ভারত সীমান্তঘেঁষা শেরপুরের গারো পাহাড়ে কমছে হাতি ও মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব। পাহাড়ে হাতির জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যবান্ধব গাছ লাগানোর ফলে এমনটা ঘটেছে। অথচ শেরপুর সীমান্তে হাতি-মানুষের সংঘাত পুরোনো। এই সংঘাতে কখনো মানুষ, কখনো হাতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
কিন্তু গত কয়েক বছরের ব্যবধানে গারো পাহাড়ে নতুন নতুন বাগান করা হয়েছে। এতে করে বনে হাতির খাদ্যের উৎস তৈরি হয়। এর ফলে পাহাড়ে হাতির শাবক জন্ম হচ্ছে। পাশাপাশি লোকালয়ে হানা কমেছে।
কৃষকরা বলছেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর হাতির তাণ্ডব একেবারে কম। এর ফলে আতঙ্ক ছাড়াই জমির ধান ঘরে তুলেছেন তারা। শ্রীবরদীর বালিজুড়ি এলাকার কৃষক ফকির মিয়া বলেন, ‘এবার খুব আরামে ধান ঘরে নিতে পারছি। হাতি আহে নাই। কোনো অত্যাচারও করে নাই। ধান কাটা শেষ হলেও হাতি নামে নাই। জঙ্গলের মধ্যেই হাতি থাকে। খেতের মধ্যে আসে নাই এবার।’
একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, ‘আমাদের এদিকে এবার হাতির অত্যাচার নাই বললেই চলে। কোনো ক্ষতিও হয় নাই। কয়দিন আগে নামছিল। কিন্তু আমরা আগেই ধান কাইট্টা ঘরে নিছি গা। এবার কৃষকরা খুব আরাম পাইছে। কোনো ক্ষতি হয় নাই।’
ঝিনাইগাতীর রাংটিয়া এলাকার বাসিন্দা মতি মিয়া বলেন, ‘এই দিকে এবার হাতি নামে নাই। যা নামছিল তাও নালিতাবাড়ী সীমান্তের দিকে। হালকা ক্ষতি করছে। তবে অন্য বছরের চেয়ে মেলা (অনেক) কম। এভাবে যদি পাহাড়ের মধ্যে হাতি থাকে, তাহলে আমাদের আর কোনো সমস্যা নাই।’
নালিতাবাড়ীর পানিহাটা এলাকার বাসিন্দা কবির মিয়া বলেন, ‘ধান লাগানোর কিছুদিন পর হাতি কয়েকবার নামছিল। তখন কয়েকটি খেতে হামলাও করছিল। ধানও নষ্ট করেছে। আবার কিছু খেয়েও গেছে। এরপর কিছুদিন পরেই হাতি গেছে গা। আর নামে নাই। ক্ষতি হয়েছে কম। ক্ষতি হয় নাই, এটা বলা যাবে না। তবে শ্রীবরদী, ঝিানাইগাতীতে হাতি কোনো ক্ষতি করে নাই।
পরিবেশবাদী মুগনিউর রহমান মনি বলেন, ‘গারো পাহাড়ে হাতির খাদ্য থাকায় এ বছর লোকালয়ে তুলনামূলক নেমে আসেনি বন্য হাতির পাল। তবে হাতি সুরক্ষায় বন বিভাগকে আরও কঠোর হতে হবে। হাতির পাশাপাশি মানুষেরও যেন কোনো ক্ষতি না হয়। এ ছাড়া বনের ভেতরে হাতির জন্য বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে, যেগুলো হাতির প্রিয় খাবার। এ ছাড়া বনের ক্ষতি হয় এসব গাছ না লাগানোর জন্য বন বিভাগের কাছে অনুরোধ করছি।’
ময়মনসিংহ বন বিভাগের বালিজুরি রেঞ্জের রেঞ্জ অফিসার মো. সুমন মিয়া বলেন, ‘পাহাড়ে নতুন নতুন বাগান সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে হাতির জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা হয়েছে। ফলে কৃষকদের এবার তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। আমাদের কথা, হাতির জায়গায় হাতি থাকুক, মানুষের জায়গায় মানুষ থাকুক। হাতির-মানুষের দ্বন্দ্ব এটা শুধু যে আমাদের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব তা নয়, এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং সহযোগিতা করতে হবে। হাতি যেন মানুষের আক্রমণের শিকার না হয়। আবার হাতির আক্রমণর শিকার না হয় কোনো মানুষ।
সম্প্রতি আমাদের বন বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথ সভায় হাতি রক্ষায় এবং জানমালের ক্ষতি রক্ষায় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের কারণে হাতির ওপর আক্রমণ থেকে বিরত থাকছেন সাধারণ মানুষ। হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি, দ্রুতই হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসন হবে।’
শেরপুর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ অফিসার মঞ্জুরুল আলম বলেন, ‘পাহাড়ে হাতি বাড়ছে, এটা ঠিক। এখন প্রতিটা হাতির দলে দেখা যায় ৪-৫টি করে বাচ্চা। এটি সত্যিই আশার খবর। যেমন, বনের সৌন্দর্য হচ্ছে বন্যপ্রাণী। তাই বন্যপ্রাণী রক্ষায় ও বনের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। পাহাড়ে আমরা হাতির নিশ্চিত আবাসস্থল এবং খাদ্যের ব্যবস্থা করছি। এতে করে হাতি কিন্তু লোকালয়ে হানা দিচ্ছে না। এর ফলে কৃষকদেরও কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। হাতি রক্ষার্থে আমরা ইতোমধ্যে ৫০০ হেক্টর জমিতে হাতির প্রিয় খাদ্যবান্ধব গাছ লাগিয়েছি। এতে এসব গাছ হাতিরা খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। তাদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়।’