রেলওয়ের শহর হিসেবে পরিচিত সৈয়দপুর। নীলফামারীর এ উপজেলায় রয়েছে রেলওয়ে কারখানা, বিমানবন্দর, ক্যান্টনমেন্ট ও পোশাক কারখানা। এ ছাড়া এখানে রয়েছে অসংখ্য হালকা ও ভারী কলকারখানা। ফলে উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলার তুলনায় এখানে কর্মসংস্থানের বেশি সুযোগ রয়েছে। তা ছাড়া সৈয়দপুর উপজেলায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় একে ‘শিক্ষা নগরী’ও বলা হয়। এসব কারণে প্রতিদিন ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি যানবাহন সৈয়দপুর শহরে প্রবেশ করে। এদিকে ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ফলে বাধ্য হয়ে পথচারীদের সড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে রেলওয়ে ও শিক্ষানগরী যেন যানজটের নগরীতে পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, আয়তনে ছোট হলেও সৈয়দপুর শহরে প্রায় ৪ লাখ মানুষ বসবাস করে। এ ছাড়া নীলফামারীর অন্যান্য উপজেলাসহ আশপাশের জেলা থেকে এ শহরে কয়েক হাজার মানুষ আসেন। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে বাড়ছে জনসংখ্যা ও যানবাহন।
সরেজমিনে দেখা যায়, মদিনা মোড়, দুই নম্বর রেল ঘুন্টি লালকুটির পাশে, তামান্না সিনেমা হল মোড়, কিছুক্ষণ মোড়, সোহেল রানা মোড়, ট্রাফিক বক্স মোড়সহ শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানের চালকরা যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করছেন। এ ছাড়া অন্য জেলা-উপজেলা থেকে অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, রিকশা, ট্রাক, পিকআপ, কার, মাইক্রোবাসহ ভারী যানবাহন শহরে প্রবেশ করছে। এদিকে শহরের রংপুর-দিনাজপুর (শহিদ ডা. শমাসুল হক) সড়কের দুই পাশের দোকানদাররা তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনের ফুটপাতটি আরেকজনকে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে রাস্তার ওপর দিয়ে চলাচল করছেন। শহরের তামান্না মোড় এলাকার অবস্থা আরও ভয়াবহ। নির্দিষ্ট স্টেশন না থাকায় রাস্তার ওপর ব্যাটারিচালিত রিকশা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখছেন চালকরা। এই মোড়েই রয়েছে তাজির উদ্দিন গ্র্যান্ড হোটেল। গ্রাহকরা খাওয়া-দাওয়া করার জন্য রাস্তার ওপর মোটরসাইকেল রেখে হোটেলে প্রবেশ করছেন।
শহিদ ডা. জিকরুল হক সড়কে রেলওয়ের জায়গায় গড়ে উঠেছে অসংখ্যা বহুতল ভবন। এসব ভবনে রয়েছে ব্যাংক-বিমাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এসব বহুতল ভবনে নেই কোনো পার্কিং ব্যবস্থা। তাই বাধ্য হয়ে গ্রাহকরা রাস্তার ওপর তাদের ব্যক্তিগত যানবাহন রেখে কেনাকাটাসহ ব্যবাসায়িক কাজ করছেন। এর ফলে এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকছে। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন পথচারীসহ সাধারণ মানুষ।
সৈয়দপুর পৌরসভাসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভায় প্রায় ২ হাজার রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশার লাইসেন্স রয়েছে। তবে শহরে চলাচল করে চার হাজারের বেশি যানবাহন। এ ছাড়া আশপাশের জেলা, উপজেলা থেকেও প্রতিদিন শহরে ঢোকে প্রায় তিন হাজার যানবাহন।
খালকুজ্জান সাকিব নামের এক পথচারী বলেন, যানজট সৈয়দপুর শহরের নিত্যদিনের সঙ্গী। রাত ১১টা পর্যন্ত যানজট লেগে থাকে।
লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী জেমি আক্তার বলেন, ‘যানজটের কারণে প্রায় স্কুলে যেতে দেরি হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা ঢাকা শহরে বসবাস করছি। তা ছাড়া ট্রেন চলাচলের সময় রেলগেট বন্ধ থাকে। আর গেট খুলে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে ২০-২৫ মিনিট লাগে। এ ছাড়া হেঁটে চলাচল করার জন্য কোনো ফুটপাত নেই। তাই রাস্তার ওপর দিয়ে চলাচল করতে হয়।’
পলাশ কুমার দাস বলেন, ‘আমার বাসা দিনাজপুরে। প্রায়ই ব্যবসার কাজে বিমানযোগে ঢাকা যাতায়াত করতে হয়। শহরের জ্যামের কারণে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য ৩০ মিনিট হাতে রেখে এ শহরে ঢুকতে হয়।’
শিক্ষিকা জেসমিন রজব বলেন, যানজটের কারণে প্রতিদিন মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। যানজটের পাশাপাশি রয়েছে শব্দদূষণের ভোগান্তি।
কামারপুকুর ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যক্ষ শওকত হায়াত শাহ বলেন, সৈয়দপুর শহরের যানজট এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। সড়কগুলো প্রশস্ত করাসহ ফুটপাতগুলো উচ্ছেদ করা না হলে শহরে বাস করাই কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে।
ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক মাহফুজার আলম বলেন, ‘অতিরিক্ত রিকশা চলাচল, ফুটপাত দখল করে ফল ও কাপড়ের দোকান, যত্রতত্র রিকশায় যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং দিনের বেলায় শহরের ভেতর দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ–এসব কারণে শহরের ব্যস্ততম পাঁচমাথা মোড়, মদিনা মোড়, তামান্না সিনেমা হলের সামনে ও পোস্ট অফিস মোড়ে সব সময় যানজট লেগেই থাকে। আমরা স্বল্প জনবল নিয়ে যানজট নিরসনে কাজ করছি। তা ছাড়া বিমানবন্দর প্রোটোকল থাকলে কিছুটা বেগ পেতে হয়।’
সৈয়দপুর পৌর প্রশাসক নুর-ই আলম সিদ্দিকী বলেন, শহরকে যানজটমুক্ত করতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য সচেতনতাই বেশি জরুরি। ব্যক্তি সচেতনতা তৈরি করতে একটি নাগরিক কমিটি গঠন করা হবে। এতে কাজ না হলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।