যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতালির টেলিভিশন চ্যানেল লা সেভেনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি তার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য ‘অনুরোধ’ করেছিলেন। এদিকে মেলোনি বলেছেন, ট্রাম্পের মন্তব্যে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দুই নেতার মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ তৈরি হয়েছে। ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লাসহ দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। গতকাল শনিবার ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি এ খবর জানায়।
মেলোনি ট্রাম্পের বক্তব্যকে পুরোপুরি ‘মনগড়া’ বলে অভিহিত করেছেন। এ ঘটনার জেরে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্তোনিও তায়ানি আগামী সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল করেছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তের পর থেকেই দুই নেতার একসময়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অবনতি হয়। সাম্প্রতিক এই বাগযুদ্ধ সেই দূরত্বকেই স্পষ্ট করেছে।
এ সপ্তাহে পূর্ব ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলনে ট্রাম্প ও মেলোনিকে ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ করতে দেখা যায়। পরে ইতালির প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তাদের সম্পর্ক আগের মতোই রয়েছে। কোনো ধরনের মনোমালিন্য হয়নি।
কিন্তু এরপর লা সেভেনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘তিনি (মেলোনি) আমার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। আমি তার জন্য দুঃখবোধ করেছিলাম।’
জি৭ সম্মেলনের সময় কয়েকবার দুই নেতাকে একসঙ্গে দেখা যায়। একটি ছোট সোফায় বসে তাদের আলোচনা করতে দেখা যায়, যেখানে মেলোনিকে হাসিমুখে কথা বলতে দেখা গেছে। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘সম্ভবত আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি বলেই তিনি খুশি। তবে লা সেভেন ট্রাম্পের মূল ইংরেজি বক্তব্য প্রচার না করে ইতালীয় ভাষায় ডাবিং করে তা সম্প্রচার করে।’
ট্রাম্পের মন্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করে মেলোনি ইনস্টাগ্রামে বলেন, ‘সত্যি বলতে আমি স্তম্ভিত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কেন মিত্রদের সঙ্গে এভাবে আচরণ করেন, তা আমি জানি না। আর এটিই প্রথম নয়। দুঃখজনক বিষয় হলো, পশ্চিমা বিশ্বের শত্রু কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের ক্ষেত্রে তিনি একই ধরনের কঠোর অবস্থান দেখান না। বরং তাদের নেতাদের প্রতি তাকে অনেক বেশি নমনীয় মনে হয়।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘তবে একটি বিষয় তার মনে রাখা উচিত, আমি কিংবা ইতালি কখনো কারও কাছে অনুরোধ করে কিছু আদায় করি না।’
২০২২ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর মেলোনি ইউরোপের একমাত্র নেতা হিসেবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা তাকে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সম্ভাব্য সেতুবন্ধনকারী হিসেবেও দেখতেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের বিরোধিতায় মেলোনি সরব ছিলেন। এর জবাবে গত এপ্রিলে ইতালির দৈনিক কোরিয়েরে দেলা সেরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম তার সাহস আছে, কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।’
ট্রাম্প যখন পোপ লিও চতুর্দশকে ‘অপরাধ দমনে দুর্বল’ এবং ‘পররাষ্ট্রনীতিতে ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেন, তখন মেলোনি সেই মন্তব্যকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছিলেন। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর ইতালির প্রেসিডেন্ট সের্জিও মাত্তারেল্লা দ্রুত মেলোনির সঙ্গে ফোনে কথা বলে সমর্থন জানান। ইতালির বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর ফিলিপ্পো সেনসি বলেন, ‘কোনো বিদেশি নেতারই ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় কথা বলার অধিকার নেই।’
ফাইভ স্টার মুভমেন্টের নেতা জিউসেপ্পে কন্তে বলেন, ‘ইতালি এমন অপমানের যোগ্য নয়। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের নামে কখনো জাতীয় মর্যাদা ও স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়।’
মেলোনির দল ব্রাদার্স অব ইতালির সিনেট নেতা লুসিও মালান বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য ইউরোপীয় নেতাদের বিরুদ্ধে তার ধারাবাহিক আপত্তিকর মন্তব্যেরই অংশ এবং এতে মূলত ট্রাম্পের নিজের ভাবমূর্তি ও কর্তৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, জি৭ সম্মেলনের ভিডিও ফুটেজে বাস্তব পরিস্থিতি ট্রাম্পের বর্ণনার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। তার মতে, প্রয়োজনে ওয়াশিংটনকে ‘না’ বলতে দ্বিধা না করাই সম্ভবত ট্রাম্পকে বিরক্ত করেছে। সূত্র: বিবিসি