দক্ষিণ স্পেনে একটি উচ্চগতির ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে অপর একটি ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে ৩৯ জন নিহত ও ১২০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ আজ সোমবার জানায়, এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা এবং ঘটনাটি ‘খুবই অস্বাভাবিক’। খবর এএফপির।
২০১৩ সালের পর এটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনা। ওই বছর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলার কাছে বাঁকানো রেলপথে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে ৮০ জন নিহত হন।
স্থানীয় সময় গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। রেল সংস্থা ইরিও পরিচালিত মালাগা থেকে মাদ্রিদগামী একটি ট্রেন আদামুজের কাছে লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত লাইনে চলে যায়। সেখানে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের সঙ্গে এর সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে দ্বিতীয় ট্রেনটিও লাইনচ্যুত হয়।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, অন্তত ৩৯ জন নিহত হয়েছেন, যা রবিবার রাতে পুলিশের দেওয়া ২১ জনের প্রাথমিক সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।
এ ছাড়া ১২৩ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং ২৪ জন গুরুতর আহত বলে মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান।
পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে সাংবাদিকদের বলেন, সম্পূর্ণ সংস্কারকৃত সোজা রেলপথে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
তিনি জানান, যে ট্রেনটি প্রথমে লাইনচ্যুত হয় সেটি ছিল ‘প্রায় নতুন’। ফলে ঘটনাটি খুবই অস্বাভাবিক।
মন্ত্রী বলেন, রেল বিশেষজ্ঞরা এ দুর্ঘটনায় অত্যন্ত বিস্মিত। কারণ ঘটনাটি অত্যন্ত অদ্ভুত এবং এই পর্যায়ে এর ব্যাখ্যা দেওয়া খুবই কঠিন।
রেল অপারেটর ইরিও জানায়, তাদের মালাগা-মাদ্রিদ রুটের ট্রেনে প্রায় ৩০০ যাত্রী ছিলেন।
দ্বিতীয় ট্রেনের অপারেটর রেনফে এখনো যাত্রীসংখ্যা জানায়নি।
ইউরোপের সবচেয়ে বড় উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক রয়েছে স্পেনে। দেশটিতে তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি উচ্চগতির রেলপথ রয়েছে, যা মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, সেভিয়া, ভ্যালেন্সিয়া ও মালাগাসহ বড় বড় শহরকে যুক্ত করেছে।
ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া শত শত যাত্রী জরুরি উদ্ধারকাজকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
কর্ডোবার ফায়ার সার্ভিস প্রধান ফ্রান্সিসকো কারমোনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিভিইকে বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে বগিগুলো দুমড়ানো-মোচড়ানো অবস্থায় আছে। ধাতব কাঠামো মানুষের সঙ্গে পেঁচিয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো জীবিত কাউকে পৌঁছাতে মৃতদেহ সরাতেও হয়েছে। কাজটি খুবই কঠিন ও জটিল।’
তিনি জানান, কয়েকটি বগি প্রায় চার মিটার (১৩ ফুট) উঁচু ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে গেছে।
হুয়েলভাগামী দ্বিতীয় ট্রেনের এক যাত্রী, যিনি শুধু মন্টসে নামটি জানিয়েছেন, স্পেনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, ‘একটি প্রচণ্ড ঝাঁকুনির পর ট্রেনটি হঠাৎ থেমে যায় এবং চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে।’
তিনি বলেন, শেষ বগিতে তিনি এদিক-ওদিক ছিটকে পড়েন এবং অন্য যাত্রীদের ওপর লাগেজ পড়তে দেখেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার পেছনের ট্রেন অ্যাটেনডেন্ট মাথায় আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত হন। শিশুরা কান্না করছিল। সৌভাগ্যক্রমে আমি শেষ বগিতে ছিলাম। মনে হচ্ছে আমি জীবনে দ্বিতীয় সুযোগ পেয়েছি।’
প্রথম লাইনচ্যুত ট্রেনের যাত্রী ও বেঁচে যাওয়া লুকাস মেরিয়াকো লা সেক্সতা টেলিভিশনকে বলেন, ‘এটা যেন হরর সিনেমার মতো।’
তিনি বলেন, ‘পেছন দিক থেকে খুব শক্ত ধাক্কা অনুভব করি। মনে হচ্ছিল পুরো ট্রেনটাই ভেঙে পড়বে। কাচ ভাঙার কারণে অনেক মানুষ আহত হয়েছে।’
রেল অবকাঠামো কর্তৃপক্ষ আদিফ জানায়, সোমবার মাদ্রিদ থেকে কর্ডোবা, সেভিয়া, মালাগা ও হুয়েলভার মধ্যে উচ্চগতির ট্রেন চলাচল স্থগিত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘আদামুজে মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনার কারণে আজ আমাদের দেশের জন্য গভীর শোকের রাত।’
তিনি বলেন, ‘এত বড় কষ্ট কোনো শব্দে লাঘব করা যায় না। তবে তারা যেন জানেন, এই কঠিন সময়ে পুরো দেশ তাদের পাশে আছে।’
রাজপ্রাসাদ এক্সে জানায়, স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফেলিপে ও রানি লেতিসিয়া ঘটনাটি ‘গভীর উদ্বেগের সঙ্গে’ অনুসরণ করছেন এবং নিহতদের স্বজনদের প্রতি ‘গভীর সমবেদনা’ ও আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডের লায়েনসহ বিশ্বনেতারাও শোকবার্তা জানিয়েছেন। সূত্র: এএফপি
মাহফুজ/