রামনারায়ণ রবিদাস জন্ম থেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। চারজনের পরিবার নিয়ে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার পালকিছড়া চা-বাগানে ছোট টিনের ঘরে বসবাস করেন। স্ত্রীসহ দুজনেই ভিক্ষা করে কাটিয়েছেন দিনের পর দিন। প্রতিদিন ছিল টিকে থাকার যুদ্ধ, বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
তবু অদম্য এক স্বপ্ন বুকে পুষে রেখেছিলেন রামনারায়ণ– ভিক্ষার থালা একদিন নামিয়ে রাখবেন চিরতরে। দারিদ্র্য, অন্ধত্ব আর কঠোর বাস্তবতা সত্ত্বেও ঋণ করে ছেলের জন্য অটোরিকশাও কিনেছিলেন। ভেবেছিলেন, ছেলে সেটি চালালে দু মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে। আর ভিক্ষা করতে হবে না। কিন্তু গত মঙ্গলবার ভোরে ঘুম ভাঙতেই রামনারায়ণ জানতে পারেন, তালা ভেঙে চোর অটোরিকশাটি নিয়ে গেছে।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) বিকেলে রামনারায়ণের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সুনসান নীরবতার মাঝেও যেন কথা বলে উঠছিল চারপাশের হাহাকার। ঘরের সামনেই দাঁড়িয়ে রামনারায়ণের পরিবার। তাদের শরীরে নেই পর্যাপ্ত শীতের কাপড়, চোখে-মুখে ক্লান্তি আর গভীর অসহায়ত্ব।
ভিক্ষা করে কোনোমতে সংসার চলত জানিয়ে কাঁপা গলায় রামনারায়ণ বলেন, ‘বড় অভাবে দিন চলছে। অনেক কষ্টে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে একটা অটোরিকশা কিনেছিলাম। মনে করেছিলাম, আর ভিক্ষা করতে হবে না। ছেলে সংসার চালাবে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা আর সে সুখ দিলেন না।’
রামনারায়ণের গলায় ছিল না কোনো অভিযোগ, ছিল কেবল চিরচেনা হার না মানা এক বেদনার সুর। তিনি বলেন, ‘পুলিশকে জানাইয়া কী লাভ! এলাকায় কত গরু চুরি হইছে, কোনোটার খবর মিলছে কি?’ রামনারায়ণ প্রশ্ন রাখেন, ‘এখন আমারটা পাবে কীভাবে?’
পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী বাসমতি রানী রবিদাস শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘এই অটোরিকশাটিই ছিল আমাদের বিপদের ভরসা। ভাবছিলাম, আর ভিক্ষা করতে হবে না। স্বামীর কষ্ট একটু কমবে, সংসারটা একটু দাঁড় করাতে পারব। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল! চোর মরা মানুষকে আরও মেরে গেল।’
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গত সাত মাসে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২৫টি গরু চুরি হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে একটি গরুও উদ্ধার হয়নি। চোরচক্রের অপতৎপরতা দিনে দিনে বাড়ছে। সাধারণ মানুষের মনে জমছে আতঙ্ক।
স্থানীয় ইউপি সদস্য গণেশ গোয়ালা বলেন, ‘অন্ধ চোখে যে মানুষটি একটু আলোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আলো নিভে গেছে চোরের কারণে।’ এ বিষয়ে কুলাউড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’