গবাদিপশুর ম্যাসটাইটিস রোগ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুতর সমস্যা। এটি সাধারণত গাভি বা মহিষের স্তনে সংক্রমণের কারণে ঘটে, যা স্তনের দুধ উৎপাদন কমিয়ে দেয় এবং পশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। এ ছাড়া দুধের গুণগত মান কমার পাশাপাশি খামারিদের আর্থিক ক্ষতি এবং গ্রাহকদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে।
সম্প্রতি গবাদিপশুর ম্যাসটাইটিস বা ওলান প্রদাহ রোগের ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন ও মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান ও তার গবেষক দল। চার বছরের গবেষণা শেষে দেশে প্রথমবারের মতো এই ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছেন তারা। অধ্যাপক বাহানুরের এই গবেষক দলে ছিলেন ড. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত কয়েকজন শিক্ষার্থী।
জানা যায়, গবাদিপশুর ম্যাসটাইটিস বা ওলান প্রদাহ মূলত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক ব্যাধি। এ রোগে গাভির ওলান ফুলে যায়, ওলানে জ্বালাপোড়াসহ ব্যথা অনুভূত হয় ও দুধ উৎপাদন কমে যায়। অধিক সংক্রমণে দুধ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে খামারিরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে থাকেন। এই রোগের ব্যাকটেরিয়া প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট হওয়ায় প্রতিষেধক চিকিৎসায় কার্যকরী ফলাফল পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি-ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচার (বাস-ইউএসডিএ) প্রোগ্রামের অর্থায়নে ২০২০ সালের ১ অক্টোবর এই গবেষণাটি শুরু হয়ে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়। গবেষণাটির মেয়াদকাল ছিল তিন বছর এবং এটি ২০২৪ সালের ১১ জুন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণার বিষয়ে ড. বাহানুর বলেন, ‘২০২০ সালে গবেষণাটি শুরু করি। আমরা ঢাকা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনাসহ ৯টি জেলার ২০৯টি খামারে জরিপ পরিচালনা করি। জরিপে ৪৬ শতাংশ গাভিতে ম্যাসটাইটিসের সংক্রমণ খুঁজে পাই। মাঠপর্যায় থেকে আমরা স্যাম্পল সংগ্রহ করে সোমটিক সেল কাউন্টের মাধ্যমে ম্যাসটাইটিসের সংক্রমণ ও এর তীব্রতা নিরূপণ করি। পরবর্তী সময়ে গবেষণাগারে দীর্ঘ ক্লিনিকাল টেস্ট ও প্রক্রিয়াকরণ শেষে আমরা এই ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে সক্ষম হই। ৫১৭টি গাভি থেকে নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে। এই ভ্যাকসিন তৈরিতে ৪টি ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করেছি।’
ব্যাকটেরিয়াগুলো হলো Streptococcus agalactiae, Escherichia coli, Staphylococcus aureus ও Streptococcus uberis। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো গবেষণায় ব্যবহৃত নমুনা থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে। ভ্যাকসিনটি চারটি ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে বিধায় একে Polyvalent Mastitis Vaccine বলে। ব্যাকটেরিয়াগুলো জুনোটিক স্বভাবের কারণে প্রাণী থেকে মানুষেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ড. বাহানুর আও বলেন, ‘ভালো দুধ উৎপাদনে গাভীর ওলানের সুস্থতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মূলত ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষেত্রবিশেষে কিছু ছত্রাকের আক্রমণে গাভির এই রোগ হয়ে থাকে। দেশে আগে এই রোগের ভ্যাকসিন বিদেশ থেকে আমদানি করা হলেও বর্তমানে এটি দেশে আর পাওয়া যায় না। গাভির সুস্থতা নিশ্চিত করতে ও দুধ উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় সেই লক্ষ্যে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে আমরাই প্রথম ম্যাসটাইটিস ভ্যাক্সিন উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কোনো ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৭০ শতাংশ হলেই সেটি সফল হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু উদ্ভাবিত আমাদের ভ্যাক্সিনটি প্রায় শতভাগ কার্যকর।’
ভ্যাকসিনটির ব্যবহারবিধি সম্পর্কে অধ্যাপক বাহানুর রহমান বলেন, এটি ইঁদুর ও গিনিপিগে প্রয়োগ করে এর নিরাপত্তা যাচাই করা হয়েছে এবং পঞ্চম প্রজন্মের অ্যাডজুভেন্ট এই ভ্যাকসিনে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি গাভির গর্ভাবস্থায় প্রয়োগ করতে হয়। দুটি ডোজ দিতে হবে। প্রথম ডোজ গর্ভাবস্থার ৭ থেকে ৮ মাসের মধ্যে এবং দ্বিতীয় ডোজ বাচ্চা হওয়ার আগ মুহূর্তে অর্থাৎ ৯ থেকে সাড়ে ৯ মাসের মধ্যে দিতে হবে। ৫ মিলি করে প্রতি ডোজে দিতে হবে। এই ভ্যাকসিনের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। দুটি ডোজ গাভিকে দিয়ে দিলে ম্যাসটাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যাবে। বাজারজাত করা সম্ভব হলে এই ভ্যাকসিনের দাম কৃষকের নাগালের মধ্যেই থাকবে।