বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন জন্মগ্রহণ করেন ১৬৪৩ সালে ইংল্যান্ডের লিংকনশায়ার থেকে সাত মাইল দক্ষিণে কোলসটারওয়ার্থ গ্রামের ‘উলসথর্প’ নামের এক বিশাল ফার্ম হাউসে।
তার জন্ম তারিখের হিসাবে মজার গণ্ডগোল আছে। ইংল্যান্ডের জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আইজ্যাক নিউটনের জন্ম ১৬৪২ সালের ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাসের দিনে।
সেই সময় ইউরোপের সব জায়গায় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হয়ে গেলেও ইংল্যান্ডে ১৭০০ সাল পর্যন্ত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হয়নি। ইংল্যান্ডের জুলিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের তারিখ থেকে ১০ দিন পিছিয়ে ছিল।
সেই হিসাবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নিউটনের জন্ম তারিখ ৪ জানুয়ারি ১৬৪৩। তার পিতার নামও ছিল আইজ্যাক নিউটন।
নিউটনের জন্মের কয়েক মাস আগেই পিতার মৃত্যু হয়। তার মা হ্যানা এইসকফ, স্বামীর স্মৃতি হিসেবে পুত্রের নাম রেখেছিলেন আইজ্যাক নিউটন।
নিউটনের যখন দুই বছর বয়স, তখন তার মা নিকটস্থ গির্জার পাদ্রি বার্নাবাস স্মিথকে বিয়ে করেন। এই বিবাহকালে তিনি তার সব সম্পত্তি নিউটনের নামে লিখে দেন।
বিধবা মায়ের সঙ্গে জীবনের প্রথম তিন বছর কেটে যায়। এ সময় তার মা বিবাহ করেন। নিউটন তার নানা-নানির কাছে লালিত-পালিত হন।
এতিম অবস্থায় তার শৈশব ও কৈশোর কাটে। গ্রামের পাঠশালাতে তার শিক্ষাজীবনের শুরু হয়। ১২ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি স্কুলটিতেই লেখাপড়া করেন।
শিক্ষাজীবন
এরপর নিউটনকে বাড়ি থেকে সাত মাইল দূরে গ্রান্থাম গ্রামের কিং স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এ সময় তার অসাধারণ মেধার পরিচয় পাওয়া যায়।
জন্মলগ্ন থেকে নিউটন ছিলেন রুগণ প্রকৃতির। তবু তার দুষ্টুমির কমতি ছিল না। অন্যদিকে বালক নিউটনের জ্ঞান প্রতিভায় শিক্ষকরা মুগ্ধ হয়ে যান।
১৬৬১ সালে ১৯ বছর বয়সে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হন নিউটন। তার সহপাঠীরা সবাই বয়সে তার চেয়ে তিন-চার বছরের ছোট ছিল।
এ সময় গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা এবং পদার্থবিদ্যায় অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেন। তিনি অবদান রেখেছেন আলো ও বর্ণের সম্পর্ক, মহাকর্ষ বলের গাণিতিক সূত্র ও গতির সূত্র আবিষ্কারে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে নিউটনের গতিবিদ্যা প্রয়োগ করার পর বিগত কয়েক হাজার বছরের চেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই।
গণিতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা ক্যালকুলাসের উৎপত্তি ও বিকাশের অন্যতম নায়ক ছিলেন আইজ্যাক নিউটন।
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সর্বকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনাগুলোর একটি নিউটনের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা, যেখান থেকে আমরা পেয়েছি চিরায়ত বলবিজ্ঞান, গ্রহ-নক্ষত্রগুলোর মধ্যে মহাকর্ষ বলের সূত্র এবং মহাবিশ্বের গতির গাণিতিক অবকাঠামো।
নিউটনের প্রিজম
বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন ছিলেন একাধারে একজন রসিক ও আত্মমগ্ন ব্যক্তি। তিনি যখন কোনো বৈজ্ঞানিক বিষয়ে গবেষণা করতেন তখন তার চারপাশের সবকিছুই যেন ভুলে যেতেন।
নিউটন ছিলেন একজন গবেষণাপ্রিয় মানুষ। তিনি সব সময় নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করতেন। এক দিন একজন লোক তার বাড়িতে এসে একটা প্রিজম দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন এর দাম কত হতে পারে।
এ সময় নিউটন প্রিজমের বৈজ্ঞানিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে বললেন, এর সঠিক মূল্য নির্ণয় করা তার সাধ্যের বাইরে। তাই লোকটি বেশি দাম চাইল।
নিউটন সেই দামে প্রিজমটি কিনলেন। নিউটন এক দিন প্রিজমটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। তিনি দেখলেন সাদা আলো প্রিজমের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন রঙে বিভক্ত হয়ে গেল। এই পরীক্ষার ফলে তিনি বর্ণতত্ত্বের সূত্র আবিষ্কার করলেন।
নিউটনের ঘড়ি
নিউটন ছিলেন একজন দক্ষ কারিগর। তিনি বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র তৈরি করতে পারতেন। নিউটনের শিক্ষক স্কুলে দেরি করে আসতেন।
নিউটন তার শিক্ষককে দেরি না করে স্কুলে আসতে সাহায্য করার জন্য একটি কাঠের ঘড়ি তৈরি করলেন। এই ঘড়িতে একটি পানির পাত্র ছিল।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি সেই পাত্রে ঢেলে দেওয়া হতো। ঘড়ির কাঁটার ওপর থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ত। এর ফলে ঘড়ির কাঁটা আপন গতিতেই এগিয়ে চলত।
এ ছাড়া নিউটনের জীবনে আরও অনেক মজার ঘটনা ঘটেছে। তিনি ছিলেন একজন উদার এবং সহযোগিতাপ্রিয় ব্যক্তি। তিনি সব সময় অন্যদের সাহায্য করতেন।
নিজেই নিজের বিরাট তত্ত্বকে সঠিকভাবে চিনতে পারেননি বিজ্ঞানী নিউটন। তার ভাষায় তিনি বলেন, ‘আমি এত দিন কেবল নুড়ি পাথর কুরিয়েছি।’
অসাধারণ আবিষ্কারের পরও তিনি ছিলেন অসুখী মানুষ। মৃত্যুর আগে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই মহান বিজ্ঞানী ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ১৭২৭ সালের ২০ মার্চ। মৃত্যুর পর তাকে রাজকীয় সম্মান দিয়ে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে সমাহিত করা হয়।
সূত্র: বিবিসি ও নিউইয়র্ক টাইমস
কলি