শিক্ষকসংকটসহ বিভিন্ন কারণে মাতৃভাষায় পড়ালেখা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় বসবাসরত ত্রিপুরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কয়েক শ শিশু। বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ককবরক ভাষা শিক্ষার দক্ষিণ সোনাইছড়ি ত্রিপুরাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। ত্রিপুরা শিশুদের পাঠদানের সুবিধার্থে ২০১৮ সালে সোনাইছড়ি ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়। সরকার প্রতিবছর অন্যান্য অ্যাকাডেমিক পাঠ্যবই বিতরণ করলেও মাঠপর্যায়ে মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠদান অনেকটাই পিছিয়ে। ২০২০ সালের পর থেকে এই স্কুলে ককবরক ভাষার বই পাঠানো হয়নি বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
তারা জানান, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর ত্রিপুরাপল্লির বাসিন্দাদের মনে আশার আলো জেগেছিল। নিয়মিত ক্লাসও শুরু হয়। বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে উপজেলা প্রশাসন থেকে সহায়তার হাত বাড়ানো হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টি দৈন্যদশায় পড়েছে। ত্রিপুরা ভাষায় পাঠদান না থাকায় শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে। নিজস্ব ভাষার চর্চা না থাকায় অনেকে আগ্রহ হারাচ্ছে। ভাষার মাসেও নিজস্ব ভাষার চর্চায় পিছিয়ে তারা। ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে গিয়ে নিজেদের মাতৃভাষা ভুলে যেতে বসেছে শিশুরা।
অভিভাবকরা জানান, পরিবার ও সম্প্রদায়ের উদ্যোগে সীমিত পরিসরে ককবরক ভাষা চর্চা থাকলেও বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম না থাকায় তা টেকসই হচ্ছে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠদান চালু না থাকায় শিশুরা বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা শুরু করেই হোঁচট খাচ্ছে। অনেক শিশু পাঠ ঠিকমতো বুঝতে না পেরে ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এতে ঝরে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
তারা আরও জানান, শিশুরা ঘরে ককবরক ভাষায় কথা বলে; কিন্তু স্কুলে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায় পড়তে হয়। ফলে তারা মানসিক চাপ অনুভব করে এবং পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে। অন্তত প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় পাঠদান চালু করা হলে শিশুরা দ্রুত শেখার সক্ষমতা অর্জন করবে এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়বে।
পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদান কার্যক্রম চালু থাকলেও এত বছরেও প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি, পরীক্ষার মূল্যায়নে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না হওয়া, পরিকল্পিত বাস্তবায়নের অভাব এবং আর্থিক প্রণোদনার সংকটের কারণে উদ্যোগটি কার্যত থমকে আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেশের সংবিধানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিকাশের কথা উল্লেখ রয়েছে। সরকারিভাবে দেশের কিছু এলাকায় মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকলেও সীতাকুণ্ডে তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
মধ্যম সোনাইছড়ি ত্রিপুরাপাড়ার সর্দার ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সীতাকুণ্ড শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক কাঞ্চন কুমার ত্রিপুরা বলেন, ‘বর্তমানে এই স্কুলে শিশু শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ৪৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। ২০২০ সালে সর্বশেষ এই স্কুলে ককবরক ভাষার বই এসেছিল। এরপর সরকারিভাবে আর কোনো মাতৃভাষার বই দেওয়া হয়নি। ছাত্র-ছাত্রী অনুযায়ী শিক্ষকও নিয়োগ করা হয়নি। দুজন শিক্ষক দিয়ে কোনোভাবে পাঠদান করা হলেও তারা ককবরক ভাষায় পারদর্শী নন। এ ছাড়া এখানে বিদ্যুৎ নেই। বর্ষা মৌসুমে রাস্তা দিয়ে হাঁটা সম্ভব হয় না, তাই বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়।’
দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র পরিমল ত্রিপুরা বলে, ‘আমাদের শিক্ষকরা ককবরক ভাষা শিক্ষা দিতে পারেন না। অনেক সময় শিক্ষক আসেন না।’
প্রথম শ্রেণির ছাত্রী নিলা ত্রিপুরা বলে, ‘আমাদের বইয়ের সংকট রয়েছে। মাতৃভাষা তেমন শেখানো হয় না।’
কালা কৃষ্ণ ত্রিপুরা নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে এখানে পড়াশোনা করে। শিক্ষক কম, সরকারি সুযোগ-সুবিধাও নেই।’
শিক্ষক টিস্তা বালা ত্রিপুরা বলেন, ‘আমি ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর হলেও ককবরক ভাষায় পারদর্শী নই। তবে চেষ্টা করছি কিছুটা হলেও শিক্ষা দেওয়ার।’
অন্য শিক্ষক সামিয়া আক্তার বলেন, ‘আমি এক কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে পাহাড় বেয়ে স্কুলে আসি। কষ্টের তুলনায় বেতন খুবই কম। তা ছাড়া ককবরক ভাষার বই না থাকায় পড়ানো সম্ভব হয় না।’
আরেক অভিভাবক নন্দ কুমার ত্রিপুরা বলেন, ‘শিক্ষকের অভাবে আমাদের প্রজন্ম মাতৃভাষা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাই, ককবরক ভাষায় পারদর্শী শিক্ষকের মাধ্যমে পাঠদান নিশ্চিত করা হোক।’
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের শিশুরা যাতে মাতৃভাষা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।