ইরান-ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের পর তেহরান ওয়াশিংটনকে কঠোর বার্তা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাধ্যমে শান্তি স্থাপন করতে চায় না-কি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়- তা স্পষ্ট করতে হবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যানশিয়াল টাইমস-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ওই বার্তা দেন।
তিনি বলেন, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছিল। কিন্তু ইসরায়েলের আগ্রাসনে তা বাধাগ্রস্ত হয়।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ‘অন্যের জন্য যুদ্ধে না জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের স্বার্থে শান্তির পথে হাঁটতে হবে।’
নিবন্ধে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দেন- ‘যুক্তরাষ্ট্র কি শেষ পর্যন্ত কূটনীতি বেছে নেবে? নাকি অন্যের জন্য যুদ্ধে আটকে থাকবে?’
আরাগচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে মাত্র ৯ সপ্তাহে পাঁচ দফা বৈঠকে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা অতীতে কখনো সম্ভব হয়নি। তার দাবি অনুযায়ী, এই আলোচনাগুলো হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় যখন ইসরায়েল ১৩ জুন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। ইসরায়েল একে ‘অস্তিত্বের জন্য হুমকি’ থেকে বাঁচার জন্য পূর্বপ্রস্তুতিমূলক হামলা হিসেবে বর্ণনা করলেও, ইরান একে সরাসরি শান্তি প্রক্রিয়া ধ্বংস করার চেষ্টা হিসেবে দেখছে।
ইসরায়েলের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বিমান হামলা চালায়, যা আরও উত্তেজনা তৈরি করে। আরাগচি অভিযোগ করেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ আলোচনায় এগোচ্ছিলাম। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সেই অগ্রগতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করেছে।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান এখনো পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য এবং জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সময় আসলে তিনি ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে আগ্রহী হবেন, যাতে ইরান নিজেকে শান্তিপূর্ণভাবে গড়ে তুলতে পারে।
এদিকে আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি সৌদি আরব সফরে গিয়ে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সেখানে ইরান-সৌদি সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়।
‘গাজায় যুদ্ধ থামাতে চায় পুরো বিশ্ব, ব্যতিক্রম শুধু ইসরায়েল’
ইসরায়েলি নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক প্রধান ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক গিয়োরা আইল্যান্ড বলেছেন, গাজার মতো জনবহুল এলাকায় সেনা মোতায়েন ‘মিথ্যা সাফল্যের ধারণা তৈরি করে’ এবং এটি ‘সেনাবাহিনীকে একটি ব্যয়বহুল ও বিপজ্জনক জটিলতায় ফেলে দেয়।’
তিনি বলেন, ‘জয়ের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই, অথচ এর জন্য মূল্য দিতে হচ্ছে অনেক বেশি’। সম্প্রতি এক নিবন্ধে তিনি ওই মন্তব্য করেন। গতকাল বুধবার জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়।
আইল্যান্ড আরও বলেন, সম্প্রতি গাজার বেইত হানুনে পাঁচ ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন এবং ১৪ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এর আগে একটি হামলায় সাতজন সেনা প্রকৌশলী নিহত হয়েছিলেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনা বারবার প্রমাণ করে যে, গাজায় চলমান যুদ্ধটি বাস্তবে অর্থহীন ও ক্ষতিকর।’
আইল্যান্ড বলেন, আধুনিক যুদ্ধের একটি অভিন্ন নিয়ম হলো- ‘যেখানে কোনো সেনাবাহিনী শত্রু জনগণের মধ্যে অবস্থান নেয়, সেখানে ভয়াবহ হামলার ঝুঁকি থেকেই যায়।’
তিনি অতীত উদাহরণ টেনে বলেন, ‘এই একই বাস্তবতা আমরা দেখেছি ভিয়েতনামে আমেরিকানদের ক্ষেত্রে, লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের ক্ষেত্রে এবং ইরাক ও আফগানিস্তানে আমেরিকান ও ব্রিটিশ বাহিনীর ক্ষেত্রে।’
আইল্যান্ড আরও জানান, ‘গাজার স্থল অভিযান শুরুর আগে এই বাস্তবতা বোঝা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই অভিযান চালানো হয়েছে, যার ফলে ইতোমধ্যেই ৪০০-এর বেশি ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার আহত হয়েছেন।’