জমি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল সম্পাদন করা নিয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন লালমনিরহাট জেলার মানুষ। জেলার সদর উপজেলা, আদিতমারী, পাটগ্রাম, কালীগঞ্জ ও হাতীবান্ধা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বর্তমানে সাব-রেজিস্ট্রারশূন্য রয়েছে। এসব অফিসের কাজ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে আশপাশের জেলার সাব-রেজিস্ট্রারদের দিয়ে। এতে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
লালমনিরহাট জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় ও উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র ও কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, জমি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল সম্পাদন এবং এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন সাব-রেজিস্ট্রার। অথচ লালমনিরহাটের পাঁচ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় অন্য জেলার সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে এসব অফিসের কার্যক্রম চলছে। তারা আবার সপ্তাহে এক থেকে দুই কর্মদিবস অফিস করছেন। ফলে জমি কেনাবেচা করতে গিয়ে স্থানীয়দের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এ ছাড়া এর প্রভাব পড়ছে রাজস্ব আদায়ে।
জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পাটগ্রাম উপজেলায় ২০১৭ সালে সাব-রেজিস্ট্রার রতন অধিকারী বদলি হওয়ার পর থেকে নতুন কোনো কর্মকর্তা পদায়ন করা হয়নি। প্রায় ৮ বছর ধরে অফিসটি চলছে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে। বর্তমানে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার রাশেদুজ্জামান সপ্তাহে এক দিন পাটগ্রাম অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে তিনি লালমনিরহাট সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রারের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন। অর্থাৎ তিনি রাজারহাটসহ লালমনিরহাট সদর এবং প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের পাটগ্রাম অফিসের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
লালমনিরহাট সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার আহসান হাবিব ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল বদলি হওয়ার পর পদটি শূন্য হয়ে পড়ে। একই দিনে কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভাণ্ডার সাব-রেজিস্ট্রার রাশেদুজ্জামানও বদলি হন। এরপর থেকে এ দুই কার্যালয়ে কোনো স্থায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এদিকে এই বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বিসিএস ক্যাডারে নির্বাচিত হয়ে হাতীবান্ধা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার আরিফ ইশতিয়াক অন্যত্র যোগদান করেন। এরপর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে একমাত্র আদিতমারী উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার শিউলী খাতুন পদায়ন থাকলেও বর্তমানে তিনি দুই মাসের প্রশিক্ষণে রয়েছেন। এভাবে লালমনিরহাটের পাঁচটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসই কার্যত স্থায়ী কর্মকর্তাশূন্য অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমানে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার কামরুন নাহার আদিতমারী উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার সিরাজুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন হাতীবান্ধা অফিসে। আর কালীগঞ্জের তুষভান্ডার অফিসে অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার রিপন চন্দ্র মণ্ডল। অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজ নিজ কর্মস্থলের পাশাপাশি এসব অফিসে সপ্তাহে মাত্র এক বা দুই দিন সময় দিতে পারছেন। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। ভুক্তভোগীরা জানান, সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় কাজ না করেই ফিরে যেতে হয়। সপ্তাহে মাত্র এক দিন সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে এলে সেদিন আবার অনেক ক্রেতা বা বিক্রেতা ছুটি পান না। ফলে দলিল নিবন্ধনের কাজ পিছিয়ে যায়। অনেক বিক্রেতা মেয়ের বিয়ে, চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনেও সময়মতো জমি বিক্রি করতে পারছেন না।
তারা আরও জানান, দীর্ঘ ভোগান্তির পর সাব-রেজিস্ট্রার ও ক্রেতা-বিক্রেতাকে একসঙ্গে পাওয়া গেলেও নতুন সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে এক দিনে দলিল লেখক ও সাব-রেজিস্ট্রারদের পক্ষে প্রতিটি দলিল যথাযথভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ভুলত্রুটি থেকে যাওয়ার এবং ভুলভাবে দলিল সম্পাদনের ঝুঁকি তৈরি হয়। সপ্তাহের ৫ দিনের কাজ এক দিনে সম্পন্ন করতে গিয়ে ভুল হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাব-রেজিস্ট্রারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকলে দলিল নিবন্ধন, নকল সরবরাহ, পুরোনো দলিল সংগ্রহসহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব আদায় কমে যায়, অন্যদিকে জনদুর্ভোগ বাড়তে থাকে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত শূন্য পদগুলোতে সাব-রেজিস্ট্রার পদায়ন করে স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা রেজিস্ট্রার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সাব-রেজিস্ট্রারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকলে অফিসের সার্বিক কার্যক্রম গতিহীন হয়ে পড়ে। জনভোগান্তি কমাতে সাব-রেজিস্ট্রার পদায়নের জন্য কয়েক দফায় মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দ্রুত পদায়ন হলে এ জনদুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।