ইসরায়েলের পার্লামেন্ট একটি বিলের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে, যা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব আরোপ করবে। অর্থাৎ অধিকৃত পশ্চিম তীর ইসরায়েলে দখলে চলে যাবে, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) ইসরায়েলের সংসদ নেসেটের ১২০ আসনের মধ্যে ২৫-২৪ ভোটে বিলটি পাস হয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার লিকুদ দলের বিরোধিতা সত্ত্বেও বিলটি পাস হয়। এটি চূড়ান্ত আইনে পরিণত হতে আরও তিনটি ভোটের প্রয়োজন।
নেসেটের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘জুডিয়া ও সামারিয়া (পশ্চিম তীর) অঞ্চলে ইসরায়েল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের’ জন্য বিলটি প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত হয়েছে। বিলটি এখন নেসেটের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটিতে আরও আলোচনার জন্য পাঠানো হবে।
এই ভোটটি অনুষ্ঠিত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক মাস আগের বক্তব্যের পর, যিনি বলেছিলেন যে তিনি ইসরায়েলকে পশ্চিম তীর সংযুক্ত করতে দেবেন না। ভোটের সময় গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি জোরদার করতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসরায়েল সফরে ছিলেন ।
লিকুদ দল এক বিবৃতিতে বলেছে, এই ভোট বিরোধীদের আরেকটি উসকানি, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি করার লক্ষ্যে আয়োজন করা হয়েছে। তারা বলেছে, ‘প্রকৃত সার্বভৌমত্ব শুধু দেখানোর জন্য আইনের মাধ্যমে নয়, মাটিতে সঠিক কাজের মাধ্যমে অর্জিত হবে।’
পশ্চিম তীরের সংযুক্তিকরণ ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা শেষ করে দেবে, যা জাতিসংঘের প্রস্তাবে উল্লেখিত।
লিকুদ সদস্যের সিদ্ধান্তমূলক ভোট
নেতানিয়াহুর জোটের কিছু সদস্য, যেমন জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের জুইশ পাওয়ার পার্টি এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের ধর্মীয় জায়নবাদী দলের সদস্যরা বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
বেন-গভির বলেছেন, ‘জুডিয়া ও সামারিয়ার সমস্ত অঞ্চলে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের সময় এসেছে। আমাদের পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকার এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি শক্তির জায়গা থেকে করতে হবে।’
বিলটি উত্থাপন করেছেন নোয়াম পার্টির নেতা আভি মাওজ, যিনি সরকারি জোটের সদস্য নন।
বেশিরভাগ লিকুদ সদস্য ভোটে অংশ নেননি বা অনুপস্থিত ছিলেন, কিন্তু একজন সদস্য, ইউলি এডেলস্টেইন, নেতানিয়াহুর বিরোধিতা করে বিলের পক্ষে সিদ্ধান্তমূলক ভোট দেন। তিনি এক্স-এ লিখেছেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের মাতৃভূমির সর্বত্র ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব প্রয়োজন।’
আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন
এই ভোটের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, হামাস, কাতার, সৌদি আরব এবং জর্ডান। ফিলিস্তিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা নেসেটর ফিলিস্তিনি ভূমি সংযুক্তির চেষ্টাকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তারা বলেছে, ‘পশ্চিম তীর, জেরুজালেম ও গাজা উপত্যকাসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড একটি একক ভৌগোলিক ইউনিট, যার ওপর ইসরায়েলের কোনো সার্বভৌমত্ব নেই।’
হামাস বলেছে, এই বিলগুলো ‘ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বের কুৎসিত মুখ’ প্রকাশ করে। তারা বলেছে, ‘পশ্চিম তীরের ভূমি সংযুক্তির উন্মত্ত চেষ্টা অবৈধ এবং অকার্যকর।’
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে ‘ফিলিস্তিনি জনগণের ঐতিহাসিক অধিকারের প্রতি সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি চ্যালেঞ্জ’ বলে নিন্দা করেছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইসরায়েলি দখলদার কর্তৃপক্ষের সব বসতি ও সম্প্রসারণবাদী লঙ্ঘনের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান ঘোষণা করেছে। জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নেসেটর ভোটের নিন্দা করে বলেছে, ‘এটি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে ক্ষুণ্ন করে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতা ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারে হস্তক্ষেপ।’
পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে অবৈধ বসতিতে ৭ লাখেরও বেশি ইসরায়েলি বাস করেন। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সব বসতি অবৈধ।
আন্তর্জাতিক আদালত বলেছে, পশ্চিম তীরসহ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব এবং সেখানে বসতি অবৈধ, এবং এগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রত্যাহার করতে হবে।
নেতানিয়াহুর জোটের সদস্যরা বছরের পর বছর ধরে পশ্চিম তীরের কিছু অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্তির আহ্বান জানিয়ে আসছেন। সেপ্টেম্বরে পশ্চিমের কিছু মিত্র দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর নেতানিয়াহুর সরকার সংযুক্তির কথা বিবেচনা করছিল। কিন্তু ট্রাম্প এই পদক্ষেপ অগ্রহণযোগ্য বলে স্পষ্ট করার পর তারা পিছু হটেছে। সূত্র: আল জাজিরা
সুমন/