‘ঠিলে ধুয়ে দে বৌ, গাছ কাটতি যাবো’খ্যাত লোকসংগীতের প্রখ্যাত শিল্পী অনিল হাজারিকা আজ বার্ধক্য, অসুস্থতা ও চরম আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত। একসময়ে যিনি বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের হাসি-কান্না, ঐতিহ্য ও আঞ্চলিক ভাষাকে গান ও সুরে রূপ দিয়েছেন, লোকজ কণ্ঠের সেই প্রাণপুরুষ আজ জীবনসংগ্রামে দিন কাটাচ্ছেন।
বাংলা লোকসংগীতের জন্য স্মরণীয় বছর ১৯৭৯ সালে অনিল হাজারিকা তার কালজয়ী অডিও ক্যাসেট ‘কিডারে’ প্রকাশ করেন। এর পর পরই অ্যালবামটি দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে, যা এখনো বিরাজমান।
অনিল হাজারিকার উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে–‘আমগাছে ঢেলা মারে কিডারে’, ‘এ যুগের ছেলেরা বোঝে না’, ‘বৌ বাবার বাড়িতে’, ‘আমাদের দৈনিক হাটবারে’, ‘খাজুরগাছে চোমর বারোইছে’, ‘রস গুড় পাটালি বেচে’, ‘সন্ধ্যা রস ঝাড়ে এনে’, ‘কাঁচিপুড়া পিটে বানায়ে’ ও ‘বালি চুঙো আগে আনে দে’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় লোকগান। এসব গানে সুর ও কণ্ঠ তিনি নিজেই দিতেন। তার বহু গান বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে।
বর্তমানে মাগুরার শালিখা উপজেলার ধনেশ্বরগাতী ইউনিয়নের তিলখড়ি গ্রামে বসবাস করছেন এই গুণী শিল্পী। বয়স প্রায় ৭০ বছর। পাঁচ বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তিনি প্রায় কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। বেশির ভাগ সময় বিছানায় শুয়েই দিন কাটান তিনি।
শিল্পী অনিল হাজারিকা জানান, শৈশবে সংসারের অভাব-অনটনের কারণে মাত্র ১৫ বছর বয়সে লেখাপড়া ছেড়ে বাবার সঙ্গে কাজ শুরু করতে হয় তাকে। তার বাবা প্রয়াত হাজারী লাল বিশ্বাস ছিলেন সংগীতপ্রেমী মানুষ। বাবার কাছ থেকেই সংগীতের হাতে খড়ি। তিনি মাত্র ২০ বছর বয়সে গান লেখা শুরু করেন। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই আঞ্চলিক উপভাষায় গান রচনা করতে থাকেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার গান ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে।
তিনি বলেন, ‘আমার লেখা গানের সংখ্যা এক হাজারের অধিক। আরও অনেক গান ছিল, যেগুলো সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। মানুষের ভালোবাসাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
লোকসংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৫ সালে তিনি খুলনা বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগ, যশোরের নৃত্যবিতান ও মাগুরা জেলা শিল্পকলা একাডেমি তাকে সম্মাননা প্রদান করেছে।
তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অসুস্থতা ও আর্থিক সংকট তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বর্তমানে পৈতৃক ভিটায় টিনের একটি সাধারণ ঘরে স্ত্রী জ্যোৎস্না হাজারিকাকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। পরিবারের সামান্য সহায়তা ও এক বিঘা জমির ধানের ওপর নির্ভর করেই চলছে সংসার।
অনিল হাজারিকার স্ত্রী জ্যোৎস্না হাজারিকা বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে স্ট্রোক করার পর বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করাতে গিয়ে ৪ লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। এখন আর চিকিৎসার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। উন্নত চিকিৎসা করাতে পারলে হয়তো আবার কিছুটা সুস্থ হয়ে গান লেখা ও গাওয়ার কাজে ফিরতে পারত।’
তবে এই শিল্পীর জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দেন শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীন হাসান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘লোকশিল্পী অনিল হাজারিকার চিকিৎসা সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী তার চিকিৎসার জন্য ৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। আগামী ১২ তারিখে এই সহায়তার অর্থ তার কাছে হস্তান্তর করা হবে।’