রান্নার প্রতি ভালোবাসা, সৎ সাহস আর নিজস্ব পরিচয়ের খোঁজ—এই তিন শক্তিকে সঙ্গী করে উদ্যোক্তা সেলিমা সুলতানা নীলু গড়ে তুলেছেন তার ব্র্যান্ড ‘সম্রাজ্ঞীস কিচেন’। স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি সচেতনতা আর মানুষের আস্থা তাকে চাকরি থেকে হোমমেড ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে দৃঢ় অবস্থান এনে দিয়েছে–এমনটাই বলছিলেন উদ্যোক্তা সেলিমা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এস লুপিন
নিজের শখ, সাহস আর সক্ষমতার ওপর আস্থা থাকলে জীবন নতুন পথে হাঁটতে শিখিয়ে দেয়—এমনটাই প্রমাণ করেছেন উদ্যোক্তা সেলিমা সুলতানা নীলু। মাস্টার্স শেষ করে বহু বছর চাকরি করেছেন তিনি। কিন্তু মনের ভেতরে সব সময়ই ছিল নিজের মতো করে কিছু করার তাগিদ। রান্নার প্রতি ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই; ঘরে অতিথি এলেই তিনি রান্না করতেন, আর সবাই তার হাতের স্বাদে মুগ্ধ হয়ে প্রশংসায় ভাসাত। সেই প্রশংসাই একসময় তাকে নতুন এক পথে হাঁটার শক্তি দেয়।
আত্মনির্ভরতার খোঁজে নতুন পথচলা
বিয়ের পর সেলিমার আয়ের প্রধান উৎসই ছিল তার পরিবার। কিন্তু লম্বা একটা সময় পর তিনি উপলব্ধি করলেন—প্রত্যেক নারীরই নিজস্ব পরিচয় থাকা দরকার। আর ‘নিজস্ব পরিচয়’ মানে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সমাজে নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারার সক্ষমতা। সেই থেকেই তার আত্মনির্ভরতার খোঁজে নতুন এক পথচলার শুরু।

সম্রাজ্ঞীস কিচেন নামের পেছনে দর্শন
নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম ‘সম্রাজ্ঞীস কিচেন’। কারণ, তার নাম ‘সুলতানা’ অর্থ যার ‘সম্রাজ্ঞী’ বা রানি। বাবা-মা এ নামটি দিয়েছিলেন। সেলিমা মনে করেন, বাবা-মায়ের দেওয়া নামটি বড় করে তোলাই তার লক্ষ্য—যেন সম্রাজ্ঞীর মতোই রান্নার ব্র্যান্ডটি অনেক দূর এগিয়ে যায়।
হোমমেড ফুডের যাত্রা
বাজারের ভেজাল খাবার, প্রিজারভেটিভ এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ খাদ্যের অভাব–এই বাস্তবতা তাকে হোমমেড ফুড তৈরির দিকে টেনে আনে। তিনি চেয়েছিলেন সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ, নিরাপদ, ঘরোয়া পণ্য মানুষের হাতে পৌঁছে দিতে। ফলে মাত্র ৪ হাজার টাকা নিয়ে খুব ভয়ভীতির মধ্যেই শুরু করেছিলেন তার উদ্যোগ। নিজে বাজার করা, নিজেই রান্না করা, নিজেই ডেলিভারি–সবই তিনি করেছেন এক হাতেই। পরে স্থানীয় মেলায় বসে বিক্রি শুরু করেন। ধীরে ধীরে প্যাকেজিং, লোগো, প্রাইসিং–সব ঠিকঠাক করে ‘হোমমেড’ থেকে ‘হোম ব্র্যান্ডে’ পরিণত হয় সম্রাজ্ঞীস কিচেন।
সিগনেচার আইটেম ও গ্রাহকদের সাড়া
সেলিমার সবচেয়ে জনপ্রিয় পণ্য ছিল জেলি ও আচার। বিশেষ করে স্ট্রবেরির আচার, যা তিনিই প্রথম বাজারে আনেন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘একবার যারা নিতেন, পরে বারবার অর্ডার করতেন।’ তিনি আরও বলেন, মানুষ আমাকে ‘আচারের রানি’ বলে থাকেন।
এছাড়া তেঁতুলের চাটনি, বিভিন্ন আচার, ফ্রোজেন শিঙাড়া, সমুচা, মোগলাই–সবই তিনি নিজেই তৈরি করেন। গ্রাহকদের ভালোবাসাই তার ব্যবসাকে এগিয়ে দিয়েছে।
চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা
আমাদের সমাজে যখনই কেউ কিছু শুরু করতে যায় তখন লোকজনের মন্তব্যের শেষ থাকে না। বিশেষত, নারীরা যখন কোনো উদ্যোগ নেয়, তখন সমাজ প্রথমেই সমালোচনা করে–এটা সেলিমার ক্ষেত্রেও হয়েছে বলে জানান তিনি। কেউ বলেছে, ‘তুমি কিছু করতে পারবে না’, আবার কেউ বলেছে, ‘এই বয়সে শুরু করে কী লাভ?’ কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। তার ভাষায়, ‘সমালোচনা থেকেও শিখেছি। সৎ সাহসই ছিল আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।’
হোমমেড ফুড ইন্ডাস্ট্রির সম্ভাবনা
সেলিমার মতে, বাজারে ভেজাল খাবারের আধিক্যের কারণে মানুষ এখন বেশি স্বাস্থ্যসচেতন। ফলে বিশুদ্ধ, ঘরোয়া, অথেন্টিক খাবারের চাহিদা বাড়ছে। আর সেখানেই সবচেয়ে বড় সুযোগ। যারা মান বজায় রাখতে পারবে, তাদের জন্য এই শিল্প লাভজনক ও ভবিষ্যৎমুখী।
তরুণ নারীদের জন্য তার পরামর্শ
সেলিমা মনে করেন, ‘বেকার বসে থাকার কোনো মানে নেই। নিজের ওপর আস্থা থাকলে এগিয়ে আসুন। মানসম্মত কাজ করলে মানুষ গ্রহণ করবেই। প্রতিটি নারীরই আত্মনির্ভর হওয়া জরুরি।’
সবশেষে, সম্রাজ্ঞীস কিচেনকে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে সেলিমা বলেন, ‘আমি এটিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাই। আমি ম্যাস প্রোডাকশন করতে চাই। একদিন একটি বিশাল শোরুমে নিজের তৈরি সব পণ্য থাকবে আর আমি মাঝে বসে থাকব। এটাই আমার স্বপ্ন।’
/এস লুপিন
.jpg)