আপনি কি মরিচ পছন্দ করেন? উত্তরটা যদি হ্যাঁ হয়, তবে আপনি একটি বিশাল দলের সদস্য। যারা মরিচ পছন্দ করে। বিশ্বে মসলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত উপাদান হচ্ছে মরিচ। যা প্রায় প্রতিটি দেশের রান্নাঘরে পাওয়া যায়। মরিচের বিভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। লাল, সবুজ, হলুদ, কালো, নীল ও বেগুনি রঙের মরিচ রয়েছে। আপনি কি জানেন মরিচে ঝাল লাগে কেন? আবার পাখিদের ঝাল লাগে না কেন? টিয়াপাখি কেনই-বা মরিচ পছন্দ করে? বিস্তারিত জানাচ্ছেন আবরার জাহিন
কোথা থেকে এল মরিচ?
মরিচের উৎপত্তি হয়েছে আমেরিকা মহাদেশে। এটি আবিষ্কার করেছেন আমেরিকার আদিবাসীরা। যারা প্রায় ৭ হাজার বছর আগে থেকেই এটির ব্যবহার করে আসছেন। ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রথম ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে মরিচ দেখেন। তিনিই এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেন। এর সঙ্গে সঙ্গে মরিচ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। তবে মোগল আমলে স্প্যানিশ ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ভারতবর্ষে মরিচ এসেছে। মাত্র ৪০০ বছরেই এটি উপমহাদেশের খাদ্যতালিকার অন্যতম উপকরণে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন ভাষায় মরিচ নিয়ে অনেক গল্প, কবিতা, গান ও উপকথা রয়েছে। পৃথিবীতে এক সম্প্রদায় থেকে অন্য সম্প্রদায়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মরিচের রূপ, রং, স্বাদ ও নামের পরিবর্তন হয়েছে। ঝাল ও মিষ্টি দুই স্বাদেরই মরিচ পাওয়া যায়।
কাঁচামরিচ সবুজ আর পাকা মরিচ লাল রঙের হয় কেন?
কাঁচামরিচে ক্লোরোফিল নামক সবুজ রঙের রাসায়নিক পদার্থ থাকে। যে কারণে কাঁচামরিচ দেখতে সবুজ হয়। আর মরিচ পাকার সঙ্গে সঙ্গে এর মধ্যে থাকা ক্লোরোফিল ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। এর মধ্যে থাকা এনজাইমগুলো ক্লোরোফিলকে ভেঙে ফেলে। এনজাইম একধরনের জৈব রাসায়নিক পদার্থ। যা জীবিত কোষগুলোয় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়।
ক্লোরোফিল নষ্ট হয়ে গেলে এর জায়গায় ক্যারোটিনয়েড তৈরি হয়। ক্যারোটিনয়েড একধরনের জৈব রঞ্জক। যা উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশে পাওয়া যায়। এটি লাল, কমলা, হলুদসহ বিভিন্ন রঙের হতে পারে। পাকা মরিচে ক্যারোটিনয়েডের পরিমাণ বেশি থাকে। যা লাল রঙের আলো প্রতিফলিত করে। তাই মরিচ পাকলে টকটকে লাল দেখায়।
পাকা মরিচের লাল রং শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, এটি বংশবিস্তারেও সাহায্য করে। লাল রং পাখিদের আকর্ষণ করে। তাই পাকা মরিচের রং পাখিদেরও আকৃষ্ট করে। যার মাধ্যমে তারা মরিচের বীজ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয়।
মরিচে ঝাল লাগার কারণ
মরিচগাছের ভেতরে ‘ক্যাপসাইসিন’ নামে একধরনের রাসায়নিক উৎপন্ন হয়। এই রাসায়নিক উপাদান মরিচের মধ্যে থাকে। মরিচে ক্যাপসাইসিনের উপস্থিতির কারণে মরিচ ঝাল লাগে।
যখন মরিচযুক্ত কোনো খাবার খাওয়া হয়, তখন মরিচে থাকা ক্যাপসাইসিন মুখে থাকা ‘পলিমোডাল’ স্নায়ুকে উত্তেজিত করে তোলে। এই পলিমোডাল স্নায়ু ব্যথা, তাপমাত্রা ও ঝালের অনুভূতি শনাক্ত করে। এ ছাড়া এগুলো কত তীব্র, সেই ধারণা সম্পর্কেও এই স্নায়ু মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়।
ঝালজাতীয় কিছু খাওয়ার সময় পলিমোডাল স্নায়ু উত্তেজিত হয়। সঙ্গে দেহের কেন্দ্রীয় স্নায়ু-সিস্টেমের মাধ্যমে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। সেটা কোন ধরনের অনুভূতি, মস্তিষ্ক সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে তা আমাদের জানিয়ে দেয়। মরিচে থাকা ক্যাপসাইসিন যখন স্নায়ুকে উত্তেজিত করে তোলে, তখন মস্তিষ্ক ঝালের মাধ্যমে সৃষ্ট ‘বার্নিং সেনসেশন’ বা ‘পুড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি’ চিহ্নিত করে।
ক্যাপসাইসিন সেটা জিহ্বায় পেইন রিসেপ্টর অর্থাৎ টিআরপিভি ওয়ান রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়। আর এটাই জ্বলন্ত অনুভূতি তৈরি করে। অনেকে মনে করেন, বীজ মরিচের সবচেয়ে ঝাল অংশ। প্রকৃতপক্ষে, মরিচের আগা থেকে নিচের দিকে সাদা স্পঞ্জি স্তর বা প্ল্যাসেন্টাতেই ক্যাপসাইসিন উৎপন্ন হয়।
