শীতের শুরুতেই ভেজাল গুড়ের দাপটে রাজশাহী অঞ্চলে তৈরি হয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। বাঘার আড়ানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আখ বা খেঁজুরের রস ছাড়াই আটা, চিনি, কাপড়ের রং, হাইড্রোজ, চুন, ফিটকিরি ও গ্যাস পাউডার মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ‘গুড়’। এসব গণ-উৎপাদিত ভেজাল পণ্য ছড়িয়ে পড়ছে রাজশাহী, নাটোর, পাবনা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন মোকামে। কম দামে ‘অর্গানিক খেঁজুর গুড়’ নামে অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে ব্যাপকভাবে।
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, বাঘা, চারঘাট এবং নওগাঁ-নাটোরের কিছু এলাকায় ভেজাল গুড় উৎপাদন এখন প্রায় ‘কটেজ ইন্ডাস্ট্রি’। বাড়ির আঙিনা থেকে ঘরের ভেতর, যেখানে-সেখানে গড়ে উঠছে ভেজাল গুড় তৈরির গোপন কারখানা।
এর আগে গত বুধবার বাঘা উপজেলার আড়ানী পৌরসভার শাহাপুর দিয়ারপাড়া এলাকায় র্যাব ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যৌথ অভিযান চালায়। নান্টু মহাজন, সান্টু মিয়া, মোক্তার আলী, তৌফিক ও এনারুলের কারখানায় অভিযান চালিয়ে ভেজাল গুড় তৈরির দায়ে মোট দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় ভেজাল গুড় ৩১ হাজার ৭০৭ কেজি, ভেজাল লালি গুড় ১২ হাজার ৯৭০ কেজি, ভেজাল চিনির সিরা ২২ হাজার ৫১৭ লিটার, হাইড্রোজ আড়াই কেজি, ফিটকিরি সাড়ে ৪ কেজি, চুন ১২ কেজি ৭শ গ্রাম, ফুড কালার ৩ কেজি ৬৫০ গ্রাম কেজি জব্দ করে ধ্বংস করা হয়।
অভিযান চলাকালে দেখা যায়, কোনো কারখানাতেই আখ বা খেজুরের রস নেই। তবুও কড়াইয়ে টগবগ করে ফুটছে ‘গুড়’। পাশে রাখা ধাতব খাঁচায় ফেলে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকৃতির ছাঁচ, যাতে ঢেলে তৈরি করা হয় কেকের মতো গুড়। আড়ানী এলাকার অন্যতম গুড় উৎপাদক সান্টু মিয়ার স্ত্রী লাকি বেগম বলেন, ‘গুড় তৈরি করি শুধু চিনি দিয়ে। এর মধ্যে কাপড়ের রং, আটা, হাইড্রোজ, গ্যাস পাউডার, চুন সব মেশানো হয়। পরে এগুলো রাজশাহী, নাটোর, পাবনার বিভিন্ন মোকামে পাঠাই।’
এদিকে, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের রাজশাহী জেলা কার্যালয় সম্প্রতি বিভিন্ন উৎপাদক থেকে সংগ্রহ করা ১০টি নমুনা পরীক্ষা করে সব ক’টি ভেজাল পায়। জেলা খাদ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা ইয়ামিন হোসেন বলেন, ‘নমুনাগুলোতে হাইড্রোজ, ডিটারজেন্টসহ বেশকিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া গেছে। উৎপাদকদের খাঁটি গুড় উৎপাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা না করা পর্যন্ত বাজারে সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হবে না।’
অন্যদিকে চারঘাটের খাঁটি গুড় উৎপাদক পিন্টু আলী অভিযোগ করে বলেন, ‘ভেজালকারীদের কারণে প্রকৃত উৎপাদকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। কেননা খাঁটি গুড় বানাতে কেজিপ্রতি ৩৫০-৩৬০ টাকা খরচ পড়ে। বিক্রি করতে হয় ৩৮০-৪২০ টাকায়। কিন্তু ভেজাল গুড় বিক্রি হচ্ছে ১৭০-২২০ টাকায়।’
এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘রাসায়নিক মিশ্রিত গুড় দীর্ঘমেয়াদে কিডনি-লিভার বিকল, পাকস্থলীর জটিলতা ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এসব গুড় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা ইউনিটের সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিন বলেন, ‘ভেজালকারীদের শুধু জরিমানা করলে হবে না। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এ অপরাধ বন্ধ হবে না। আর এখনই এই চক্র ভাঙতে না পারলে শীতকালে ভেজাল গুড় দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।’
র্যাব-৫-এর ডেপুটি কমান্ডার মেজর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজারে ‘খেঁজুর’ কিংবা ‘আখের’ গুড় নামে যে পণ্য বিক্রি হচ্ছে, তাতে আসল রসের অস্তিত্বই নেই। পরিশোধিত চিনি, এলাম, চুন, টেক্সটাইল ডাইসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে গুড় তৈরি হচ্ছে। বাঘায় প্রায় প্রতি তিনটি বাড়ির একটি বাড়ি এখন ভেজাল গুড় তৈরির কারখানা। সেখানকার গুড় দেশের বড় অংশের বাজারে যাচ্ছে। ভয়াবহ বিষয় হলো, এগুলো রান্না করা হয় প্লাস্টিককে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে।’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রাজশাহী অফিসের উপপরিচালক মো. ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘ভেজাল গুড় উৎপাদন ও বিপণন বন্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। পর্যায়ক্রমে আরও কারখানায় জরিমানা করা হবে।’