নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন। এই স্টেশন পার্শ্ববর্তী লুপাইনে রেল ওয়াগনের মাধ্যমে আনা দেশি-বিদেশি পণ্য খালাস করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ প্রক্রিয়া চলতে থাকায় ওই লুপলাইনগুলো নষ্ট হয়ে যায়। পরে সেই রেলপথ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু এক বছর মেয়াদি কাজটি গত দুই বছরেও শেষ হয়নি। কর্তৃপক্ষ বলছে, কাজ এখনো ২০ শতাংশ বাকি রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আওয়ামী লীগের এমপি হওয়ায় ৫ আগস্টের পর থেকে পলাতক রয়েছেন। তাই বাকি কাজ কবে শেষ হবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এখান থেকে বছরে কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ ভারতের শিলিগুড়ি থেকে বাংলাদেশে পণ্য আনা-নেওয়া, ট্রেন দুর্ঘটনা রোধ এবং ট্রেন চলাচল সহজ করতে সংস্কার কাজটি দ্রুত শেষ হওয়া প্রয়োজন।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ভারতের শিলিগুড়ি থেকে আমদানি করা পাথর ওয়াগন থেকে এক্সকেভেটর দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাকে লোড করায় সৈয়দপুর স্টেশনের পূর্বপাশের লুপলাইনগুলো নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় প্রায়ই মালবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হতো। এ কারণে স্থানীয় রেলওয়ে দপ্তর ওই লাইনকে ট্রেন চলাচলের জন্য অনুপযোগী ঘোষণা করে। ভারতের শিলিগুড়ি ও বাংলাদেশের পণ্য আনা নেওয়ার সুবিধা বাড়াতে রেললাইনটি সংস্কারের জন্য ২০২২ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়।
দরপত্র অনুযায়ী স্টেশনের উত্তরে রেলওয়ের সংকেত ঘর ও দক্ষিণে দুই নম্বর লেভেলক্রসিং পর্যন্ত ১ হাজার ৪৪০ মিটার রেলপথ সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের জন্য ৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। ঢাকার মেসার্স ক্যাসেল কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিএল) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০২৩ সালে ৩১ জানুয়ারি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ হওয়ার কথা। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেনি। এরপর চার দফায় কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়। গত বছরের নভেম্বরে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে সংস্কার কাজ বন্ধ আছে। খোঁজ মিলছে না ঠিকাদারেরও।
সরেজমিনে রেলওয়ে স্টেশন ইয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, লুপলাইনের রেলপথে রেললাইন বসানো হলেও অনেক স্থানেই ক্লিপ লাগানো হয়নি। দেওয়া হয়নি নির্ধারিত পরিমাণ পাথর। আবার কোথাও কোথাও পাথরই দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক যশোর-৩ আসনের সাবেক এমপি কাজী নাবিল আহমেদ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি গা-ঢাকা দিয়েছেন। অর্থ সংকটের কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কাজ বন্ধ করে দিয়েছে।’
এ বিষয়ে সৈয়দপুর রেলস্টেশনের মাস্টার ওবাইদুল ইসলাম রতন বলেন, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ট্রেনে করে ভারতের শিলিগুড়ি থেকে পাথরসহ আমদানি করা পণ্য ও দেশীয় অনেক পণ্য লাইনগুলোতে রেখে লোড-আনলোড করা হয়।
ভৌগোলিক দিক বিবেচনায় এ স্টেশনের লুপলাইনগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া ট্রেনে করে দেশের অভ্যন্তরের বিভিন্ন পণ্য আনা-নেওয়ার কাজে এ লুপলাইনগুলো ব্যবহার করা হয়। এখান থেকে প্রতি মাসে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা আয় করে রেলওয়ে। সেই হিসাবে রেলওয়ে বছরে প্রায় কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে।’
সৈয়দপুর রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) আবদুল মতিন বলেন, ‘এক বছর মেয়াদে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা দৃশ্যমান হয়নি। এরপর চার দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। বর্ধিত ওই মেয়াদেও ঠিকাদার কাজ শেষ করতে পারেনি। এখনো ২০ শতাংশ কাজ বাকি আছে। পরিমাণমতো পাথর দেওয়া হয়নি এবং পাথরের (ব্লাস) বক্সিং কাজও বাকি আছে। হঠাৎ কাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। যোগাযোগের চেষ্টা করেও ঠিকাদারের খোঁজ মিলছে না।’