ঝাল পরিমাপের স্কেল
বিভিন্ন ধরনের মরিচে বিভিন্ন ধরনের ক্যাপসাইসিন থাকে। আর এতেই মরিচভেদে ক্যাপসাইসিনের ঘনত্বও থাকে ভিন্ন ভিন্ন। মরিচে ক্যাপসাইসিন কতটা আছে, তার ওপর নির্ভর করে কোন মরিচ কতটা ঝাল হবে। এটা পরিমাপ করা হয় স্কোভিল স্কেল দিয়ে। এটা ঝাল পরিমাপের একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি।
মরিচের ঝালের উত্তাপ বর্ণনা করার জন্য রসায়নবিদ উইলবার স্কোভিল ১৯১২ সালে একটি পদ্ধতি অবলম্বন করেন। যা পরে স্কোভিল হিট ইউনিট হিসেবে পরিচিত হয়েছে।
স্কোভিল স্কেলে মরিচের ঝাল পরিমাপ করার জন্য, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মরিচের নির্যাসকে পাতলা করে পানিতে মিশিয়ে একটি দ্রবণ তৈরি করা হয়। তারপর এই দ্রবণের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি পান করেন। ওই ব্যক্তির দ্রবণটিকে কতটা ঝাল মনে হচ্ছে তার একটি রেটিং দেন। পাঁচজন প্রশিক্ষিত পরীক্ষকের গড় রেটিংয়ের মাধ্যমে স্কোভিল স্কেলের মান নির্ণয় করা হয়।
নির্যাসের ঝালের মাত্রা যত বেশি হবে, একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তির কাছে তা তত বেশি ঝাল মনে হবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো মরিচের নির্যাস যদি একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তির কাছে ঝালের মাত্রা রেটিংয়ে ১০০ মনে হয়। তাহলে সেই মরিচের স্কোভিল স্কেলে মান হবে ১০০ এসএইচইউ।
স্কোভিল স্কেল একটি আপেক্ষিক স্কেল। যার অর্থ এক ব্যক্তির কাছে কোনো মরিচ ঝাল মনে হলে, অন্য ব্যক্তির কাছে তা ঝাল নাও মনে হতে পারে। তবে এই স্কেল মরিচের ঝালের মাত্রা পরিমাপ করার জন্য একটি মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
রেকর্ডধারী ঝাল মরিচ
গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর ‘পেপার এক্স’কে পৃথিবীর সবচেয়ে ঝাল মরিচ হিসেবে ঘোষণা করে। এই মরিচের ঝালের মাত্রা গড়ে ২৬ লাখ ৯৩ হাজার স্কোভিল হিট ইউনিট (এসএইচইউ)। এর আগে ২০১৩ সাল থেকে এই রেকর্ড ছিল ক্যারোলিনা রিপার মরিচের দখলে। ক্যারোলিনা রিপার মরিচের ঝালের মাত্রা প্রায় ১৬ লাখ ৪০ হাজার স্কোভিল হিট ইউনিট।
পেপার এক্স মরিচের উদ্ভাবক হলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের পাকারবাট পেপার কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এড কারি। তিনি ২০১৩ সালে ক্যারোলাইনা রিপার মরিচের উদ্ভাবকও ছিলেন। নাগা বিশ্বের অন্যতম ঝাল মরিচ। স্কোভিল স্কেলে ঝালের মাত্রা হয়ে থাকে ১৩ লাখের বেশি। মরিচে ক্যাপসাইসিন কতটা আছে, তার ওপর নির্ভর করে কোন মরিচ কতটা ঝাল হবে। বিজ্ঞানীদের মতে, মরিচে ঝালের বিবর্তন ঘটেছে প্রকৃতির নিয়মে।
পেপার এক্স মরিচের ঝালের কারণে এটি খাওয়ার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এই মরিচ খেলে মুখ, গলা এবং পেটে তীব্র ঝাল অনুভূত হতে পারে। এমনকি এটি বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা এবং পেটব্যথার কারণ হতে পারে। পেপার এক্স মরিচ সাধারণত খাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় না। এটি সস, মসলা ও টক-জাতীয় খাবারে স্বাদ বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
ক্যাপসাইসিন মুখের স্নায়ুকে উত্তেজিত করে এবং বেদনাদায়ক অনুভূতির সৃষ্টি করে। এই অনুভূতি মস্তিষ্কে কিছু নির্দেশ পাঠায়। ফলে আমাদের রক্তচাপ বাড়ে, ঘাম বের হয়, শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে এবং এন্ডোরফিন নামে একধরনের হরমোন নিঃসরণ হয়। এন্ডোরফিন বেদনা কমায় ও আনন্দ বাড়ায়। এ কারণে অনেকেই মরিচ খেতে ভালোবাসেন।
মরিচ শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ায় না। এর অনেক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত উপকারী দিকও রয়েছে। মরিচের মধ্যে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রনসহ অনেক ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে। এই ভিটামিন ও খনিজ শরীরের বিভিন্ন কাজে সাহায্য করে। মরিচ রক্তের শর্করা, কোলেস্টেরল, হাড়ের স্বাস্থ্য, চোখের স্বাস্থ্য, পাচন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
জাহ্নবী