সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্টে ভ্লাদিমির পুতিনের একটি প্রাসাদ ‘ক্রেমলিনে’ ইউক্রেনের কথিত ড্রোন হামলার খবরে আবার আলোচনায় উঠে এসেছে তার পারিবারিক জীবনের কঠোর গোপনীয়তার বিষয়টি। বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী এই নেতা সবসময়ই তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করেন। কিন্তু এবার যেন তার ব্যত্যয় ঘটলো।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস জানায়, রাশিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু তথা প্রেসিডেন্টের দপ্তর ‘ক্রেমলিন’ বর্তমানে পুতিনের দ্বিতীয় বাড়ি। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত একটি তথ্যচিত্রে পুতিন নিজেই জানান, তিনি এখন বেশির ভাগ সময় ক্রেমলিনেই থাকেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেন।
যদিও পুতিনের প্রায় পুরো সময় ক্রেমলিনে কাটানোর দাবি কিছুটা অতিরঞ্জিত বলে মনে করে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো।
এছাড়া জানা গেছে, তিনি লেক ভালদাইয়ে অবস্থিত তার বিলাসবহুল ও কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত বাসভবনে খুব কমই যান। সেখানে তিনি তার গোপন প্রেমিকা সাবেক অলিম্পিক জিমন্যাস্ট এলিনা কাবায়েভা ও তাদের দুই পুত্র—দশ বছর বয়সী ইভান এবং ছয় বছরের ভ্লাদিমির জুনিয়রের সঙ্গে থাকেন।
অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট ডসিয়ার সেন্টারের তথ্যমতে, পুতিনের দুই পুত্র বিলাসে বড় হলেও বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। পুতিন সাধারণত গভীর রাতে কাজ শেষে তাদের সঙ্গে দেখা করতে যান।
এদিকে, পুতিনের প্রথম স্ত্রী লুদমিলার সঙ্গে তার প্রাপ্তবয়স্ক দুই কন্যা মারিয়া ভোরোনৎসোভা ও কাতেরিনা তিখোনোভাও থাকেন। তবে পুতিন কখনোই প্রকাশ্যে তাদের পরিচয় স্বীকার করেননি। তাদের দুজনেরই নিজস্ব পরিবার রয়েছে।
রুশ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ—নোভগোরোদ অঞ্চলের লেক ভালদাইয়ের কাছে অবস্থিত যে বাড়িতে দুই পুত্র ও প্রেমিকার সঙ্গে পুতিন মাঝেমধ্যে অবস্থান করেন সেই বাড়িটি লক্ষ্য করেই ড্রোন হামলার চেষ্টা চালানো হয়।
আর এই হামলার জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, কথিত ওই হামলায় প্রায় ৯১টি ড্রোন ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে সবগুলোই ধ্বংস করা হয়েছে।
এদিকে, এমন হামলার অভিযোগকে অস্বীকার করেছে ইউক্রেন সরকার। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোও দাবি করেছে, এই দাবি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের অভাব রয়েছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল গত বুধবার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সম্প্রতি ড্রোন হামলা চালিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বা তার কোনো বাসভবনকে লক্ষ্যবস্তু করেনি ইউক্রেন। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এমন তথ্য জানিয়েছেন।
গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে অবগত একজন মার্কিন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে জার্নালটি জানায়, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) মূল্যায়নেও এই সিদ্ধান্তের সমর্থন পাওয়া গেছে।
সিআইএ-এর মতে, পুতিনের ওপর কোনো হামলার চেষ্টা করা হয়নি। প্রতিবেদনে ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইউক্রেন মূলত এমন একটি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানতে চেয়েছিল যেখানে কিয়েভ আগেও হামলা চালিয়েছে। ওই স্থাপনাটি পুতিনের গ্রামের বাড়ির একই অঞ্চলে অবস্থিত হলেও তা খুব কাছাকাছি ছিল না।
উক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা গত মঙ্গলবার বলেন, ‘নোভগোরোদ অঞ্চলে প্রেসিডেন্টের বাসভবনে কথিত ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার অভিযোগের পক্ষে রাশিয়া কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে।’
এছাড়া,যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার রাশিয়ার ড্রোন হামলার দাবিটি কার্যত নাকচ করে দিয়েছেন।
তিনি নিউইয়র্ক পোস্টের একটি সম্পাদকীয় শেয়ার করেন, যার শিরোনাম ছিল: ‘পুতিনের ওপর “হামলার” আস্ফালন প্রমাণ করে যে, রাশিয়াই শান্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
জানা গেছে, পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তবে পরে তিনি উল্লেখ করেন যে, হামলাটি ‘নাও ঘটে থাকতে পারে।’
গত রবিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলাপকালে হামলার সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা বলছেন হয়তো হামলাটি ঘটেনি, সেটাও সম্ভব। তবে প্রেসিডেন্ট পুতিন আজ সকালে আমাকে বলেছেন যে হামলা হয়েছে।’
আরেকদিকে, জেলেনস্কি এই দাবি অস্বীকার করে যুক্তি দেন যে, এই অভিযোগ ট্রাম্পের দলের সঙ্গে তাদের ‘যৌথ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সব অর্জনকে ক্ষুণ্ন করার’ এবং ‘ইউক্রেনের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত হামলার যৌক্তিকতা তৈরির’ একটি প্রয়াস মাত্র।
সুলতানা দিনা/