দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়ন। দেশ স্বাধীনের পর থেকেই ওই এলাকার বাসিন্দারা ছোট যমুনা নদীর ওপর একটি ব্রিজ চেয়ে আসছেন। সরকার আসে, সরকার যায়, ভোটের সময় জনপ্রতিনিধিরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়ায়। কিন্তু ব্রিজ আর হয় না।
শেষমেশ একজন জনপ্রতিনিধি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৭টি পিলার নির্মাণ করে দেন। তার ওপরে বসানো বাঁশ-কাঠের পাটাতন দিয়ে যাতায়াত করা হচ্ছিল। কিন্তু সংস্কারের অভাবে সেই পাটাতনে পচন ধরেছে। যেকোনো মুহূর্তে সেটি ভেঙে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্রিজের দুপাশে বাস করা ১৬ গ্রামের মানুষ।
এলাকাবাসী জানিয়েছেন, ব্রিজের ওপর দিয়ে নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে না পারায় তাদেরকে ৫ কিলোমিটার পথ বেশি পাড়ি দিতে হয়। কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া করতে অতিরিক্তি সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। সরকারের পক্ষ থেকে যদি ব্রিজের বাকি কাজটুকু করে দেওয়া হয় তাহলে তাদের ভোগান্তি দূর হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বানানো ব্রিজের কাজ শেষ করতে কোনো জনপ্রতিনিধি উদ্যোগ নেন না। কারণ এই ব্রিজ বানানোর কৃতিত্ব তিনি নিতে পারবেন না। এ কারণে গত ৮ বছর ধরে ব্রিজটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার ৬নং দৌলতপুর ইউনিয়নের মধ্যদিয়ে বয়ে গেছে ছোট যমুনা নদী। নদীর পূর্বপ্রান্তে পলিপাড়া, পশ্চিমে হরহরিয়ার পাড়া। এই দুই এলাকাকে যুক্ত করেছে একটি অসম্পূর্ণ সেতু। সেতুটির দুই পাড় বাঁধানো। নদীর মধ্যে সিমেন্টের ৭টি পিলার। ওপরে বাঁশ ও কাঠের তৈরি পাটাতন। বৃষ্টিতে ভিজে পাটাতনে পচন ধরেছে। কোথাও কোথাও পচা অংশ ভেঙে পড়েছে। এর ওপর দিয়েই কোনো রকমে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন স্থানীয়রা।
তারা বলছেন, ব্রিজের ওপর দিয়ে স্বাভাবিক চলাচল না থাকায় নদীর পূর্ব পাড়ের পলিপাড়া, চকপলিপাড়া, চকপাড়া, ডাড়ারপাড়ের মানুষরা ইউনিয়ন পরিষদসহ কেনাকাটার মতো প্রয়োজনে ৫ কিলোমিটার পথ বেশি ঘুরে যান। একইভাবে নদীর পশ্চিম পাড়ের হরহরিয়াপাড়া, গোয়ালপাড়া, মধ্যপাড়া ও কুশলপুর গ্রামের বাসিন্দাদের পূর্ব পাড়ের পার্শ্ববর্তী বিরামপুর, নবাবগঞ্জ যেতে হলে ৭ কিলোমিটার পথ ঘুরতে হচ্ছে।
৬নং দৌলতপুর ইউনিয়নের হরহরিয়ারপাড়া গ্রামের শমসের আলী বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিদের আশার বাণী শুনতে শুনতে অনেক দিন পার হয়। পরে আমরাই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু অর্থাভাবে কিছু কাজ শেষ করতে পারিনি। এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ গরিব। আর্থিকভাবে তারা সহযোগিতা করতে পারেন না।’
ইউনিয়নের খয়েরবাড়ী এলাকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ সেতু না থাকায় যাতায়াতের সমস্যার কারণে আমাদের গ্রামে কেউ আত্মীয়তা করতে চান না। কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য আনা-নেওয়া করতে অসুবিধা হয়।’
গোয়ালপাড়ার স্বদেশ দাস ও কনক রায় বলেন, ‘আমাদের গ্রাম থেকে ইউনিয়ন পরিষদের দূরত্ব দুই কিলোমিটার। বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সব ওই দিকে। কিন্তু ব্রিজ না থাকায় আমাদের ৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। সরকারি বরাদ্দে যদি ব্রিজের কাজটি শেষ করা হতো তাহলে এলাকাবাসীর অনেক উপকার হতো।’
৬নং দৌলতপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ মণ্ডল বলেন, ‘এলাকাবাসীর দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে ২০১৬ সালে আমি নিজ খরচে ব্রিজের কাজ শুরু করি। টানা ৬ মাস কাজ শেষে ৭টি সিমেন্টের পিলার বানানো হয়। এরপর পিলারের ওপরে বাঁশ-কাঠের পাটাতন বসানো হয়। ২০১৭ সালের মার্চের পর থেকে অর্থাভাবে বাকি কাজ বন্ধ হয়ে যায়। আর মাত্র ১০ লাখ টাকা হলেই ব্রিজের কাজ শেষ হয়ে যেত। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি।’
তিনি বলেন, ‘স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য অনেকবার উপজেলা পরিষদে কথা বলেও তেমন সাড়া পাইনি। কারণ এই সেতুর কাজ সম্পন্ন হলে স্থানীয় রাজনীতিবিদরা এর ক্রেডিট নিতে পারবেন না। তাই তারা কেউ বাকি কাজের ব্যাপারে আগ্রহ দেখান না।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ফুলবাড়ী উপজেলা প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখব। যদি সেতুটির কাজ কোনো প্রকল্পের অর্থ দিয়ে করা না হয়ে থাকে তবে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলে সেতুর বাকি কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করব।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর মো. আল কামাহ তমাল বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানতাম না। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে ওই সেতুটি পরিদর্শন করব। গ্রামবাসী যেহেতু সেতুটি নিয়ে অনেক কাজ করেছে বাকি কাজ আমরা অবশ্যই করব।’