সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পারমাণবিক পদার্থবিদ ও আরেকজন যান্ত্রিক প্রকৌশলী চীনে চলে গেছেন। তারা নাসাকে মহাকাশে উৎপাদন পদ্ধতি আবিষ্কারে সাহায্য করেছিলেন। তাদের মতোই মার্কিন জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একজন স্নায়ুজীববিজ্ঞানী ও খ্যাতিমান গণিতবিদসহ অর্ধ ডজনেরও বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চীনে স্থানান্তরিত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চীনে কাজ করতে আসা এমন গবেষণা প্রতিভার তালিকা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সিএনএন জানিয়েছে, গত বছরের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত কমপক্ষে ৮৫ জন উদীয়মান এবং প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী চীনা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন কাজে যোগদান করেছেন। চীনে এমন কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়িত হওয়ার পর, চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন বিজ্ঞানীদের প্রস্থান ৭৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া, স্থানান্তরিত বিজ্ঞানীদের দুই-তৃতীয়াংশ চীনে চলে গেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হোয়াইট হাউস গবেষণা বাজেট কমানো এবং বিদেশী প্রতিভার যাচাই-বাছাই বাড়ানোর জন্য ব্যাপক চাপ দেওয়ার কারণে বিশ্বসেরা মেধাবীদের এই প্রবণতা আরও বাড়ছে।
বিপরীতে, বেইজিং দেশীয় উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করছে। যা ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের মধ্যে ভবিষ্যত-গঠনকারী শিল্প যেমন-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, সেমি-কন্ডাক্টর, বায়োটেক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সামরিক হার্ডওয়্যারে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
চীন সরকার বছরের পর বছর ধরে প্রতিভাবান আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের আকৃষ্ট করার উপায় খুঁজছে। যার মধ্যে হাজার হাজার চীনা গবেষকও রয়েছেন যারা দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাদের অনেকেই পরবর্তীতে আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পথিকৃৎ এবং নেতা হয়ে উঠেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র চীনের উপর কঠোর প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দেশটির উদ্ভাবনের ক্ষমতাকে তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একমাত্র পথ হিসেবে দেখছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ফেডারেল গবেষণা বাজেট কমানোর জন্য ব্যাপক চাপ দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প প্রশাসন গবেষণার ওপর সরকারি তদারকি বাড়াচ্ছে। বিশেষায়িত বিদেশী কর্মীদের জন্য H1-B ভিসার খরচ নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে ফেডারেল তহবিল বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইউ শি-এর মতে, চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপগুলোকে "ট্রাম্পের কাছ থেকে একটি উপহার" হিসেবে দেখছে যা তাদের আরও বেশি এবং উচ্চ-মানের প্রতিভা নিয়োগে সহায়তা করবে।
অধ্যাপক শি বলেন, "আপনি খুব শিগগিরই চীনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন, শক্তিশালী এবং উন্নত গবেষণা কর্মসূচি এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির বিস্তার দেখতে পাবেন।"
একটি জাতি হয়ত এভাবেই ভবিষ্যতে সমৃদ্ধ হয়। আর সেই প্রয়াসেই প্রতিভা ধরে রাখা এবং নিয়োগের জন্য চীন দীর্ঘদিনধরে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। দেশটির নিজস্ব অর্থনৈতিক উত্থান এবং ক্রমবর্ধমান বৈজ্ঞানিক দক্ষতার সাফল্য চোখে পড়ার মতোই।
এই বছরের শুরুতে বেইজিংয়ে এআই-চালিত রোবট ফুটবল ম্যাচে রোবট খেলোয়াড়রা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
চীনের সেই রূপান্তর দেখেছেন-এ কথা উল্লেখ করে ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোটিন রসায়নবিদ লু জানান, ১৯৮৯ সালে যখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকোত্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন চীন ছিল "দরিদ্র, সম্পদের সংকটে এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগতভাবে অনেক পিছিয়ে। সে সময় আমি যদি চীনে থাকতাম, তাহলে একজন একাডেমিক গবেষক হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ আমার হতো না, যার জন্য আমি আমাকে দত্তক নেওয়া দেশের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।"
গত কয়েক দশকে চীনে অনেক কিছু বদলেছে। দেশটির অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সরকার গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় বাড়িয়েছে। মোট দেশজ ব্যয় পরিমাপকারী সাম্প্রতিক OECD তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে চীন গবেষণা ও উন্নয়নে ৭৮০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৮২৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
সম্প্রতি, বেইজিংয়ে শিক্ষাবিদ, শীর্ষ বিজ্ঞানী এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে চীনের নেতা শি জিনপিং বলেন "একটি জাতি তখনই সমৃদ্ধ হয় যখন তার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সমৃদ্ধ হয়।" সেখানে শি প্রতিশ্রুতি দেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে একটি "শক্তিশালী" এবং স্বনির্ভর জাতি হয়ে উঠবে।
ইতোমধ্যেই সেই প্রচেষ্টার সফলতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। গত বছর চীনের উচ্চাভিলাষী মহাকাশ কর্মসূচি চাঁদের দূরবর্তী প্রান্ত থেকে বিশ্বে প্রথমবারের মতো চাঁদের ভূমিরূপের নমুনা এনেছে।
দেশটি নবায়নযোগ্য শক্তি, কোয়ান্টাম যোগাযোগের মতো ক্ষেত্রের পাশাপাশি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও শীর্ষে রয়েছে।
এই বছরের শুরুতে, স্বল্প পরিচিত চীনা স্টার্ট-আপ ডিপসিক একটি চ্যাটবট দিয়ে সিলিকন ভ্যালিকে চমকে দিয়েছে। তারা বলছে খরচে একটি ভগ্নাংশে ওপেনএআই-এর o1 মডেলের পারফরম্যান্সের সঙ্গে এটির মোটামুটি মিল রয়েছে।
নেচার ইনডেক্স অনুসারে, চীনা বিজ্ঞানীরা মার্কিন সমকক্ষদের তুলনায় উচ্চমানের প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞান জার্নালে বেশি গবেষণা প্রকাশ করছেন। চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বিশ্বের শীর্ষ ৫০ টির মধ্যে উঠে এসেছে।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং স্ট্যাটিস্টিক্সের তথ্য অনুসারে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী ৮৩% এরও বেশি চীনা স্নাতক ২০২৩ সালেও দেশেই বসবাস করছিলেন।
যদিও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চীনকে আরো অনেক দূর যেতে হবে। তাছাড়া, চীনা ভাষা দক্ষতা ছাড়া চীনের বাইরে থেকে এসেছেন এমন বিজ্ঞানীদের সেখানে স্থানান্তরিত হওয়াও একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
সুলতানা দিনা/