এক সময় হবিগঞ্জের মানুষের জীবিকা, মাছ ধরা ও কৃষির প্রধান ভরসা ছিল সুতাং নদী। নদী ঘিরেই চলত স্থানীয় অর্থনীতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সে চিত্র বদলে গেছে। শিল্পায়নের বিস্তার আর অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখন নদীটি ভয়াবহ দূষণের শিকার। নদীর পানি হারিয়েছে স্বাভাবিক গুণাগুণ। এর প্রভাব পড়ছে তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায়। স্থানীয়রা বলছেন, নদীর পানি থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। বাড়ছে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ। সম্প্রতি দুটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য।
হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় এসব গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে নদীর পানি, মাছ ও পরিবেশগত অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়েছে ভারী ধাতু ও মাইক্রোপ্লাস্টিক উপস্থিতি।
গবেষণা অনুযায়ী, নদীর উজানে দূষণ তুলনামূলক কম। কিন্তু শিল্প এলাকাসংলগ্ন ভাটির দিকে পানির মান দ্রুত খারাপ হচ্ছে। শায়েস্তাগঞ্জের শিল্পাঞ্চল এলাকায় পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা নেমে এসেছে ২.৪৭ পিপিএম-এ। যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা হওয়া উচিত ৫ পিপিএম। এতে জলজ প্রাণীর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে নদীর পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি আশঙ্কাজনক। গবেষণায় লেডের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় ২৪ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। ক্যাডমিয়াম প্রায় ১.৫ গুণ, ম্যাঙ্গানিজ ২.৩৫ গুণ এবং আয়রন প্রায় ৮ গুণ বেশি। এসব ধাতু নদীর জীববৈচিত্র্য ও জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে করা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর পানিতে বিপুল পরিমাণ ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। শুধু পানিতেই নয়, মাছের শরীরেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। নদী থেকে সংগৃহীত ৩০টি মাছের পরিপাকতন্ত্র পরীক্ষা করে ৫১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি মাছে গড়ে প্রায় দুটি প্লাস্টিক কণা রয়েছে।
পানির নমুনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি লিটার পানিতে ৬টি থেকে সর্বোচ্চ ৪৬টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। এসব কণার আকার ০.১ থেকে ০.৫ মিলিমিটার, যা সহজেই খাদ্যচক্রে প্রবেশ করতে পারে।
গবেষক হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাকির আহমেদ বলেন, ‘আমরা তিনটি স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছি। এর মধ্যে আপস্ট্রিমে অক্সিজেন কিছুটা স্বাভাবিক এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক কম পাওয়া গেছে। তবে শিল্পবর্জ্য যেখানে সরাসরি নদীতে মিশেছে, সেখানে ভয়াবহ অবস্থা। সেখানে প্রাণের কোনো উপস্থিতিই ছিল না। এমনকি যে পরিমাণ ভারী ধাতু পাওয়া গেছে, সেখানে কোনোভাবেই জীবনের অস্তিত্ব থাকার কথা নয়।’
তিনি আরও জানান, লাখাই উপজেলার বুল্লা বাজার এলাকায় দূষণের মাত্রা কিছুটা কম। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক।
অ্যাকুয়াটিক রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কনজারভেশন বিভাগের প্রভাষক ইফতেখার আহমেদ ফাগুন বলেন, ‘নদীর ভারী ধাতু পুরো খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব ফেলছে। মাছের মাধ্যমে এসব ধাতু মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শুধু তাই নয়, এই নদীর পানি দিয়ে সেচ দেওয়া জমির ধানেও এসব উপাদান জমা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে চালের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এ দূষণের প্রভাব শুধু স্থানীয় জনগণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এ অঞ্চলের ধান দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হলে সেখানকার মানুষও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।’
গবেষণায় নদীর পানিতে পলিথিন, পিইটি ও বিভিন্ন শিল্পজাত প্লাস্টিকের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শায়েস্তাগঞ্জের অলিপুর শিল্পাঞ্চলের কারখানা, টেক্সটাইল কার্যক্রম এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই এ দূষণের মূল উৎস।
সব মিলিয়ে এক সময়ের প্রাণবন্ত সুতাং নদী এখন অস্তিত্বসংকটে। নদী রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।