হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চা-বাগানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় নেতৃত্বসংকট সৃষ্টি হয়েছে। ৩ বছর মেয়াদি কমিটি দিয়ে টানা প্রায় ৮ বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে পঞ্চায়েত, ভ্যালি ও শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যক্রম। এতে চা-শ্রমিকদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ, অস্থিরতা এবং সংঘাতের ঝুঁকি।
সম্প্রতি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার পর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বাগানের ব্যবস্থাপক দেওয়ান বাহাউদ্দিন লিটনের গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায় শ্রমিকদের একাংশ। শ্রমিকদের দাবি, পঞ্চায়েত কমিটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেই এ ঘটনার সূত্রপাত। ঘটনার পর থেকে বাগানজুড়ে বিরাজ করছে চরম উত্তেজনা।
শুধু তেলিয়াপাড়া নয়, জেলার বিভিন্ন চা-বাগানেই একই চিত্র। শ্রমিক নেতাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় কার্যকর নেতৃত্বের অভাব তৈরি হয়েছে। ফলে ছোটখাটো বিরোধও বড় আকার ধারণ করছে এবং শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
চা-শ্রমিক সংগঠনের কাঠামো মূলত তিন স্তরে বিভক্ত–পঞ্চায়েত, ভ্যালি এবং কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়ন। শ্রমিকদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত এসব কমিটির মেয়াদ তিন বছর। এসব কমিটির দায়িত্ব শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং ন্যায্য দাবি আদায়ে কাজ করা।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এরপর আরও দুটি নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতার কারণে তা হয়নি। ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিই এখন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, নির্বাচন না থাকায় নেতৃত্বে জবাবদিহি কমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সমস্যা উপেক্ষিত হচ্ছে। ন্যায্য মজুরি, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিনের দাবিগুলোও বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছে বাগান কর্তৃপক্ষ।
তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি লালন তাঁতী বলেন, ‘তিন বছরের কমিটি দিয়ে ৮ বছর অতিবাহিত হচ্ছে। যে কারণে শ্রমিক নেতাদের মধ্যে নানা বিভক্তি তৈরি হয়েছে। অনেক বাগানে বিরোধী গ্রুপ শৃঙ্খলাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেরাই এডহক কমিটি গঠন করেছেন। এগুলো নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব বাড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘এই কমিটিগুলো চা-শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলার কথা। কিন্তু তারা নিজেদের ঝামেলাই শেষ করতে পারে না। যে কারণে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলা সম্ভব হয় না। নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে শ্রমিকরা দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু এসব সমস্যা নিয়ে কে কথা বলবে?
বাংলাদেশ চা কন্যা সংসদের সভাপতি খায়রুন আক্তার বলেন, ‘বাংলাদেশের চা-বাগানগুলোতে চরম অস্থিরতা চলছে। এখনো আমাদের মৌলিক অধিকারগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে বাগান চলছে, ফলে নেতারা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলছেন না। তারা কথা বলতে গেলেও নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অপর গ্রুপ তাদের বাধা দিচ্ছে। ফলে এই সুযোগটা নিচ্ছে বাগান কর্তৃপক্ষ।’
তিনি বলেন, ‘চা-বাগানের তিনটি ইউনিটের নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠেছে। যদি দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হয়, তাহলে বাগানগুলোতে আরও অচলাবস্থা তৈরি হবে।’
বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ‘২০২০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে তখন সেটি সম্ভব হয়নি। পরে ২০২২ সালে আমরা শ্রম অধিদপ্তরকে নির্বাচন আয়োজনের জন্য চিঠি দেই। কিন্তু তখন শ্রম অধিদপ্তর দেই-দিচ্ছি বলে সময়ক্ষেপণ করে। এরই মধ্যে জাতীয় নির্বাচন চলে আসে। জাতীয় নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই গণ-অভ্যুত্থান শুরু হয়। সব মিলিয়ে আর নির্বাচন হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আমরা শ্রম অধিদপ্তরকে চাপ দিচ্ছি। কিন্তু তারা বলছে, নির্বাচনের জন্য ৭০ লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু সেই টাকা সরকার দিতে পারবে না। আমরা শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ২৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছি। কিন্তু বাকি টাকা না পাওয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না।’
অতীতের নির্বাচনগুলোতে সরকারের পক্ষ থেকেই খরচ বহন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় এক লাখ। এত বড় একটি শ্রমিক গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দীর্ঘদিন অনির্বাচিত থাকায় সংগঠনটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।