্যস্ততা, নিয়মের বাঁধন এবং একঘেয়ে জীবনে তিনি অনুভব করতে শুরু করেন যে, তার মন চাইছে মুক্ত পথ, মুক্ত বাতাস, আর এক নতুন অর্থে জীবনকে খুঁজে পাওয়া।
এ সময়েই তার ব্যক্তিগত জীবনে এক বড় ভাঙন আসে। দীর্ঘদিনের সঙ্গীর বিশ্বাসঘাতকতার খবর তার জীবনকে পুরো বদলে দেয়। মানসিক আঘাত তাকে ভেঙে দেয় ঠিকই, কিন্তু ভাঙনই তাকে নতুন পথে ঠেলে দেয়। তখন বয়স ৩১। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের মতো করে তিনি নতুন করে জীবন শুরু করবেন। তাই ২০১৮ সালে চাকরি ছাড়লেন, বাড়ি বিক্রি করলেন, সব দায়িত্ব ঝেরে ফেললেন। এরপর ভারত গন্তব্যে একমুখী টিকিট কাটলেন।
ভারতে গিয়ে তিনি ভাড়া নিলেন এক ছোট মোটরসাইকেল। পাহাড়ি পথে প্রথমবার চালাতে গিয়ে অনুভব করলেন এই পথই যেন তাকে ডাকছে। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল কিছুদিন ঘুরে বেড়িয়ে মনকে স্বস্তি দেওয়া, কিন্তু পথই তাকে বদলে দিল। পাহাড়ের বাতাস, অনিশ্চিত পথ, অচেনা মানুষ, নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হতে লাগল এক নতুন নোরালি। তিনি তার পথচলার গল্প ক্যামেরায় তুলে ধরে মানুষকে দেখাতে শুরু করলেন। এভাবেই জন্ম নেয় তার ভিডিও সিরিজ ‘ইচি বুটস’ যেখানে তিনি তুলে ধরেন বাস্তব পথ, বাস্তব অভিজ্ঞতা আর এক নারীর সাহসিকতার গল্প।

তার যাত্রা শুধু ভ্রমণ নয় বরং মানুষকে বোঝা, সংস্কৃতি জানা, পথের আনন্দ ও ভয়কে গ্রহণ করা, আর নিজেকে খুঁজে পাওয়াই মূল লক্ষ্য। একা ভ্রমণের পথে বহু কঠিন মুহূর্ত এসেছে। কখনো খারাপ রাস্তা, বরফঢাকা এলাকা, নদী পেরোনোর চ্যালেঞ্জ; আবার কখনো স্থানীয় মানুষের সন্দেহ বা অস্বস্তিকর প্রশ্ন। এমনকি পাকিস্তানের পাহাড়ি অঞ্চলের পুলিশ তাকে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অযথা প্রশ্ন করেছিল। কিন্তু নোরালি সব সময়ই হাসিমুখে, ধৈর্য আর দৃঢ়তায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন।
পথে চলতে চলতে তিনি দেখেছেন মানুষের অপার দয়া, অপরিচিতের অপ্রত্যাশিত সহায়তা, পাহাড়ি গ্রামের অতিথিপরায়ণতা, আবার কখনো সংগ্রাম। এসব অভিজ্ঞতা তাকে বদলে দিয়েছে, তাকে দৃঢ় করেছে। আজ পর্যন্ত তিনি একা ঘুরেছেন ৫০টিরও বেশি দেশ। পাড়ি দিয়েছেন ১ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটারের মতো রাস্তা। কখনো মরুভূমি, কখনো জঙ্গল, কখনো তুষারঝড়ের মধ্যদিয়ে এগিয়েছেন। তার মোটরসাইকেল একাধিকবার নষ্ট হয়েছে, এমনকি চুরি হয়েছে, তবু তিনি থেমে যাননি।
নোরালির গল্প বলে, কোনো সিদ্ধান্তই সহজ নয়। নিজের স্বস্তির জায়গা, প্রতিষ্ঠিত জীবন, সমাজের প্রত্যাশা সবকিছু ছাড়তে সাহস লাগে। ভাঙা সম্পর্কের পর আবার উঠে দাঁড়াতে শক্তি লাগে। আর একা পথে বের হতে লাগে আত্মবিশ্বাস। তিনি দেখিয়েছেন, একা নারীও নিরাপদে, সতর্কতায় এবং আত্মবিশ্বাসে পৃথিবী ঘুরে দেখতে পারে। বাধা এলে সেটাকে জয় করাই হলো সত্যিকারের জীবন।
তার যাত্রাপথ আজ বহু মানুষের অনুপ্রেরণা। তিনি ভ্রমণকে শুধু আনন্দ নয় বরং মনের সুস্থতা, নিজের সঙ্গে কথা বলার সময়, ভয়ের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। ভাঙা হৃদয় থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে নতুনভাবে গড়েছেন পথের ওপর দাঁড়িয়ে, বাইকের হ্যান্ডেলে হাত রেখে, স্বাধীনতার বাতাসে শ্বাস নিয়ে।
তার এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লিখেছেন একটি আত্মকথা যেখানে তিনি ভ্রমণের আনন্দের পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, হারিয়ে যাওয়ার ভয়, আবার শক্ত হয়ে ওঠার গল্প শোনান। বইটি হয়ে উঠেছে অনেক নারীর সাহসের উৎস।
/এসএল
.jpg)