উত্তরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। এই হাসপাতালে শয্যা ও জনবলসংকট তীব্র। এতে সেবাবঞ্চিত থাকছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। ১৯৫৮ সালে এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন হাসপাতালটির তৃতীয়/চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ৪৩৪। অবসর ও মৃত্যুজনিত কারণে এখন তাদের কেউই নেই। তাদের জায়গায় নতুন কোনো নিয়োগও হয়নি। ফলে স্বল্প জনবলের সঙ্গে শয্যাসংকটের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার জন্য রামেক হাসপাতালে শয্যা রয়েছে ১২০০। এর বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে রোগী আসেন সাড়ে তিন থেকে চার হাজার। তাদের মধ্যে ভর্তি থাকেন ২ হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজারের মতো। অতিরিক্ত রোগীর চাপে চিকিৎসাসেবা পেতে তাদের প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
জনবল নিয়োগ না হওয়ায় চিকিৎসকরা কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। আর এই সংকট নিরসনের বিষয়টি গতানুগতিক আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, এই হাসপাতালে শুধু রাজশাহী বিভাগ নয়, রংপুর ও খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলা থেকেও রোগীরা চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চললেও জনবল ও অবকাঠামো বাড়েনি। ফলে প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে ভোগান্তি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শয্যার অভাবে বহু রোগী মেঝে, করিডোর ও বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিশেষ করে মেডিসিন বিভাগের পরিস্থিতি সবচেয়ে করুণ। হাসপাতালের ৪২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড পর্যন্ত মেডিসিন ইউনিটে রয়েছে মাত্র ৭১টি বেড (পুরুষদের জন্য ৩২টি, নারীদের জন্য ৩৯টি)। অথচ এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন প্রায় ৩৫০ জন রোগী। স্থান সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী রোগীদের একই ওয়ার্ডে রাখতে হচ্ছে।
সম্প্রতি রামেক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বেড পাইনি, মেঝেতে শুয়ে আছি। চিকিৎসক একবার এসে দেখে গেছেন, তারপর আর কেউ আসেননি। বড় ডাক্তাররা শুধু সকালে আসেন।’
অন্যদিকে, হাসপাতালের পরিবেশ ও সেবা নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে রোগী ও তাদের স্বজনদের। কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নাজমা খাতুন জানান, ‘হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ মেলে না, বাইরে থেকে কিনতে হয়। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়। আমরা সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যদি বাইরে থেকেই ওষুধ কিনতে হয় তাহলে লাভ কী?’ খাবারের মান নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। রোগী আবুল হাসেম বলেন, ‘পাতলা ডাল-ভাত দেওয়া হয়। এতে শরীর ঠিক হওয়ার চেয়ে খারাপ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।’
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে শৌচাগার ও স্নানঘরের পরিবেশ আরও খারাপ। বৃদ্ধা তসলিমা আক্তার ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘টয়লেটের দুর্গন্ধে দাঁড়ানো যায় না। এর মেঝে সব সময় পিচ্ছিল থাকে, পড়ে গেলে প্রাণ যাওয়ার ভয় থাকে।’
রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় কর্তব্যরত চিকিৎসকদের। হতাশার সুরে চিকিৎসকরা জানান, রোগীর তুলনায় চিকিৎসক অনেক কম, ফলে ব্যাহত হয় কাঙ্ক্ষিত সেবা।
ইন্টার্ন চিকিৎসক ফারহান খালিদ বলেন, ‘প্রতিদিন ৬০ জন রোগীর সেবা দেওয়ার প্রস্তুতি থাকে, অথচ ১৩০ থেকে ১৪০ জনকে দেখতে হচ্ছে। এতে মানসম্পন্ন চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
সিনিয়র নার্স সুমি আক্তার বলেন, ‘সারা রাত ডিউটি করি, কিন্তু এত রোগীর ভিড়ে সবার প্রতি সমান নজর দেওয়া যায় না। রোগীরা ক্ষুব্ধ হলেও আমাদের কিছু করার থাকে না।’
রামেক হাসপাতালে বর্তমানে ৫৬টি ওয়ার্ড, ৮টি অপারেশন থিয়েটার (ওটি), ৪৫টি আইসিইউ শয্যা, দুটি এমআরআই মেশিন (এর মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল), দুটি সিটিস্ক্যান মেশিন (একটি অচল) রয়েছে। এতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।
রামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফ এম শামিম আহমেদ বলেন, ‘আমাদের এখানে রোগীর প্রচুর চাপ। আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে সাধ্যমতো চেষ্টা করছি উন্নত সেবা দেওয়ার।’