বিগত সরকারের আমলে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ফেরানোর দাবি জানিয়ে আসছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। দেশের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর আবারও সর্বোচ্চ আদালতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি উত্থাপিত হয়। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৮ সালে অ্যাডভোকেট এম সলিমুল্লাহসহ তিনজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট করেন। পরবর্তীকালে ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগ এ রিট খারিজ করেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। এরপর এ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম সলিমউল্লাহসহ অন্যরা ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। পরে প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল দেন। একপর্যায়ে হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রায় দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আপিলের অনুমতি দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে আপিল করে রিট আবেদনকারী পক্ষ। এ আপিল মঞ্জুর করে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন। ঘোষিত রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে আনা পঞ্চদশ সংশোধনী আইন ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হয়। এরপর ২০১১ সালের ৩ জুলাই এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। তবে গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর এ রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি। এদিকে আপিল বিভাগের ওই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে গত ১৬ অক্টোবর একটি আবেদন করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে গত বছরের ২৩ অক্টোবর আরেকটি আবেদন করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার। গত ৬ নভেম্বর আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ শুনানি শেষ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। আপিল বিভাগকে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় সমাজে এমনভাবে কুঠারাঘাত করেছে, যা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করেছে। নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে সমাজব্যবস্থাকে। মৃত ব্যক্তি এসে রাতের ভোট দেওয়ার মতো অবাস্তব ঘটনাও দেখেছে জাতি। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল হওয়ায় দেশ গণতন্ত্রের মহাসড়কে হাঁটবে। ত্রয়োদশ সংশোধনী নিয়ে আর রিভিউর কোনো সুযোগ থাকবে না বলে তিনি জানান। গতকাল ২০ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান বিচারপতি ডক্টর সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে রায় দেন। অর্থাৎ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ উল্লেখ করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ; চতুর্দশ নির্বাচন থেকে কার্যকর। আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরলেও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর প্রয়োগ সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। অর্থাৎ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের রায় নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। গতকাল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বদিউল আলম মজুমদার জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান পুনর্জীবিত করার আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হবে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যে রায় দিয়েছিলেন, তার মাধ্যমে দেশের নির্বাচনিব্যবস্থাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। ফলে গত তিনটি নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখায় আছে, সর্বশেষ সাবেক প্রধান বিচারপতি সরকারপ্রধান হবেন। যেহেতু এটি আগামী সংসদ থেকে কার্যকর হবে, তাই জুলাই সনদ পাস হলে সরকারের কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার যে রায় দিয়েছেন তা অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। দেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে এবং গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো বিকল্প নেই। আশা করছি, মহামান্য আদালতের এ রায়ের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথ দৃঢ় করবে ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে।