বিদ্যালয়ে ঢুকেই দেখা গেল, কিছু শিক্ষার্থী স্কুলের বারান্দায় লাফালাফি করছে আর চার শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন শিক্ষক। পাশের কক্ষেই আর একজন শিক্ষক চতুর্থ শ্রেণির ক্লাস নিচ্ছেন। সেখানেও একই অবস্থা। ৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজন ক্লাস করছেন, বাইরে লাফালাফি করছেন বাকি পাঁচজন। নিচতলায় তৃতীয় শ্রেণির পাঠদান করাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক। এমন চিত্র রংপুর সদর উপজেলার চন্দনপাঠ ইউনিয়নের খৈল্যাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।
জানা যায়, বিদ্যালয়টিতে প্রাক-প্রাথমিকসহ ১০১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে প্রাক প্রাথমিকে ২১ জন, প্রথম শ্রেণিতে ২০, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২৪, তৃতীয় শ্রেণিতে ১৪, চতুর্থ শ্রেণিতে ৭, পঞ্চম শ্রেণি ১৫ জন শিক্ষার্থী আছে। একদিকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাব, শিক্ষক সংকট, অন্যদিকে ক্যাচমেন্ট এরিয়া বড়। এ ছাড়া সময়মতো ক্লাস না হওয়া, পরীক্ষা পদ্ধতিতে ত্রুটি, স্কুল ফিডিং না থাকার প্রভাব পড়েছে বলে জানান শিক্ষকরা। তারা জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। তাদের দাবি, অভিভাবকদের অসচেতনতা, পারিবারিক অসচ্ছলতা, ক্যাচমেন্ট এলাকায় কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও মাদ্রাসা থাকায় এমন প্রভাব পড়েছে।
শিক্ষা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন অনেক মেধাবী শিক্ষক যোগ দিলেও তুলনামূলকভাবে শিক্ষার্থীরা সেই পরিমাণ পাঠদান পাচ্ছে না। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি অভিভাবকদের অনীহা দিন দিন বাড়ছে।
সম্প্রতি রংপুরের ১৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন এই প্রতিবেদক। এর মধ্যে হরকলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মহাদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর মুলাটোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মৌলভী আব্দুস সাত্তার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নেকার পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গদাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঞ্জরভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোপালপুর শেখেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি স্কুলের চিত্র একই পাওয়া গেছে।
বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর শেখেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একরামুল শাহ বলেন, ‘আমাদের এখানে চার থেকে পাঁচটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও মাদ্রাসা থাকা সত্ত্বেও আমার স্কুলে ৩০০-এর বেশি শিক্ষার্থী আছে। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেই শিক্ষার্থী বাড়ানো হয়েছে। পড়ানোর পাশাপাশি অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার বিষয়ে সচেতন করা, উঠান বৈঠক, খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা দেওয়ায় এটি সম্ভব হয়েছে।’
গঙ্গাচড়া উপজেলার পাঞ্জরভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নূর ইসলাম বলেন, ‘আমি এই স্কুলে আসার পর শিক্ষার্থী বাড়ছে। নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মাঠে থেকে খেলাধুলার ব্যবস্থা করা, বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে অভিভাবকদের বোঝানোসহ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করায় আগের চেয়ে শিক্ষার্থী বাড়ছে। গত বছর ছিল আমার স্কুলে ১০৪ জন শিক্ষার্থী ছিল, এ বছর সেটি দাঁড়িয়েছে ১০১৮ জনে।
গঙ্গাচড়া উপজেলার অভিভাবক সুলতানা বেগম বলেন, ‘বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে বসে থাকে, শিক্ষকরা সময়মতো আসেন না। এলেও সময়মতো ক্লাস শুরু হয় না। এ জন্য বাচ্চারা স্কুলেই যেতে চায় না।’
এদিকে উপজেলাভিত্তিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাবলীলভাবে বাংলা ও ইংরেজি পঠনের দক্ষতা উন্নয়নসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। বদরগঞ্জ উপজেলার সাবেক প্রধান শিক্ষক মাহবুব খান বলেন, ‘এখন যারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে আসছেন, তারা অবশ্যই মেধাবী। কিন্তু শিশুদের পড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের আরেকটু সচেতন হতে হবে। নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়া জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আরও শিক্ষার্থী সংকটে পড়বে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। কিছু কিছু জায়গায় শিক্ষক সংকট আছে। সেগুলো দ্রুতই কাটিয়ে উঠব। এ ছাড়া অভিভাবকদের অসচেতনতাও এ ব্যাপারে প্রভাব ফেলেছে। আমরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছি। তবে সামনের বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে শিক্ষার্থী তুলনামূলকভাবে বাড়বে বলে আশা করি।’